Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্যক্যান্ডিডেটস জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে গুকেশের মুখোমুখি সিন্দারভ, ড্র করেও খেতাবের লড়াইয়ে বৈশালীIPL 2026: চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে হেরে টেবিলের তলানিতে কেকেআর! গুরুতর বদলের ইঙ্গিত রাহানের নববর্ষের 'শুভনন্দন'-এও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! বাংলায় পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীরইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?

'মোদীর গ্যারান্টি', চেনা পণ্য, চিনা পণ্য

একটা সময় কলকাতা, শিলিগুড়ির কিছু বাজারে মানুষ যে বিদেশি চোরাই মাল কেনার বাসনায় ছুটত, সেগুলি ছিল মূলত চিনের তৈরি পণ্য। এখন বৈধ পথেই সে দেশের তৈরি জিনিসপত্র এ দেশে পাওয়া যায়।  

'মোদীর গ্যারান্টি', চেনা পণ্য, চিনা পণ্য

শেষ আপডেট: 10 March 2024 10:00

অমল সরকার

‘চাইনিজ মাল নিশ্চয়ই?’  

‘চিনের তৈরি মালের কোনও গ্যারান্টি নেই।’

‘সস্তার তিন অবস্থা, চিনা মাল মানেই ইউজ অ্যান্ড থ্রো। ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেন।’ 

জরুরি কাজের কোনও জিনিস অল্পদিনে খারাপ হয়ে গেলে এই ধরনের কথাবার্তা শুনতে আমরা এখন অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছি। তারপরও চিনা পণ্যের কদর কমে না, বরং চাহিদা ঊর্ধ্বমুখী। একটা সময় কলকাতা, শিলিগুড়ির কিছু বাজারে মানুষ যে বিদেশি চোরাই মাল কেনার বাসনায় ছুটত, সেগুলি ছিল মূলত চিনের তৈরি পণ্য। এখন বৈধ পথেই সে দেশের তৈরি জিনিসপত্র এ দেশে পাওয়া যায়।  

আাড়াই দশক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এক অভিজ্ঞ সাংবাদিকের কথায়, ভারতীয়দের মধ্যে চিনা পণ্যের চাহিদা অন্য দেশের তুলনায় বেশি। কারণ, বেজিংয়ের কর্তারা ভারতীয়দের ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনায় রেখে পণ্য তৈরি করে। ফলে কোয়ালিটির গ্যারান্টি নেই। 

গ্যারান্টি শব্দটির ব্যবহার ইদানীং হাট-বাজার, বাণিজ্য জগৎ থেকে রাজনীতির অঙ্গনে উঠে এসেছে। ‘মোদীর গ্যারান্টি’-র কথা খবরের কাগজ, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ার পর্দায় জ্বল জ্বল করছে। শনিবার শিলিগুড়ির জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বারে বারে শোনা গেল, ‘ইয়ে মোদী কি গ্যারান্টি হ্যায়।’ 

শব্দটি বড় বিচিত্র। গ্যারান্টির আভিধানিক ও ব্যবহারিক অর্থ ‘নিশ্চয়তা’, ‘অঙ্গীকার’ ইত্যাদি হলেও এ দেশে একই সঙ্গে তাতে সন্দেহ, সংশয় জুড়ে থাকে। দোকানে কেনাকাটার সময় বিক্রেতার সঙ্গে ক্রেতার কথোপকথনে তা বেশ টের পাওয়া যায়। দোকানদার আপ্রাণ চেষ্টা করে যান, ক্রেতাকে গ্যারান্টির বুলি গেলাতে। সংশয়, অনাস্থা সত্ত্বেও বেশিরভাগ ক্রেতা শেষ পর্যন্ত জিনিসটি কেনেন। কারণ, বিকল্প নেই। পাশের দোকানদারের দেওয়া গ্যারান্টি একশো ভাগ ভরসাযোগ্য এমন নিশ্চয়তা কে দেবে! ফলে, ‘এর গ্যারান্টি কে দেবে,’, ‘এর কী গ্যারান্টি আছে!’ ‘ওর কথার কি গ্যারান্টি আছে?’—জাতীয় কথা শুনতেই আমরা অভ্যস্থ। 

‘মোদীর গ্যারান্টি’-ও কি সংশয়, সন্দেহের ঊর্ধ্বে? একজন রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে মানুষ  প্রতিশ্রুতির গ্যারান্টি চায়। নরেন্দ্র মোদীর দশ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের ইনিংস কিন্তু সে কথা বলে না। বরং ইতিহাসের পাতায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের আখ্যান হিসাবেই লেখা থাকবে এই দশ বছরের কাহিনি। বিদেশ থেকে কালো টাকা উদ্ধার করে দেশবাসীর মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সব হাতে কাজ, কৃষকের আয় দ্বিগুণ করা, মোদীর সব ঘোষণাই তিনি দিল্লির কুর্সি দখলের পর ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে। 

তবু বাস্তব মানতেই হবে, চিনা পণ্যের ঊর্ধ্বগামী চাহিদার মতোই মোদীর কথাও মানুষ গোগ্রাসে গেলে, বিশ্বাস করে। নিম্নমানের খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো মোদীর কথা শুনে মানুষ ঠকেও যায়। সুস্থ হওয়ার পর মানুষ যেমন ফের শরীর-স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে অখাদ্য গেলে, প্রধানমন্ত্রীর কথাও মানুষ তেমনই ফের মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শোনে, বিশ্বাস করে। কারণ, কথা গেলানোর জাদুকরি ক্ষমতা তো আছেই, তাঁকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্বের যে আবেগ নরেন্দ্র নোদী নির্মাণ করেছেন তাঁর ডিভিডেন্টও তিনি পেয়ে চলেছেন।

শনিবার আন্তর্জাতির নারী দিবসের সকালে প্রধানমন্ত্রী রান্নার গ্যাসের দাম কমানোর কথা ঘোষণা করেন। এক্স হ্যান্ডেলে প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারের দাম একশো টাকা কমানো হল। তিনি আরও লেখেন, ‘এর ফলে দেশে লাখ লাখ পরিবারের আর্থিক বোঝা লাঘব হবে। বিশেষ সুরাহা মিলবে নারীদের।’ প্রধানমন্ত্রী এই সুবাদে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, গ্যাসে রান্না করলে মহিলাদের শরীর-স্বাস্থ্য ভাল থাকে। 

কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এরফলে ৩১ কোটি এলপিজি ব্যবহারকারী পরিবার উপকৃত হবে। পরিবার পিছু দু’জন করে ভোটার ধরলে উপকৃত ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৬২ কোটি। তাঁরা সকলেই মোদীকে ভোট দেবেন, ধরে নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু যে ভোটারেরা এই সুবিধার কথা বিবেচনায় রেখে ভোট দেবেন, তারা কি মনে রাখবেন, নরেন্দ্র মোদীর জমানার গোড়ায় অর্থাৎ ২০১৪-র মাঝামাঝি সময়ে এই ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারের দাম চারশো-সাড়ে চারশো টাকা ছিল। বিগত দশ বছরে যা বাড়তে বাড়তে এগারশো টাকা ছাপিয়ে গিয়েছিল।  

একই কথা প্রয়োজ্য পেট্রল-ডিজেলের দামের ক্ষেত্রে। দীর্ঘ সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম যখন ক্রমশ কমেছে, ভারতে পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিনের দাম তখন জেট বিমানের গতিতে বাড়ছিল।

কালতালীয়ভাবে শুক্রবার রান্নার গ্যাসের দাম কমানোর খবর যখন পেলাম একজনের সঙ্গে তখন নরেন্দ্র মোদীর ‘এক দেশ এক ভোট’ ব্যবস্থা নিয়ে কথা হচ্ছিল। লোকসভার ভোটের নির্ঘণ্ট যে কোনও দিন ঘোষণা হতে পারে। এই সময় রান্নার গ্যাসে খরচের বোঝা কমানোর খবর শুনে ভদ্রলোক মন্তব্য করলেন, ‘এখন তো দেখছি, পাঁচ বছরে একবার নয়, কম করে পাঁচবার ভোট হওয়া দরকার দেশে। তবে যদি জিনিসপত্রের দাম আয়ত্বের মধ্যে থাকে।

আসলে ভোট না এলে মানুষের কান্না নেতা-মন্ত্রীদের কানে পৌঁছায় না এই কথাটি নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে এতটাই সত্য যে মাঝে মাঝে মনে হয়,  তিনি কিছু ঘোষণা সিন্দুকে রেখে দেন ভোটের মুখে জানাবেন বলে। 

প্রশ্ন হল, গ্যাস সিলিন্ডারের দামে এই স্বস্তি কতদিন স্থায়ী হবে? এই ব্যাপারে মোদী গ্যারান্টি দিচ্ছেন কি? লোকসভা ভোট মিটতেই তা কর্পূরের মতো উবে যাবে না, সে গ্যারান্টি আছে কি? 

পেট্রল-ডিজেলের দাম হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে সরকার তেল কোম্পানিগুলিকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে যুক্ত রেখেছে। বৃদ্ধির দায় তাই সরকার নেয় না। সরকারি কর্তারা যুক্তি ফাঁদেন সরকার চায় না তেল কোম্পানি লোকসানের মুখে পড়ুক। যদিও সরকারের নির্বাচনী স্বার্থে দাম না বাড়ানোর অজস্র দৃষ্টান্ত আছে। দু বছর আগে উত্তর প্রদেশ-সহ পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটের কথা মনে করুন। ভোটের আগের দু’মাস জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হল। তারপর আমরা কী দেখলাম! ভোট গ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা, ফল ঘোষণার আগেই পেট্রল ও ডিজেলের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া হয় সেবার। ফলে লোকসভা নির্বাচন মিটতে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডারের দামও এক লাফে দুশো টাকা বাড়বে না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে?

ঘটনা হল, অচিরেই দাম যে বাড়াতে হবে, সরকারের তা অজানা নয়। জ্বালানি তেলে সমৃদ্ধ দেশ এবং তাদের জোটগুলি বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের জোগান ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছে। উদ্দেশ্য কৃত্রিম অভাব তৈরি করে দাম বৃদ্ধি। জোগান কমানোর সময়সীমা জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে চলেছে তারা। আমাদের জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার ৮৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। আমদানি তেলের উপর নির্ভরশীল দেশের তালিকায় ভারত আছে তিন নম্বরে। অশোধিত তেল উত্তোলন যত কমবে ততই বেশি দামে তা কিনতে হবে। ফলে অনেক বেশি বিদেশি মুদ্রা খরচ করতে হবে।

এই সব আসন্ন বিপদের কথা সরকার জানে। তবু শিয়রে ভোট। প্রধানমন্ত্রী ভোটের নির্ঘণ্ট ঘোষণার আগে ভোট-সফরে বেরিয়ে যত পারছেন প্রতিশ্রুতি বিলোচ্ছেন। 

এটা ঠিক যে রান্নার গ্যাসে ছাড় দেওয়ার রাজনৈতিক ফায়দা সবচেয়ে বেশি। এটা এমন একটা নিত্যব্যবহার্য সামগ্রী যার দাম কমার সুবিধা পরিবারের সকলে পান। তবে মহিলাদের তা প্রভাবিত করে বেশি। কারণ, রোজগার করুন, চাই না করুন, তারাই পরিবারের অর্থমন্ত্রী। এই অর্থে সব সংসারি মহিলাই নির্মলা সীতারমন। ফলে খাবারদাবার, রান্নার গ্যাসের দামের হ্রাস-বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া মহিলাদের উপর বেশি হয়।  

কিন্তু মোদী স্রেফ সেই কারণে এবং মহিলারা আগের তুলনায় অনেক বেশি বুথে যান, এই দুই সমীকরণ বিবেচনায় রেখে এলপিজির দাম কমিয়েছেন বলে আমার মনে হয় না। এর সঙ্গে হিন্দুত্বের অঙ্কটিও সমানভাবে যুক্ত। আসলে পুরুষের তুলনায় ভারতীয় মহিলারা অনেক বেশি ধার্মিক এবং ধর্মান্ধও বটে। সমাজের আর পাঁচটা ক্ষেত্রের মতো এই ব্যাপারেও তারা সামনের সারিতে না থাকলেও মানসিকভাবে পুরুষের তুলনায় এগিয়ে। ভোট-রাজনীতিতে মোদীর সবচেয়ে বড় অবদান হল,  সরকারি সেবা, সুবিধার সঙ্গে হিন্দুত্বের নিপুন মিশেল ঘটিয়েছেন তিনি। আর এ কথা মানতেই হবে, ‘মোদীর হিন্দুত্ব’ নামক পণ্যটির বিশুদ্ধতার গ্যারান্টি নিয়ে এখনও প্রশ্ন, সংশয় দেখা দেয়নি। সেটা আজ কিনে কাল বিকল হওয়া চিনা পণ্য নয়। তাঁর বাকি সব গ্যারাটি কিন্তু সেই সব চিনা পণ্যের মতো, আজ সচল, কাল বিকল।


```