
শেষ আপডেট: 9 June 2020 18:30
সেন্ট মেরি'স ব্যাসিলিকা[/caption]
পোল্যান্ডের পুরনো রাজধানী পজনান, ঘন সবুজের শহর রকলো, রাজধানী ওয়ারশ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী কোপারনিকাসের জন্মস্থান তোরান ঘুরে থমকে যেতে হবে ক্র্যাকোতে। পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। একসময় পোল্যান্ডের রাজধানী ছিল সম্ভবত ১৫৯৬ সাল পর্যন্ত। স্থাপত্য-ভাস্কর্য চারদিক দিয়ে মুড়ে ফেলেছে শহরটাকে। একদিকে সুউচ্চ কার্পাথিয়ান পাহাড়, অন্যদিকে ভিস্তুলা নদী। কত যুদ্ধ, কত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, স্বর্ণযুগের গরিমা আবার ধ্বংসের চিহ্ন বয়ে চলেছে এই ভিস্তুলা নদী। পুড়ে যাওয়া ছাই থেকে ফিনিক্স পাখির মতোই বারে বারে ফিরে এসেছে ক্র্যাকো। তার সংগ্রামী ইতিহাসকে স্যালুট জানিয়ে বিশ্বের প্রথম হেরিটেজ সাইটের সম্মান দিয়েছে ইউনেস্কো।
[caption id="attachment_228737" align="aligncenter" width="800"]
ক্লথ হল[/caption]
সকাল বেলাটাই ক্র্যাকোর মেন স্কোয়ার বা রেনেক গ্লোসনি ঘোরার আদর্শ সময়। বলা হয় ইউরোপের অন্যতম বড় টাউন স্কোয়ার। রাস্তার দু’পাশ জুড়ে শুধু পুরনো বাড়ি, গির্জা, বাজার আর পর্যটকদের অবাক, কৌতুহলী দৃষ্টি। মেন স্কোয়ারের কোল জুড়ে রয়েছে ক্লথ হল। সেই রেনেসাঁর সময় থেকেই এই ক্লথ হলের পরিচিতি। ১৫৫৫ সাল নাগাদ ফের একবার রেনেসাঁ সময়ের আভিজাত্যের অনুকরণেই এই ক্লথ হলকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ১৯৭৮ সাল থেকে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে পাকাপাকি জায়গা করে নিয়েছে। একসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল। নানা দেশের বণিকরা লেনদেন করতে জড়ো হতেন। কত আলাপ, আলোচনা চলত। পনেরো শতকে পূর্বের দেশগুলি থেকে মশলা, চামড়ার জিনিস, জামাকাপড় ইত্যাদির আদানপ্রদান চলত এই ক্লথ হলে।
[caption id="attachment_228738" align="aligncenter" width="674"]
জ্যাগিয়েলোনিয়ান ইউনিভার্সিটি[/caption]
ক্লথ হলের একদিকে পড়বে টাউন হল টাওয়ার। অন্যদিকে, সেন্ট অ্যাডালবার্ট চার্চ। সে পথ ধরে হাঁটলেই অ্যাডাম মিককিয়েউইজ মনুমেন্ট। ১৮৯৮ সালে তৈরি। ব্রঞ্জের তৈরি মনুমেন্টের মাথায় রোম্যান্টিক পোলিশ কবি অ্যাডাম মিককিয়েউইজের মূর্তি। ইতিহাস বলে এই স্মৃতিসৌধের নির্মাণ করেছিলেন সেই সময়ের এক স্বল্প পরিচিত স্থপতি টেওডর রিগিয়ার। এই মনুমেন্ট হল মেন স্কোয়ার মার্কেটের এক সন্ধিস্থল। ক্র্যাকোর মেন স্কোয়ার মানেই সেন্ট ব্যাসিলিকা চার্চ। ৮০ মিটার (২৬২ ফুট) উচ্চতা নিয়ে গথিক স্থাপত্য আজও শরীরে সাজিয়ে রেখেছে। চোদ্দ শতকে পোলিশ গথিক স্থাপত্যের যে বিকাশ হয়েছিল তার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় সেন্ট ব্যাসিলিকায়। প্রতি ঘণ্টায় চার্চের দুটো টাওয়ার থেকে ট্রাম্পেট ধ্বনি ভেসে আসে। দুপুরের খাবারের জন্য ওয়েসেলে রেস্তোরাঁর তুলনা হয় না। পোলিশ খাবারের স্বাদ চাখতে হলে এই রেস্তোরাঁয় ঢুকতেই হবে।
ক্র্যাকোর উত্তর দিকে রয়েছে রয়্যাল রোড বা রয়্যাল রুট। সেদিক থেকে শহরের কেন্দ্রস্থল হয়ে দক্ষিণে ওয়াওয়েল পাহাড় ওয়াওয়েল দুর্গের দিকে যাওয়া যায়। একটা ম্যাপ থাকলে রুট বুঝতে অনেক সুবিধা হবে। রয়্যাল রোড শুরু হচ্ছে সেন্ট ফ্লোরিয়ান’স চার্চ দিয়ে। চার্চ দেখে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসে গেলে মন জুড়িয়ে যাবে। এটা পড়বে ডান হাতে। এই রোড ক্রস করে বাসজ়োয়া স্ট্রিট ধরে মেডিভ্যাল বারবিকানে গিয়ে থমকে যেতে হয়। সেই ১৪৯৯ সাল থেকে রাজকীয় মেজাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ক্র্যাকোর ঐতিহাসিক মিউজিয়াম বারবিকান। এখানেও গথিক স্থাপত্যের আভিজাত্য।
[caption id="attachment_228739" align="aligncenter" width="650"]
ওয়াওয়েল দুর্গ[/caption]
উত্তর দিক ধরে এসে ফের মেন স্কোয়ার হয়ে দক্ষিণ-পূর্বে গ্রোজ়কা স্ট্রিট ধরে সোজা ওয়ায়েল পাহাড়। এখানেই রয়েছে পোলিশ রাজা তৃতীয় ক্যাসিমিরের সময় তৈরি বিখ্যাত ওয়াওয়েল দুর্গ। পোল্যান্ডের সবচেয়ে বড় দুর্গগুলির মধ্যে একটি। ইউরোপীয় স্থাপত্যের আধারে গড়ে উঠেছে। এই ওয়াওয়েল পাহাড়ের পাদদেশের গোটা এলাকাকাকেই ইউরোপীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র বলা হয়। প্রাচীন দুর্গ, ক্যাথিড্রাল আরও কত স্থাপত্য-ভাস্কর্যের ছড়াছড়ি।
ক্র্যাকো শহরে একসময় ছিল ভিস্তুলান আদিবাসীদের বাস। ৯৮৮ থেকে ৯৯০ সালের মধ্যে রাজতন্ত্র শুরু হয় ক্র্যাকোতে। ষোড়শ শতকের শেষ দিকটাকে পোল্যান্ডের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই সময় জ্যাগিয়েলোনিয়ান সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, স্থাপত্য সবদিক দিয়ে ইউরোপের সমৃদ্ধশালী দেশ হয়ে ওঠে পোল্যান্ড। তার ছাপ পড়ে ক্র্যাকো শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসীদের প্রভাব বেড়েছিল ক্র্যাকোতে। ১৮১৫ থেকে ১৮৪৬-এর মধ্যে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এই শহর।
[caption id="attachment_228740" align="aligncenter" width="652"]
ওয়েলিজ়কা সল্ট মাইন[/caption]
শহর থেকে ৩০ মিনিটের পথে ওয়েলিজ়কা সল্ট মাইন ঘুরে আসা যায়। ৩২৭ মিটার গভীর, এর চেম্বার চলে গেছে ২৮৭ কিলোমিটার পর্যন্ত। রাজা তৃতীয় ক্যাসিমির দ্য গ্রেটের সময় থেকেই এই খনি থেকে লবণ উত্তোলনের কাজ চলছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানরা এই খনিকে যুদ্ধের সরঞ্জাম তৈরির জন্য ব্যবহার করত। পোল্যান্ড ঘুরতে হলে এই নুনের খনি দেখতেই হয়। এর প্রাচীনত্ব আর ইতিহাস মিলেমিশে রয়েছে। এই খনির আরও একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এর ১০১ মিটার গভীরে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় ভূগর্ভস্থ চার্চ। সেন্ট কিংগা’স চ্যাপেল। রক সল্ট দিয়ে তৈরি। ইতিহাস বলে খনি শ্রমিকরাই তৈরি করেছিল এই চার্চ।
[caption id="attachment_228741" align="aligncenter" width="650"]
সেন্ট কিংগা’স চ্যাপেল[/caption]
মে থেকে জুন মাস হল ক্র্যাকো ঘোরার আদর্শ সময়। অথবা অক্টোবরের শুরুতে। ক্র্যাকো জন পল টু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ট্রেনেও যাওয়া যায় মূল শহরে। সময় লাগে ২০ মিনিটের মতো। শহর ঘোরার জন্য রয়েছে বাস ও ট্রামের সুব্যবস্থা। মেজর স্টপেজ গুলো থেকেই টিকিট কাটা যায়। উবার পরিষেবাও মেলে ক্র্যাকোতে।
পোলিশ ইতিহাসের সঙ্গে যদি পরিচিতি থাকে তাহলে ক্র্যাকো ঘোরার এক অন্য আমেজ চলে আসে। ইতিহাসকে প্রাণ ভরে অনুভব করা যায়। স্থাপত্য-ভাস্কর্যের অন্তরালে বয়ে চলা এক সংগ্রামী যুগের ছবি ভেসে ওঠে চোখের সামনে। মন হারিয়ে যায় অনেক দূরে।