
শেষ আপডেট: 16 March 2019 13:10
মধুরিমা রায়
নুন যত দেবেন তত আপনার গুণ গাইবে লোকে । আবার এই নুনই আপনার বিপদের কারণও হতে পারে। লোকে গুণ গাইলেও আদতে আপনার রোজের খাবারে নুনের পরিমাণ কতটা তা জেনে খান। নইলে আপনার ক্ষতিও করতে পারে এই আপাত নিরীহ সাদা গুঁড়ো। যার রাসায়নিক নাম সোডিয়াম ক্লোরাইড। ৪-১০ ই মার্চ আন্তর্জাতিক নুন সচেতনতা সপ্তাহ। গত ১১ বছর ধরে এই সময়ে সারা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে এই সার্ভে করা হয়। প্রতি বছর নতুন নতুন দেশে এই সার্ভে হয়। সেই সব সমীক্ষকদের একাংশ বলছেন, প্রতিটি মানুষ সারাদিনে ২.৩ গ্রাম নুন খেতে পারেন। যারা হাইপারটেনশনের রোগী, তাঁদের এক্ষেত্রে পরিমাণ আরও কম হলে ভালো হয়। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অরগানাইজেশন বা ‘হু’ আবার একটু ছাড় দিচ্ছে, বলছে সারাদিনে একজন মানুষ ৫ গ্রাম পর্যন্ত নুন খেতেই পারেন।
আমরা হোটেল রেঁস্তোরায় যে খাবার খাই বা প্রসেসড ফুডেই যখন ভরসা রাখি রোজকার ব্যস্ততায়, তখন ভেবে দেখি না এসব খাবারের মধ্যে থাকা নুনের পরিমাণ তা আসলে আমাদের ক্ষতি করছে। অনেক সময়ে আমরা রেঁস্তোরায় গেলেই সয়া সস্ খাই প্রচুর পরিমাণে, তাতে যে পরিমাণ সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকে তা সাঙ্ঘাতিক ক্ষতি করতে পারে আমাদের। আর বীট, পালংশাক, গাজর, চিকেন, বীফ, ভেজটেবল স্টক, মোজ়ারেলা ইত্যাদি খাবারে স্বাভাবিকভাবেই সোডিয়াম থাকে। আর যখনই পাঁউরুটি, ভাত, পাস্তা খাবেন, চেষ্টা করতে হবে সবকটাই যাতে হোলগ্রেন হয়। এতে যে স্টার্চ থাকে তা রক্ত থেকে বাড়তি সোডিয়াম শুষে নেয়। আবার পাস্তা, নুডলস, আলু সেদ্ধ করার সময়ে নুন দেবেন না তাতে। কারণ এগুলোতে এমনিই অনেকটা সোডিয়াম ক্লোরাইড থাকে।
রান্নায় নুন কম ব্যবহার করতে চাইলে, ব্যবহার করুন লেবুর রস, আদা, রসুন, লঙ্কা, টোম্যাটো পিউরি। তাছাড়াও পার্সলে, ধনেপাতা, পুদিনা, গরম মশলা, জিরে যত দেবেন নুন লাগবে ততটাই কম। এই পার্সলে, ধনেপাতা চাইলে আপনি ফ্রিজেও রাখতে পারেন, টাটকা থাকবে বহুদিন।
আমেরিকার হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের রিপোর্ট অনুযায়ী শতকরা ৭৫ ভাগ সোডিয়াম থাকে প্যাকেজড ফুড, ক্যানড ফুড এবং প্রসেসড ফুডে। এগুলো যত এড়িয়ে চলবেন ততই ভালো। এই সংগঠনের মতে আমরা প্রতিদিন যদি গড়ে ৮ গ্রামের বদলে ৬ গ্রাম নুন খেতে পারি, (হু বলেছে ৫ গ্রাম) তা হলে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক থেকে ৮ হাজার প্রিম্যাচিওর মৃত্যু (যে মৃত্যু ৭০ বছরেরে আগে ঘটে) আটকাতে পারি।
বেশি নুন খেলে আপনার কী কী ক্ষতি হতে পারে, জেনে নিন----
১. কার্ডিওভাসক্যুলার ডিসিজ় বা হৃৎপিণ্ডের সমস্যা অতিরিক্ত নুন খেলে বেড়ে যায় স্ট্রোক এবং যে কোনও কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের সম্ভাবনা। ২.ব্রেন বা মস্তিষ্কের সমস্যা নুন যত খাবেন, আপনার টেনশন বাড়বে তত লাফিয়ে লাফিয়ে। এতে বয়স্কদের সমস্যা কমে তো না, বরং মাথার যন্ত্রণা বাড়তে থাকে এবং সেটা রোজের অভ্যাস হয়ে যায়। ৩. ইডিমা নুন যত খাবেন, শরীরের অপ্রয়োজনীয় সোডিয়াম জলের আকারে রক্তে জমবে, সঙ্গে হাঁটু, পা এবং হাতের পাতার চামড়া ফেটে সেই রস গড়াতে থাকবে। ফলে ইডিমা থেকে বাঁচতে হলে নুন খাওয়া কমাতেই হবে। ৪. স্বাদকোরকের সমস্যা দীর্ঘদিন বেশি নুন খেতে খেতে আপনার টেস্টবাডগুলোই বদলে যায়। ফলে কোনওমতেই সঠিক স্বাদ আপনি পান না। তাই অন্য খাবারের স্বাদ পেতে চাইলে আপনাকে নুন খাওয়া কমাতেই হবে। ৫.স্টম্যাক ক্যানসার আপনি সসেজ়, বেকন খেতে খেতে যখন সেগুলোর নোনা স্বাদে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন, বোঝেন না যে, এই খাবারগুলো আপনার স্টম্যাক ক্যানসারের কারণ হতেই পারে। আর সমীক্ষা বলছে মহিলাদের তুলনায় পুরুষরা এক্ষেত্রে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। ৬.কিডনি কিডনির কাজই হল শরীরের তরলগুলো ব্যালেন্স করে লোহিত রক্তকণিকার উৎপাদন সঠিক রাখা। কিন্তু বেশি নুন খেলেই কিডনির কাজ করার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে দেহের টক্সিনগুলো শরীর থেকে বেরোয় না। সমস্যা বাড়ে ।
তবে এই ভয়ে নুন খাওয়া পুরোপুরি কমাতে হবে না। কারণ তাতেও সমস্যা হতে পারে শরীরে। সেগুলো কী কী? শরীরের পেশী সংকোচন, নার্ভের সংক্রমণ আটকাতে এবং পটাসিয়ামের মতো অন্যান্য ইলেক্ট্রোলাইটগুলির সঙ্গে একসঙ্গে শরীরের জলীয় পদার্থের নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদের দেহ সোডিয়ামের উপর নির্ভর করে। তাই বেঁচে থাকতে আলুনি থাকা যাবে না।তা হলে আমরা আম বাঙালি কী করব?
কলকাতার বিশিষ্ট এম.ডি. রণবীর ভৌমিক বলছেন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুর তফাতের জন্য এক এক জনের শরীর এক একভাবে সাড়া দেয়, তাই এস্কিমোদের শরীর থেকে যতটা ঘাম বেরিয়ে যায় ততটা আবার আমাদের যায় না। আবার দক্ষিম আফ্রিকার লোকেদের যতটা জল বেরোয় সেটা আমাদের হয় না। তবে প্রতিদিন ৬ গ্রামের বেশি কখনোই নুন খাওয়া ঠিক নয়। আবার একেবারে বন্ধও করবেন না নুন। তাতে হিতে বিপরীতই হবে। ছোট থেকে নুন বা চিনি খাওয়ার অভ্যাস অনেকেই করে না, সেটা স্বাদকোরকের সমস্যা না করলেও শারীরিক সমস্যা ঘটাতেই পারে। তাই নুনের গুণ জেনে নিয়ে খাবার প্লেটে নিতেই পারেন পরিমিত ভাবে।