
শেষ আপডেট: 30 April 2020 18:30
তামাকের সঙ্গে কোভিড সংক্রমণের সম্পর্ক আছে কিনা সেটা এখনও গবেষণার স্তরে। ধূমপান সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা বাড়ায় সে নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা, সার্স-কভ-২ ভাইরাস যেহেতু ফুসফুসের সংক্রমণের জন্য দায়ী এবং এই ভাইরাসের প্রভাবে অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিনড্রোমে আক্রান্ত হন রোগী, তাই ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর যে কোনও কিছুই ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়াতে পারে। তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে সিগারেট তথা তামাকজাত পণ্য।
গবেষকদের একাংশ বলছেন, ধূমপায়ীদের করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ সিগারেট এমনভাবে ফুসফুসের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতাকে তছনছ করে দেয় যে, ভাইরাস সহজেই সংক্রামিত করতে পারে শ্বাসযন্ত্রকে। আর সার্স-কভ-২ ভাইরাস যেহেতু প্রথমেই ফুসফুসকে তাদের নিশানা বানায়, তাই বলাই যেতে পারে যাদের এই অঙ্গটির রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদেরই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অধিক ধূমপানের কারণে ফুসফুস শুধু দুর্বলই হয় না, নানা রোগ বাসা বাঁধে সেখানে। সিগারেটের ধোঁয়া এমনিতেই ফুসফুসের বারোটা বাজিয়ে রাখে, তার উপর ভাইরাল স্ট্রেন সেখানে ঢুকলে তাদের পক্ষে গোটা ফুসফুসকে কব্জা করে নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
বিশ্বজুড়েই বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, সার্স-কভ-২ ভাইরাস নাক, মুখ দিয়ে ঢুকে শ্বাসনালীকে প্রথম আক্রমণ করে। কারণ নাক, মুখ ও গলায় থাকে গবলেট কোষ। এই কোষের সারফেসে রিসেপটর এসিই-২ প্রোটিন ভাইরাসদের বিশেষ পছন্দের। এই প্রোটিনের সঙ্গে ভাইরাল স্পাইক গ্লাইকোপ্রোটিন জোট বেঁধেই কোষে সরাসরি প্রবেশ করে। শ্বাসনালী দিয়ে তারা পৌঁছয় ফুসফুসে। যেসব কোষে ওই রিসেপটর প্রোটিন আছে সেখানেই ঢুকে ভাইরাসের বাড়বৃদ্ধি শুরু হয়। তবে ফুসফুসেরও একটা প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। সব কোষকে সমানভাবে সংক্রামিত করতে পারে না ভাইরাস। কিন্তু দেখা গেছে, যাদের ফুসফুসের অবস্থা আগে থেকেই বেহাল, সেটা হতে পারে ধূমপান বা অন্য শ্বাসযন্ত্রের রোগের কারণে, তাদের ক্ষেত্রে ভাইরাস মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে ফুসফুসে। যার কারণেই শুরু হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। এমনও বলা হচ্ছে, যিনি ধূমপান করছেন তাঁর শরীরে যদি ভাইরাস থাকে তাহলে ধোঁয়ায় বা ধূমপায়ীর লালার কণার ভর করে সেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে আশপাশে। অ্যারোসল বা বাতাস বাহিত কণায় এই ভাইরাস চার ঘণ্টারও বেশি বেঁচে থাকতে পারে বলেই জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণাও এমনও তথ্য সামনে এসেছে যে, ধূমপানের কারণে যদি ‘ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ’ বা ‘সিওপিডি’ নামের রোগ হয়ে থাকে, তাহলে ভাইরাস সেই শরীরে ঢুকলে তার বাড়বাড়ন্ত অনেক বেশি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) রিপোর্ট বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে সিওপিডি-তে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা কয়েক কোটি। প্রতি ১০ সেকেন্ডে সিওপিডি-তে আক্রান্ত হয়ে এক জন রোগীর মৃত্যু হয়। হু প্রকাশিত ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন এগেনস্ট সিওপিডি’ এবং ‘সিওপিডি ফাউন্ডেশন’-এর যৌথ সমীক্ষা রিপোর্টেও দেখা গেছে, অধিক ধূমপান, বাতাসের দূষণ এই সিওপিডি-র জন্য দায়ী। যাঁরা বেশি সিগারেটে আসক্ত তাঁদের সিওপিডি-র ঝুঁকি অনেক বেশি। কী কী উপসর্গ দেখা দেয় সিওপিডি-তে? ক্রমাগত কাশি, রাতে কাশির দমকে ঘুম ভেঙে যাওয়া, সিঁড়ি বা উঁচু জায়গায় ওঠানামার ক্ষেত্রে বুকে চাপ অনুভব করা বা শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া, বুকের মধ্যে সাঁইসাঁই করা। কোভিড-১৯ সংক্রমণের উপসর্গগুলোও অনেকটা এমনই।
ধূমপানে কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বাড়ে। কোভিড সংক্রমণেও রোগীদের হৃদরোগের আশঙ্কা বাড়ে। সার্স (SARS-CoV) ও মার্স (MERS-CoV) সংক্রমণের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছিলেন শ্বাসযন্ত্রের রোগই শুধু নয় রোগী আক্রান্ত হচ্ছেন হৃদরোগেও। হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, রক্তচাপের তারতম্য এমন উপসর্গ দেখা গেছে। কোভিড সংক্রমণেও এই উপসর্গগুলিই ধরা দিয়েছে রোগীদের মধ্যে। গবেষণা বলছে, শ্বাসযন্ত্রকে অকেজো করে সার্স-কভ-২ ভাইরাস হানা দেয় হৃদপিণ্ডেও। হৃদপেশীর মধ্যে ঢুকে সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে। এমনকি ভাইরাসের প্রকোপে হৃদপিণ্ডে রক্ত জমাট বেঁধে মৃত্যু হতেও দেখা গেছে। আর ধূমপান যেহেতু কারিডওভাস্কুলার রোগের জন্য দায়ী, তাই এক্ষেত্রে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়।
ধূমপানের সঙ্গে কোভিড সংক্রমণের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই থাক না কেন, অধিক ধূমপান যে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেঙে দেয় সেটা নতুন করে বলার কিছু নেই। আর দুর্বল শরীর মানেই ভাইরাসকে বাধা দেওয়ার মতো সুরক্ষাকবচ থাকে না, ফলে ভাইরাস ইচ্ছামতো নিজের প্রতিলিপি বানিয়ে চলে এবং ধীরে ধীরে গোটা শরীরেই তার সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়।