পৃথিবীতে বহু মানুষই অস্থিসন্ধি বা গাঁটের ব্যথার অসুখে কষ্ট পান। কেউ ভাবেন আর হয় তো সুস্থ সুন্দর করে চলা ফেরা করতে পারবেন না। আবার কেউ অপারেশনের কথা শুনলে মনে মনে ভয়ে থাকেন। কিন্তু সত্যিই কি বিষয়টা এতটা জটিল? নাকি কিছু ক্ষেত্রে ওষুধেও সমস্যা মিটতে পারে? কিংবা কারও অপারেশন করাতে হলে, সে হয় তো আরও বেশ কিছু বছর সুন্দর করে হাঁটা চলা করতেও পারেন। এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ‘দ্য ওয়াল’কে দিলেন বিশিষ্ট অর্থোপেডিক জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট অ্যাণ্ড স্পাইন সার্জেন নির্মল কুমার জাজোদিয়া
দ্য ওয়াল: আর্থ্রাইটিস কী?
ডঃ জাজোদিয়া: সহজ কথায় যাকে আমরা বাত বলি, সেটাই তো আর্থ্রাইটিস। সাধারণত হাঁটু, কনুই, আঙুলের গাঁট, হিপ জয়েন্ট (উরু সন্ধি বা জঙ্ঘাসন্ধি)তে এই ব্যথা হয়। বয়স্ক মানুষদের মধ্যে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশি হলেও, কিছু ক্ষেত্রে অপ্রচলিত বাতের অসুখে কিশোর কিশোরীরাও ভোগে।
দ্য ওয়াল: অস্থসন্ধি কী?
ডঃ জাজোদিয়া: দুটি হাড়ের সংযোগ স্থল। এই সংযোগ স্থলের স্বাভাবিক থাক অবস্থায় কোনও সমস্যা হয় না। তবে এখানে সমস্যা হলেই আমাদের হাত পা নাড়তে অসুবিধা হয়। আমাদের শরীরের হাড় বা অস্থির প্রান্তগুলো তরুণাস্থি দিয়ে ঢাকা থাকে। অস্থিসন্ধির দুটো হাড়ের মাঝে একধরণের গাঢ় তরল থাকে। এই তরলকে বলা হয়, ‘সাইনুভিয়াল ফ্লুইড’। এই ফ্লুইড তাকে বলে আমাদের শরীরের হাড়গুলো সহজে নড়াচড়া করে। কোনও ঘর্ষণ হয় না। কিন্তু এই ফ্লুইড যখনই কমে যায়, তখনই সমস্যা শুরু হতে থাকে। হাড়ে হাড়ে ঘর্ষণ শুরু হয়। ব্যথা হয়।
দ্য ওয়াল: আর্থ্রাইটিসে ঠিক কী হয়?
ডঃ জাজোদিয়া: দু ধরণের আর্থ্রাইটিস হয়।
১. অস্টিও আর্থ্রাইটিস: বয়স, পুরনো আঘাত বা অন্য অসুখের কারণে অস্থিসন্ধির ক্ষয়ের কারণে গাঁটে ব্যথা, ফোলা ভাব বা আড়ষ্টভাব, সন্ধিটি ঠিকমতো নড়াচড়া করতে সমস্যা হয়।
২. রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিস: শরীর নিজে থেকেই এই সমস্যায় পড়ে অনেক সময়ে। অস্থিসন্ধি ফুলে ওঠে, ব্যথা হয়। বারবার শরীরের এই সমস্যা হলে অস্থিসন্ধিগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়। সারা শরীরেই একটা প্রদাহ করে।
জানুন ডাক্তারবাবু আরও কী বলছেন....
https://www.youtube.com/watch?v=1rhst19boMA
দ্য ওয়াল: অসুখের চিকিৎসা কী কী হতে পারে?
ডঃ জাজোদিয়া: কিছু বাতের ব্যথা সাময়িক হয়, দীর্ঘমেয়াদী কোনও সমস্যা হয় না সেক্ষেত্রে। তবে কিছু ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসা দীর্ঘকাল ধরে চলে। এখন কার কতদিন চিকিৎসা লাগবে, তা তাঁর রোগের ধরণের উপর নির্ভর করবে। তবে জীবন যাত্রার ধরণ এক্ষেত্রে অনেকটাই নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়।
দ্য ওয়াল: কোনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় কি?
ডঃ জাজোদিয়া: রক্ত পরীক্ষা এবং এক্সরে করা হয়, যেখানে ব্যয় খুব একটা একেবারেই নয়। বাকিটা রোগের উপসর্গ এবং লক্ষণ দেখে করা হয়।
দ্য ওয়াল: আর্থ্রাইটিস কি নিরাময় করা যায়?
ডঃ জাজোদিয়া: না , পুরোপুরি সারিয়ে ফেলা যায় না। তবে, অসুখ যাতে না বেড়ে যায়, সেদিকে নজর রাখা যায়। নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপনের ফলে সহজে এই ব্যথাকে বাগে আনা যায়।
দ্য ওয়াল: এই অসুখে কী কী ধরণের চিকিৎসা আছে?
ডঃ জাজোদিয়া: ১. ব্যায়াম আপনার অসুস্থ সন্ধিরগুলোর চারপাশের পেশীকে শক্তিশালী করে দেয়। তাই সন্ধির সচলতা অনেকটাই বজায় থাকে। তবে এক্ষেত্রে আপনার ফিজিওথেরাপিস্ট এবং ডাক্তারের পরামর্শ ভীষণ জরুরি। ২. নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। নইলে আপনার অতিরিক্ত ওজন গাঁটে গাঁটে ব্যথা বাড়াবে। ৩.যে জুতো পরে হাঁটা চলা করবেন, সেটা যাতে আপনার জন্য যথেষ্ট স্বস্তিদায়ক হয়, সেদিকে নজর রাখবেন। নইলে সমস্যা বাড়বে। ৪.এ সময় প্রয়োজনে লাঠি নিয়ে হাঁটবেন, তাতে যে সব অস্থিসন্ধি ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, সেগুলো আর চাপে পড়বে না। একটু হলেও কষ্ট কমবে আপনার। ৫.প্রয়োজনে সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন ফিজিওথেরাপি করুন। অস্থিসন্ধির সমস্যায় এটা খুবই কাজে দেয়।
দ্য ওয়াল: আর্থ্রাইটিসের সমস্যায় কী কী ওষুধ ব্যবাহর করা হয়?
ডঃ জাজোদিয়া: এক্ষেত্রে রোগের প্রকোপ বুঝে, প্যারাসিটামল থেকে, পেন কিলার (যা অবশ্যই স্টেরয়েড নয়), আবার কখনও অস্থিসন্ধিতে স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন, গ্লুকোজামিন, কণ্ড্রয়েটিন, উদ্ভিজ ক্রিম বা জেল—সবই ব্যবহার করা হতে পারে।
দ্য ওয়াল: কখন এবং কেন অপারেশনের দরকার পড়ে? সেই অপারেশনই বা কেমন হয়য়?
ডঃ জাজোদিয়া: উপরে বলা উপায়গুলোতে ব্যথা না কমলে অপারেশনের দরকার হয়। তীব্র ব্যথা হলে অপারেশন করতেই হয়। হাঁটু প্রতিস্থাপন বা নি রিপ্লেসমেন্ট যখন করা হয় তখন খরচ মোটামুটি ২ লক্ষ টাকার মধ্যেই হয়ে যায়। আর ৫ থেকে ৬ দিনের মধ্যে রোগীকে ছেড়েও দেওয়া হয় হাসপাতাল থেকে। তাঁদের সেই পাঁচ থেকে ছটা দিন তাঁকে ডিপ অবসার্ভেশনে রাখা হয়। এ সময়ে কিছু রক্ত পরীক্ষা এবং এক্সরে আগেই করে ফেলতে হয়। তারপরেই এই অপারেশন করা হয়। কারও ব্লাড প্রেশার এবং সুগার বেশি থাকলে, বা ক্যানসারের মতো রোগ থাকলে, অনেক ভেবে চিন্তে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। চেষ্টা করা হয়, ওষুধেই যদি সারিয়ে ফেলা যায়। কিছুই করার না থাকলে শেষ পর্যন্ত অপারেশন করতে হয়।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়