
শেষ আপডেট: 21 March 2019 18:30
মেদিনীপুর-বাঁকুড়া রেললাইনে বিষ্ণুপুরের দুটি ষ্টেশন আগে গড়বেতা ষ্টেশন। হাওড়া থেকে দূরত্ব ১৭৬ কিলোমিটার। রেলস্টেশন থেকে মাত্র ৬ কিলোমিটার দূরে কলেজ ছাড়িয়ে বাঁ দিকে নেমেছে লালমাটির রাস্তা। তির চিহ্ন দিয়ে লেখা গনগনির মাঠ।
পিচরাস্তা ছেড়ে মাটির পথে ছোট স্টেডিয়াম ছাড়িয়ে আসতেই শুরু হয় দুপাশে সবুজ পাতায় ছাওয়া কাজুবাদামের বাগান। আরও খানিকটা হেঁটে এসে পৌঁছে যাওয়া যায় গাছপালাহীন রুক্ষ প্রান্তরে যেটাকে মালভূমির অংশ বলা যায়। এখান থেকেই বেরিয়ে এসেছে অনেকগুলি বারান্দার মতো অংশ। এরকমই একটি ছোট বারান্দার সামনে দাঁড়ালেই ভেসে উঠবে এক অনন্যসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। এক উচ্চ গিরিখাত সৃষ্টি করে প্রায় ২০-২৫ মিটার নীচ দিয়ে অসংখ্য বাঁক নিয়ে শান্ত ভাবে একাকী বয়ে চলেছে শিলাবতী।
প্রশ্ন হল কীভাবে এখানে গিরিখাতের সৃষ্টি হল? গবেষকদের মতে শিলাবতী নদীর তীরে প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে প্রাগৈতিহাসিক যুগের ল্যাটেরাইট মাটির যে উচ্চভূমি আছে তা একসময় টানা সুসংবদ্ধ ভূমি ছিল।আবহবিকারের ফলে বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিটার গভীর গিরিখাতের সৃষ্টি হয়েছে।
বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে নদীর চরে নামলে গনগনির আসল রূপ আবিষ্কার করা যায়। মাটির রঙ যে এত বর্ণময় বা বিচিত্র হতে পারে তা এখানে না এলে বিশ্বাস হয় না। ওপর দিক থেকে কালচে লাল হয়ে গাঢ় লাল, কফি রঙ, গেরুয়া, সোনালি কখনও বা সাদা রঙের বর্ণালী। ভূমিরূপেরও বৈশিষ্ট্য এক এক জায়গায় এক একরকম। শক্ত পাথুরে দেওয়াল ক্ষয়ে ক্ষয়ে গিয়ে ফুটে উঠেছে অদ্ভুত সব নকশা। হাঁ করে অপলক চোখে মুগ্ধ হয়ে দু–দণ্ড দাঁড়িয়ে দেখতে হয় কোনও অজানা শিল্পীর অদৃশ্য হাতে গড়া সব নিপুণ ভাস্কর্যের নমুনা। কল্পনার মিশেলে দেখে নেওয়াই যায় কোথাও খিলান, কোথাও স্তম্ভ, কোথাও বা দুর্গ। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে মেদিনীপুরের মাঠগুলো জ্বলতে থাকে। চৈত্র-বৈশাখে দুপুরের প্রখর সূর্যতাপে কাঁকুরে মাটির বিশাল বিশাল ঢেউয়ের মাঝখান থেকে যেন গনগনে হলকা বেরোতে থাকে, তাই গনগনির মাঠ সার্থকনামা।
গনগনির রূপ–রঙ সকাল, বিকেল ও গোধূলিবেলায় বদলায়। সূর্যোদয়ের পরে ও সূর্যাস্তের আগে গনগনির সৌন্দর্য বড় মায়াময়। নদীখাতের রঙিন বর্ণালী এক অপার্থিব জগতে নিয়ে যায়। নদীর অপর পার অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত আর ঘন সবুজে ভরা। শরতে কাশের সৌন্দর্য বড় মোহময়।
ঐতিহাসিক এই মাঠে জড়িয়ে রয়েছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণবিদ্রোহের স্মৃতি। এই বিদ্রোহকে ব্রিটিশরা চুয়াড় বিদ্রোহ আখ্যা দিয়েছিল। চুয়াড় বিদ্রোহের নায়ক অচল সিং–কে এই মাঠেই ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। তাই এই মাঠে আসার পথে যে স্টেডিয়াম পড়ে তার নাম অচল সিং স্টেডিয়াম। স্টেডিয়ামের অডিটোরিয়ামটি বিশাল। বাগানটি ফুলে ফুলে ভরা। বিশেষ করে গোলাপ বাগানের সৌন্দর্য অতুলনীয়।
অসংখ্য কিংবদন্তী এই গনগনির মাঠ ঘিরে। গড়বেতার এই অঞ্চলটি ছিল বগড়ি পরগনার অন্তর্ভুক্ত। বগড়ি শব্দটি এসেছে বকডিহি বা বকদ্বীপ থেকে। কুখ্যাত বকরাক্ষস ছিল এই বকদ্বীপের অধীশ্বর। এই মাঠেই মধ্যম পাণ্ডব ভীম বকরাক্ষসকে নিহত করেন। পাথর হয়ে পড়ে থাকা প্রাচীন টুকরোকে স্থানীয় মানুষেরা বকরাক্ষসের হাড় বলে এখনও মনে করে থাকেন। শুধু তাই নয়, ওই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে আজও এখানকার আদিবাসী সমাজে ভীমের পুজোর প্রচলন রয়েছে।
গড়বেতার অন্যতম প্রাচীন কীর্তি ও সেরা আকর্ষণ হল গড়েশ্বরী দেবী সর্বমঙ্গলার পাথরের মন্দির। যেহেতু মন্দিরটি রায়কোট দুর্গের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত সেহেতু দেবীকে গড়েশ্বরী বলে অভিহিত করলে খুব একটা অত্যুক্তি হয় না। মন্দির সম্পর্কে নানারকম গল্প চালু আছে। কে বা কারা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার সবই প্রায় অজানা। তবে স্থাপত্যের বিচারে মন্দিরটি ষোড়শ শতকের বলে মনে করা হয়। বগড়ির রাজা গজপতি সিংহকেই এই মন্দিরের নির্মাতা বলে অনেকে মনে করেন। মন্দিরটির গঠনশৈলী বেশ অদ্ভুত রকমের। মন্দিরটি নাকি আগে দক্ষিণমুখী ছিল। জনশ্রুতি, মহাতান্ত্রিক উপেন্দ্র ভট্টের অলৌকিক ক্ষমতাবলে মন্দিরটি উত্তরমুখী হয়ে গেছে। সাধারণত হিন্দু মন্দিরের দরজা উত্তরমুখী হয় না।
মন্দিরটির যে অংশে চণ্ডীপাঠ হয় সেটিই নাটমন্দির নামে পরিচিত। পুব দিকে ঢোকার যে দরজা রয়েছে তার উপরের ঘরটি নহবতখানা। মূল দরজা দিয়ে প্রায় ৩০ হাত সুড়ঙ্গপথ অতিক্রম করে গেলে তবেই দেবীর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। প্রায় ৫ ফুট উঁচু কালো পাথরে খোদিত সিংহবাহিনী মূর্তিটিই দেবী সর্বমঙ্গলার। দেবীর মূর্তি তেজোদীপ্ত। পাশেই রয়েছে পঞ্চমুণ্ডির আসন। কথিত আছে যে রাজা বিক্রমাদিত্য (ইনি উজ্জয়িনীর বিক্রমাদিত্য নন, সম্ভবত দাঁতনরাজ বিক্রমকেশরী), রাজা গজপতি প্রমুখ এই পঞ্চমুণ্ডির আসনে বসেই সিদ্ধিলাভ করেছিলেন।
এখানকার বড় উৎসব শারদীয়া পুজো। নবমীতে ছাগ ও মোষ বলি হয়। বহুকাল আগে মহাষ্টমীর রাতে এখানে নরবলি হত বলে জনশ্রুতি রয়েছে। দেবী জাগ্রত বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস। অন্নভোগ দিয়ে দেবীর নিত্যপূজা হয়।
গড়বেতা, বিষ্ণুপুর, চন্দ্রকোণা রোড বা মেদিনীপুর শহরে রাত্রিবাস করে জায়গাটি দেখে নেওয়া যায়।
গড়বেতার রাত্রিবাসের কয়েকটি ঠিকানা হল ––
সোনাঝুরি গেস্টহাউস: ৯৫৪৭৫১৪০৩০
স্টার গেস্টহাউস: ৮১০১২৮০৩৯৮।
আরও পড়ুন
https://www.four.suk.1wp.in/travelogue-rural-bengal-holi-festival-habibpur-iskon-temple-in-nadia/