
শেষ আপডেট: 2 July 2019 08:02
প্রশ্নঃ প্রস্টেট ক্যানসার হু হু করে বাড়ছে। এটা সত্যি?
উত্তরঃ সত্যি তো বটেই। পুরুষদের ক্ষেত্রে শীর্ষে থাকা স্কিন ক্যানসারের পরেই দ্বিতীয় স্থানে আছে প্রস্টেট ক্যানসার। যা দ্রুত এগোচ্ছে। উল্লেখ্য ২০০১ সাল থেকে ২০১১, এই দশ বছরে ভারতীয় নাগরিকদের গড় আয়ু যেখানে ৬১.৯৭ থেকে ৬৫.৪৮ হয়েছে, সেখানে প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্তদের সংখ্যাটা প্রতি বছরে ১ শতাংশ হারে বাড়ছে।
প্রশ্নঃ এ তো ভয়ানক তথ্য?
উত্তরঃ শুনলে অবাক হবেন বিশ্বে প্রতি আড়াই মিনিটে একজন মানুষের প্রস্টেট ক্যানসার ধরা পড়ছে। আর প্রতি ১৭ মিনিটে ক্যানসারে আক্রান্ত এই মানুষদের একজনের মৃত্যু হচ্ছে। প্রস্টেট ক্যানসার খুব ধীরে ধীরে এগোয়। তাই যে কোনও স্টেজে ধরা পড়া প্রস্টেট ক্যানসারের ৫, ১০ ও ১৫ বছরের সার্ভাইভাল রেট যথাক্রমে ৯৮ শতাংশ, ৮৪ শতাংশ ও ৫৬ শতাংশ। আমেরিকায় গত কয়েক বছর আগেও এই ক্যানসার হওয়ার পরে পাঁচ বছরে বেঁচে থাকার হার ছিল ৯৯.২ শতাংশ । সেটা কমে যাওয়াতে আগের চেয়ে অনেক বেশি মানুষ এই রোগে মারা যাচ্ছেন।
প্রশ্নঃ ধূমপান করলে ঝুঁকি বেশি?
উত্তরঃ ধূমপান করলে লাং ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি এমনটাই জানা ছিল। এখন বলা হচ্ছে ধূমপান করেন না এমন একজন পুরুষের প্রস্টেট ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি লাং, ব্রঙ্কাস, কোলোন, রেক্টাল, ব্লাডার, লিম্ফোমা, মেলানোমা, ওরাল ও কিডনি ক্যানসারের মিলিত সম্ভাবনার চেয়েও বেশি।
প্রশ্নঃ তবে কি কোনও আশার আলো নেই?
উত্তরঃ প্রস্টেট ক্যানসার নিয়ে এত নেগেটিভ কথা শুনলেও আমাদের কাছে কিন্তু আশার আলো আছে। তা হল, চিকিৎসা পদ্ধতির নানা উন্নতির কারণে প্রস্টেট ক্যানসার ঠিক সময়ে ধরা পড়লে প্রায় নিশ্চিত ভাবে এর নিরাময় সম্ভব। উন্নত রোবোটিক সার্জারি তার অন্যতম উদাহরণ।
প্রশ্নঃ প্রস্টেট ক্যানসার বোঝার তবে উপায় কি?
উত্তরঃ প্রস্টেট ক্যানসার নির্ধারণের সবচেয়ে মস্ত বড় হাতিয়ার পি এস এ (প্রস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন)। মানুষের স্বাভাবিক অবস্থায় রক্তের পি এস এ-র মাত্রা এক থেকে চার- এর মধ্যে থাকে। ধরা যাক, পি এস এ পরীক্ষার পর যদি দেখা যায় তা বেড়ে গিয়ে চার থেকে দশ এর মধ্যে আছে, তাহলে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে প্রতিমাসে একবার করে পি এস এ পরীক্ষা করে দেখে নিতে হবে সেটির কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কিনা। যদি দেখা যায় তা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, তাহলে ব্যবস্থা নিয়ে হবে। আর তখনই ক্যানসারের সন্দেহ বাড়তে থাকে। প্রথমেই এই মাত্রা খুব বেশি হলে (যেমন ১০০-২০০) তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ প্রস্টেট ক্যানসার হলে পি এস এ মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায়।
প্রশ্নঃ শুধু ক্যানসার হলেই পি এস এ বাড়ে?
প্রশ্নঃ রোগটিকে ক্যানসার হিসেবে ঘোষণার আগে আরও কিছু শারীরিক পরীক্ষা করা দরকার। কারণ ক্যানসার ছাড়া আরও কয়েকটি কারণেও পি এস এ বাড়ে। যাই হোক, এইসময় যে পরীক্ষা করা হয় তার নাম ডিজিটাল রেক্টাল এগজামিনেশন (ডি.আর.ই.)। এই পরীক্ষার ফলাফলে সন্দেহ হলে রোগীকে ইমেজিং পরীক্ষায় পাঠানো হয়। একেবারে প্রথমে যে ইমেজিং করা হয় তার নাম ট্র্যান্স রেক্টাল আল্ট্রাসাউন্ড (ট্রাস)। এই পরীক্ষার সুবিধা হল, পরীক্ষা চলাকালীন এফ এন এ সি (ফাইন নিডল অ্যাসপিরেশন সাইটোলজি)-র প্রয়োজন হলে প্রস্টেট থেকে ছোট কিছু অংশ সূচের সাহায্যে তুলে আনা যায়।
প্রশ্নঃ প্রস্টেটের এফ এন এ সি - র কথা বললেন, সেটা আসলে কী?
উত্তরঃ প্রস্টেটের এফ এন এ সি অত্যন্ত যত্ন সহকারে করা উচিত। কোনও কারণে নিডলটি ঠিকভাবে টিউমারে আঘাত না করলে বায়োপসির রিপোর্ট ভুল আসতে পারে। অবশ্য আজকাল এম আর আই অব প্রস্টেট থেকে কোলিনের মতো কিছু বায়োকেমিক্যাল মার্কার দেখেও এই ব্যাপারে একটা ধারণা করা যাচ্ছে। সুতরাং ক্যানসার শনাক্ত করার জন্য এখন নানা ব্যবস্থাও আছে। এরপরে গ্লিসান স্কোরের সাহায্য নিয়ে দেখা হয় রোগটি কোন স্টেজে রয়েছে। অর্থাৎ রোগটি প্রস্টেটেই আবদ্ধ, নাকি অন্য অঙ্গেও ছড়িয়েছে? এর জন্য অ্যাবডোমিনাল সিটি স্ক্যান বা এম আর আই করতে হয়। এছাড়াও আইসোটপ করতে হয়। আইসোটোপ বোন স্ক্যান করে রেডিও অ্যাক্টিভিটির সাহায্যেও রোগ হাড়ে ছড়িয়েছে কিনা বোঝা সম্ভব।
প্রশ্নঃ এর পরে তবে চিকিৎসা?
উত্তরঃ গ্রেড ও স্টেজ বিচার করে নানা পদ্ধতিতে প্রস্টেট ক্যানসারের চিকিৎসা করা হয়। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা হল, ক্যানসারের গ্রেড ও স্টেজ কমের দিকে থাকলে বহু ক্ষেত্রে ওষুধ দেওয়া হয় না। এই সময়ে চলে কড়া নজরদারি এবং অপেক্ষা। এর জন্য বারে বারে সোনোগ্রাফি, পি এস এ পরীক্ষা ও ডি আর ই করতে হতে পারে।
প্রশ্নঃ সার্জারি প্রয়োজন হতে পারে?
উত্তরঃ প্রস্টেট ক্যানসারের গ্লিসান স্কোর ৬ থেকে ৭ এর মধ্যে হলে এবং ক্যানসারের বিস্তার অন্য কোথাও ছড়িয়ে না পড়লেও শুধুমাত্র গ্ল্যান্ডে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রস্টেট গ্ল্যান্ডটিকেই সার্জারির সাহায্যে নির্মূল করে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। সবচেয়ে বড় কথা, অস্ত্রোপচারের জটিলতা এড়াতে আজকের দিনের অত্যাধুনিক পদ্ধতি রোবোটিক সার্জারির কথা ভাবা যেতে পারে।
প্রশ্নঃ রোবোটিক সার্জারি? এই পদ্ধতি কি তবে খুব সহজ বলছেন?
উত্তরঃ হ্যাঁ। এই পদ্ধতির সাহায্যে একজন সার্জেন প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অস্ত্রোপচারের অনেক জটিল পরিস্থিতি অতি সহজেই এবং সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করতে পারেন। অর্থাৎ ন্যূনতম কাটাছেঁড়া করে এই অস্ত্রোপচার করা হয়। এই অস্ত্রোপচার কিন্তু অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে করা হয়। রোবোটিক সার্জারির সুবিধা হল, খুব কম রক্তপাত, অত্যন্ত কম জটিলতা, কম সময়ের জন্য হাসপাতালে থাকা, কম ক্ষত, কম যন্ত্রণা এবং দ্রুত নিরাময়।
প্রশ্নঃ ল্যাপারোস্কোপিক ও রোবোটিক - এই দুটির মধ্যে তবে কোন সার্জারি বেশি সুবিধাজনক?
উত্তরঃ দেখুন ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির ক্ষমতা খুবই সীমিত। এই সার্জারিতে স্ট্যান্ডার্ড দ্বি-মাত্রিক (টু ডাইমেনশনাল) ভিডিও মনিটর ব্যবহার করা হয়ে থাকে। হাতে ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রপাতিগুলিও নমনীয় নয়। তবুও এ সব নিয়েই ছোট ছোট ফুটো করে সার্জেনকে অস্ত্রোপচার করতে হয়। অন্যদিকে রোবোটিক সার্জারিতে অনেকগুলি বাড়তি সুবিধা রয়েছে। যেমন রোবোটিক সার্জারিতে সার্জেন শরীরের ত্রি-মাত্রিক (থ্রি ডাইমেনশনাল) ছবি স্পষ্ট দেখতে পান। এই পদ্ধতির সার্জিকাল সূক্ষ্মতার মাত্রা অনেক বেশি। রোগীর শরীরের ভিতরে প্রবেশের ক্ষমতা অনেক দ্রুত এবং উন্নত।
প্রশ্নঃ এই সার্জারি তবে কোন ধরণের রোগীর ক্ষেত্রে আদর্শ?
উত্তরঃ রোবোট অ্যাসিস্টেড রেডিক্যাল প্রস্টেক্টোমির জন্য আদর্শ রোগী তিনিই হবেন যাঁর প্রস্টেটের ওজন ৬০ গ্রামের কম, বডি মাস ইনডেক্স (বি এম আই) ৩০ এর কম। আগে কখনও প্রস্টেটিক বা তলপেটের কোনও অস্ত্রোপচার হয়নি, ইরেকটাইল ডিসফাংশান আছে ও রোগের ঝুঁকি কম, পি এস এ ১০ ন্যানোগ্রাম/মিলিলিটার, গ্লিসান স্কোর ৭ এবং কোনও অ্যাবলেশন থেরাপি হয়নি অথবা প্রস্টেটাইটিস হওয়ার ইতিহাস নেই।
প্রশ্নঃ এই চিকিৎসার কি আরও কিছু আছে?
উত্তরঃ হ্যাঁ, চিকিৎসা হিসেবে রেডিক্যাল রেডিওথেরাপি করা যেতে পারে। এতে ইনটনেসিটি মডিউলেটেড রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। সাইবার নাইফ প্রযুক্তি ব্যবহারে শুধু প্রস্টেট গ্ল্যান্ডকে টার্গেট করা হয় বলে আশপাশের অঙ্গ সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে। লেট প্রস্টেট ক্যানসারে হরমোন ম্যানিপুলেশন করে প্রস্টেট ক্যানসারের অন্তরালে থাকা টেস্টোস্টেরন হরমোনের ভূমিকায় ব্যাঘাত ঘটানো হয়। এরজন্য টেস্টিস কেটে বাদ দিয়ে (অর্কিডেক্টোমি) টেস্টোস্টেরন উৎপাদন চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রশ্নঃ মোদ্দা কথা ঠিক সময়ে এলে প্রস্টেস ক্যানসারের বিপদ অনেক কম। ঠিক তো?
উত্তরঃ উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতিতে এখন এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে ঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে আসা চাই।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিপ্লবকুমার ঘোষ