
শেষ আপডেট: 22 February 2019 15:05
সে সময়কার গেঁওখালির প্রাকৃতিক দৃশ্য ছিল অসাধারণ কারণ তখন গেঁওখালির পাশেই ছিল সমুদ্র। উনিশ শতকের শেষ দিকে ওড়িশা থেকে কলকাতা যেতে হলে জলপথে গেঁওখালি হয়ে যেতে হত। ১৮৬৮ থেকে ১৮৭৩ সালে কাটা হিজলি টাইডাল ক্যানালের এক প্রান্ত ছিল কালীনগরের রসুলপুর নদীতে আর অন্য প্রান্ত ছিল গেঁওখালিতে। মাঝে হলদি নদী।
১৮৮৮ সালে খ্রিস্টান মিশনারি যাজক উইলিয়াম কেরি এই নদীপথেই এসেছিলেন গেঁওখালিতে ধর্মপ্রচার করতে। এছাড়া ব্যবসা বাণিজ্যও চলত এই নদীপথের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ পূর্ব রেলপথ হওয়ায় জলপথের ব্যবহার কমে যেতে শুরু করে। অব্যবহৃত থাকার কারণে হিজলি টাইডাল ক্যানাল বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। ফলে গঞ্জের রমরমাও কমে যেতে শুরু করে। তবে অতীত স্মৃতি বহন করে চলেছে সোম ও শুক্রবারের হাট। সকাল থেকে বারোটা পর্যন্ত চলে। শহুরে মানুষজনের কাছে গ্রামীন হাট একটা উপরি পাওনা। জাহাজের ভগ্নাবশেষ দেখতে গেলে গেঁওখালিতে যাওয়া যায়। চড়াতে পড়ে আছে অসংখ্য ভাঙা জাহাজের খোল।
এখানে আসাটা বেশ সহজ। ধর্মতলার সিএসটিসির বাস গুমটি থেকে নূরপুর ঘণ্টা দেড়েকের পথ। নূরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে সামান্য দূরে লঞ্চঘাট। লঞ্চে করে আধঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যাবে গেঁওখালি। এছাড়া ডায়মন্ড হারবার, কাকদ্বীপ, কুলপি, নামখানা প্রভৃতি জায়গা থেকেও সরকারি, বেসরকারি বাস যোগাযোগ রয়েছে নূরপুরের সঙ্গে। আবার অন্য ভাবে, মেচেদা থেকে বাসে মহিষাদল হয়ে পাঁচ কিলোমিটার দূরে গেঁওখালি সহজেই পৌঁছানো যায়।
ভিড়ভাট্টা, কোলাহল বাদ দিয়ে গেঁওখালি এখনও বেশ নিরিবিলি। উদার প্রকৃতি, অসংখ্য পাল তোলা নৌকার আনাগোনা, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, নদীর ধার ধরে হাঁটা সব মিলিয়ে গেঁওখালি নিটোল এক স্বপ্ন। এই স্বপ্নকে ছুঁতে চাইলে থাকতে হবে ত্রিবেণী সঙ্গম টুরিস্ট লজে। এটার পরিচালনা করে লিংকেজ টুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলস। কলকাতায় অফিস রয়েছে। সেখান থেকেই বুকিং করা হয়। কলকাতার এত কাছে কম খরচে স্বল্প অবসর কাটানোর আদর্শ জায়গা হল গেঁওখালি। যোগাযোগের দূরভাষ নম্বর – ০৩৩-২২৬৪৭৯৯৯। চলভাষ – ৯৮৩০১৫২১৬৯।
এরকম প্রত্যন্ত জায়গায় এরকম একটা পাড়া গড়ে ওঠার পেছনের কারণ আছে। মহিষাদলের রাজারা পর্তুগিজ গোলন্দাজদের নিয়ে এসেছিলেন বর্গীদের আক্রমণ রোখার জন্য। মীরপুরে কিছু নিষ্কর জমি দিয়ে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দেন। গ্রামে রোম্যান ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট দুই সম্প্রদায়ই আছে। ফলে তাদের আলাদা চার্চ ও আছে।
ক্যাথলিক ৮৫ টা পরিবার রয়েছে। গ্রামের কেন্দ্রে রয়েছে তাদের গির্জা। সুন্দর বাগান দিয়ে ঘেরা। গির্জাটির মাথায় লেখা রয়েছে – ‘দুঃখীজনের সান্তনাদায়িনী মারিয়ার গির্জা।’ কলকাতার মহামান্য ধর্মপাল ড. এল টি পিকাচিএস ১৯৭৫ সালের ২০ এপ্রিল গির্জাটির উদ্বোধন করেন। গ্রামবাসীদের পদবিই কেবল খ্রিস্টান। কিন্তু চালচলন, আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক, সংস্কৃতি সবই বাঙালিয়ানায় ভরপুর। পর্তুগালের কোনও পর্তুগিজ আর নেই, রয়ে গিয়েছে তাদের রক্ত নিয়ে তাদের বংশধররা।
বর্তমান নাটশালা রূপনারায়ণের পারে শান্ত নিরিবিলি এলাকা। গেঁওখালি থেকে দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটার। নদীর ধারে অনাবিল প্রকৃতির মাঝে সুন্দর পরিবেশে গড়ে উঠেছে নাটশাল শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রম। এখানকার একটা অন্যতম দর্শনীয় স্থান। স্বামী প্রেমানন্দ এখানে ১৯১৫ সালে এসেছিলেন এবং ৩ থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি, তিনদিন, এখানে ছিলেন। সেই বছরই এই আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হয়। আশ্রমের ভেতরে চমৎকার রামকৃষ্ণ মন্দির আছে। রামকৃষ্ণদেবের মূর্তিটাও ভারি সুন্দর। পাশে রয়েছে শিবমন্দির। ফুল, ফল ও সবজির বাগান দিয়ে ঘেরা এই আশ্রম একটা স্কুলেরও পরিচালনা করে। পরিবেশটা এত মনোরম যে থেকে যেতে ইচ্ছে করে। থাকার ব্যবস্থার জন্য রয়েছে শান্তিধাম অতিথি ভবন। কিছু নিয়ম কানুন মেনে, আগে থেকে অনুমতি নিয়ে এলে তবেই থাকা যায়। বছরের যে কোনও সময়েই এখানে আসা যেতে পারে। ২০১৫ সালে রামকৃষ্ণদেবের ১৮০তম জন্মজয়ন্তী ও আশ্রমের শতবর্ষে একসঙ্গে পালন করা হয়েছে।
থাকার জন্য আশ্রমের দূরভাষ – ০৩২২৪২৮৯৬৩৩ এবং চলভাষ – ৯৯৩৩৬৯৮৪৭৬।