দ্য ওয়াল ব্যুরো: চুপিসাড়ে আসে। নীরবে বাড়ে। তারপর একেবারে ঘাতকের মতো হামলা চালায়। ডায়াবেটিস (Diabetes) ‘সাইলেন্ট কিলার’। টাইপ ২ আরও। এর ঘায়ে ঘায়েল প্রাপ্তবয়স্করাই। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে। এই রোগকে তো সাইলেন্ট প্রোগ্রেসিভ ডিসঅর্ডারও বলেন ডাক্তারবাবুরা। কলকাতার বিএম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার ও সিএমআরআইয়ের অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্টরা বলছেন, ডায়াবেটিস হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে পারে। রক্তে শর্করা বাড়লে তা হৃদপেশি ও হার্টের নার্ভের ওপর প্রভাব ফেলে। রক্ত সঞ্চালন বাধা পায়। জিনগত কারণে বা জন্মগতভাবেও পুরুষ ও মহিলাদের হার্টের রোগ থাকতে পারে। কিন্তু এমন কোনও সমস্যা নেই বা আগাম রোগের লক্ষণও নেই, আচমকাই দুর্বল হয়ে পড়ছে হার্ট বা যন্ত্রণাহীন হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে, এমন রোগীর সংখ্যা এখন অসংখ্য। আর এর অন্যতম বড় কারণই হল ডায়াবেটিস।
ডায়াবেটিস হল এমন এক অসুখ যেখানে রক্তে সুগার বা শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস দু’ধরনের—টাইপ ১ ও টাইপ ২। প্যানক্রিয়াসের বিটা কোষ থেকে ইনসুলিন বলে একটা হরমোন বের হয়। এই ইনসুলিন হরমোন ক্ষরণের তারতাম্য হলেই ডায়াবেটিস হয়। সাধারণত আমরা যে ফ্যাট ও কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাই তা বিপাকের পরে গ্লুকোজে পরিণত হয়। ইনসুলিন এই গ্লুকোজকে দেহকোষে ঢুকতে সাহায্য করে। গ্লুকোজ যখন দেহকোষের মধ্যে ঢোকে তখন সেটা অক্সিডাইজড হয় এবং তার থেকে অডিনোসিন ট্রাই ফসফেট (এটিপি) অর্থাৎ এনার্জি তৈরি হয়।
কিন্তু যদি বিটা কোষ নষ্ট হয়ে যায় এবং ইনসুলিন হরমোনের ক্ষরণ কমে যায় তাহলে এই পক্রিয়াটা বাধা পায়। ইনসুলিন কোষের মধ্যে প্রবেশের জন্য যে রিসেপ্টরটি লাগে, সেটি নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ইনসুলিন আর ঠিকমতো কাজ করতে পারে না। ইনসুলিন কোষের মধ্যে গ্লুকোজকে প্রবেশ করাতে পারে না। রক্তের মধ্যে গ্লুকোজের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে যায়। একে বলে টাইপ ২ ডায়াবেটিস।

কলকাতার বিএম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টারের কার্ডিওলজি বিভাগের ডিরেক্টর ডাঃ অঞ্জন সিওটিয়া বলছেন, ডায়াবেটিস মূলত শরীরের দুভাবে ক্ষতি করে। প্রথমত রক্তে শর্করার পরিমাণ বাড়লে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল জমা হতে থাকে। এই খারাপ কোলেস্টেরল জমে ধমনীতে ব্লকেজ করে। যার ফলে রক্ত সঞ্চালন বাধা পায়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।

ডাক্তারবাবু বলছেন, আজকের এই গতিময় জীবনে কর্মক্ষেত্রের টেনশন, বাতানুকূল পরিবেশে বসে কাজ করার অভ্যাস, কম পরিশ্রম, অতিরিক্ত ফাস্টফুড খাওয়া এবং ধূমপান, পুরুষ ও মহিলা নির্বিশেষে সকলকেই ঠেলে দিচ্ছে বিপদের মুখে। তা ছাড়াও রয়েছে ওবেসিটি ও ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিস ধরে গেলে হার্টের রোগের ঝুঁকি চড়চড় করে বেড়ে যাচ্ছে। ডায়াবেটিস থেকে শুধু হার্ট নয় শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে ও নিয়ম মেনে না চললে পরবর্তীকালে কিডনি, নার্ভের সমস্যাও দেখা দিতে পারে। চোখের ক্ষেত্রে রেটিনোপ্যাথি কিংবা অন্ধত্বও আসতে পারে। অনেক সময় পায়ের নার্ভ অ্যাফেক্টেড হলে নিউরোপ্যাথি হতে পারে যার ফলে পায়ে অসাড়তা আসে। ডায়াবেটিক ফুট বা ডায়াবেটিক আলসারের ঝুঁকিও বাড়ে।

কলকাতার সিএমআরআই হাসপাতালের ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রিনোলজির কনসালট্যান্ট ডাঃ কল্যাণ কুমার গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, ডায়াবেটিস থেকে যে কোনও রকম কার্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বাড়ে। ৩০ বছরের নীচে মহিলা ও পুরুষরাও এখন ডায়াবেটিসের শিকার। হার্ট ফেলিওর, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে ডায়াবেটিস।
ফার্স্টক্লাস গ্র্যাজুয়েট পুরুলিয়ার শবর-কন্যা শকুন্তলা, শিক্ষার মাইলফলক জনজাতির ইতিহাসে
ডায়াবেটিসও লাইফস্টাইল ডিজিজ। রোজকার জীবনে অনিয়ম অনেক বিপদ ডেকে আনে। এখন কায়িক পরিশ্রম অনেক কম হয়, বিশেষত করোনা কালে বাড়ি বসেই কাজ বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম বেড়ে গেছে। কাজেই আলস্য বেড়েছে। এক্সারসাইজে ইতি দিয়েছেন অনেকেই। তার ওপর অনিয়মিত ডায়েট তো রয়েছেই। চটজলদি ফাস্টফুড খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। সবুজ শাকসব্জি, ফলের বদলে পাস্তা, পেস্ট্রি, কোল্ড ড্রিংকস, আইসক্রিম, নুডলস ইত্যাদি হাই ক্যালোরির খাবারেই রুচি বেশি। এই সমস্ত খাবার বেশি করে খাওয়া এবং কম পরিশ্রম করার ফলে ওবেসিটি হচ্ছে। এই ওবেসিটিই হচ্ছে ভবিষ্যতে সুগার, প্রেসার, হার্টের অসুখের রিস্ক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ডাক্তারবাবুরা বলছেন, লাইফস্টাইল ম্যানেজমেন্টই ডায়াবেটিস বশে রাখার সবচেয়ে ভাল উপায়। নিয়মিত শরীরচর্চা ও খাদ্যাভাসে সামান্য অদলবদল করলেই রক্তে বাড়তি শর্করা বশে রাখা যায়। সেই সঙ্গে ধূমপান ও অ্যালকোহলে আসক্তি কমাতে হবে। মানসিক চাপ কমানোও খুব দরকার, রাতে টানা সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম দরকার।
পড়ুন দ্য ওয়ালের সাহিত্য পত্রিকা 'সুখপাঠ'