
শেষ আপডেট: 16 May 2023 17:53
দ্য ওয়াল প্রতিনিধি: তাঁদের রেস্তোরাঁকে তাঁরা বলেন, ভারতের প্রথম 'পিরিয়ড ডাইনিং' রেস্তোরাঁ (Oudh 1590)। এ এমনই এক জায়গা, যেখানে ঢুকলে মনে হতে পারে, যেন ফেলুদার ‘বাদশাহী আংটি’ গল্পের কোনও ইমামবড়ায় ঢুকে পড়েছি (Period drama)!
নাম থেকেই অবশ্য মালুম হবে তা। তা ছাড়া শুধু খাবার তো নয়; লখনউ (Lucknow), বেনারস, ফৈজাবাদের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা হরেক কিসিমের নবাবি খানদান যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে কলকাতার এই রেস্তোরাঁয়। দেওয়ালে কারুকাজের মাঝে দেখা যায় নবাবি ঘরানার ছবি (Awadh), টাঙানো থাকে অস্ত্র, ঢাল। ওপর থেকে ঝুলছে ঝাড়লণ্ঠন। তাতে যোগ্য সঙ্গত দিতে মৃদু সুরে বাজতে থাকে ঠুমরি আর গজলের সুর। আর তারই মাঝে তামার থালা-বাসনে আসে ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানি, মুর্গ রেজালা, মুর্গ ভুনা, নেহারি খাস, ডাল গোশত..। কেয়া বাত! কেয়া বাত!

মঙ্গলবার সেই 'অওধ ১৫৯০' (Oudh 1590) পা দিল দশ বছরে।
শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে দেশপ্রিয় পার্কের আউটলেট দিয়ে। এখন উত্তরে কালিন্দী যশোর রোড, সোদপুর, পুবে সল্টলেক থেকে দক্ষিণে নাকতলা, বি অবধি আউধের ছ’টি আউটলেট একইরকম জনপ্রিয়তার সঙ্গে বাঙালিকে নিয়ে যাচ্ছে অওধের সেই নবাবি দিনে। এমনকি বাংলার বাইরে নয়ডাতেও পৌঁছে গিয়েছে অওধ।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা?
এই যাত্রা শুরুর নেপথ্য কারিগর হলেন দুই ভাই। শিলাদিত্য চৌধুরী ও দেবাদিত্য চৌধুরী। শিলাদিত্য বললেন, 'আমরা কিন্তু রেস্তোরাঁ খোলার আগে প্রচুর রিসার্চ করেছিলাম। সত্যি বলতে, কলকাতায় বিরিয়ানির দোকানের অভাব ছিল না। কিন্তু এমন একটা জায়গা আমরা বানাতে চেয়েছিলাম, যেখানে মানুষ সন্ধ্যেবেলা পরিবারের সঙ্গে বসে ডিনার করতে পারেন! বা, এমন একটা জায়গা, যেখানে এক টুকরো লখনউ উঠে আসবে। বিরিয়ানি, চাঁপ বা কাবাবের মত চেনা-পরিচিত পদের বাইরেও অচেনা, অজানা নানা পদের স্বাদ নিতে পারবেন।'

এত রকমের নবাবি খাবারের নামও কিন্তু লোকের মুখে মুখে ঘুরত না তখন, বললেন শিলাদিত্য। তাঁর কথায়, 'আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, এরকম বেশ কিছু আইটেমকে আমরাই বাঙালির পাতে নিয়ে আসতে পেরেছি।'
শুরুর দিকে বছরদুয়েক বারবার লখনউ যেতে হয়েছে তাঁদের। শিলাদিত্য বললেন, “আজও আমাদের ২০ শতাংশ কর্মী লখনউয়ের। সত্যি বলতে, এরকম রান্নার জন্য একটা সাংঘাতিক কারিগরি দক্ষতা দরকার। যেটা শুধু হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে হবে না। দরকার সেই পরম্পরায় কাজ শেখা বাবুর্চিদের”।
আর দেবাদিত্য জানালেন, 'মশলাপাতিও আমরা নিজেরা বানাই বা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আনাই। যেমন কাশ্মীর থেকে জাফরান আসে, মেওয়া আসে, আখরোট আসে, সেগুলো পেষাই করে মেশানো হয় বিভিন্ন রেসিপিতে।'

সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান, আজকের উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা বা অওধ রাজ্যের নবাবির জন্ম মুঘল আমলে। সম্রাট আকবরের সময় তাঁর সাম্রাজ্যকে কয়েকটি প্রদেশ বা সুবাতে বিভক্ত করেন। অওধ ছিল সেরকমই এক সুবা। যার সুবাদারকে বলা হত ‘নবাব’। তবে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরেই প্রকৃতপক্ষে অওধের নবাবরা একরকম স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতে থাকেন।
১৭২২ সালে অওধের নবাব হন সাদাত আলি খান। মুঘল সাম্রাজ্যের সূর্য তখন পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে দক্ষিণে নিজাম, পুবে মুর্শিদাবাদ আর উত্তরে অওধ। দিল্লি থেকে সংস্কৃতি, সাহিত্য, সঙ্গীতের চর্চা সব একে একে সরে আসতে থাকে অওধের নতুন রাজধানী ফৈজাবাদে।

সাদাত খানের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন মুহম্মদ মুকিম খানের সঙ্গে। পরে এই জামাই তাঁর উত্তরাধিকারী হন, সিংহাসনে বসে নাম নেন ‘সফদরজঙ্গ।’ এই সফদরজঙ্গের ছেলে সুজা-উদ-দৌলাহ ১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে মীরকাশিমের সঙ্গে জোট বেঁধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। তাঁর ছেলে আসফ-উদ-দৌলা ছিলেন বেজায় দিলদরিয়া লোক। তাঁর আমলেই লখনউয়ের বিখ্যাত বড়া ইমামবড়া তৈরি হয়েছিল, যার ভেতরে রয়েছে ফেলুদার গল্পে পড়া সেই বিখ্যাত ভুলভুলাইয়া।

এই বড়া ইমামবড়া তৈরির সময়ে বহু শ্রমিক একযোগে কাজ করত। দুপুরে তাদের আহারাদির জন্য একটা বিরাট কড়ায় মাংস, ভাত, সবজি এবং মশলাপাতি দিয়ে ‘সিল’ করে আগুনে বসিয়ে দেওয়া হত, সব একসাথে রান্না হয়ে যেত। একবার সেই মজুরদের খাবার যখন ফোটানো শেষ পর্বে, তখন নবাব নিজে তদারকি করতে হাজির হন। তখনই তাঁর নাকে এসে পৌঁছয় সব মশলার মিশেলে সেই অপূর্ব গন্ধ। তিনি সটান সেটি তাঁর জন্যও দিতে বলেন। বাকিটা ইতিহাস। আজও এই প্রক্রিয়া বিখ্যাত হয়ে আছে ‘দম পখত’ নামে!
যদিও তার ঢের আগেই, ১৫৯০ সালে বিরিয়ানি প্রথম খাবার হিসেবে ভারতে আসে বলে মনে করা হয়। তখন আগ্রার মসনদে বসে মুঘল সম্রাট আকবর। দেবাদিত্যবাবু বললেন, এই বিরিয়ানির আদিরূপের জন্ম পারস্যে। সেখান থেকে এসেছিল মুঘল রসুইঘরে। অওধের নামেও তাই এই বছরটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে—অওধ ১৫৯০।

কিন্তু রান্নাতেও তো আজকাল মিশে যায় রাজনীতি। দ্য ওয়াল-এর তরফে প্রশ্ন করা হয়েছিল, দেশ জড়ে এই যে ধর্মের নামে রাজনীতি শুরু হয়েছে, যাতে খাবারকেও টেনে আনা হচ্ছে। কে কী খাবে, কে কী পরবে, সেটাও কেউ কেউ ঠিক করে দিচ্ছে। পাঠ্যক্রম থেকে মুঘল ইতিহাসকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে। সেখানে আপনারা এমন খাবার খাওয়াচ্ছেন, যা একেবারে খাঁটি নবাবি ঘরানার মোগলাই খানাপিনা। ব্যতিক্রমী লাগে না?
প্রশ্ন শুনে হেসেই ফেললেন দেবাদিত্য। বললেন, 'একটা ব্যাপার খেয়াল করবেন, খাবার কিন্তু সবসময় মানুষকে জুড়েছে। আমি যখনই আমার রেস্তোরাঁয় যাই, দেখি, কত লোক লাইন দিয়েছেন। শিখ হোন, হিন্দু হোন, মুসলিম হোন, খ্রিস্টান হোন, সবাই একসঙ্গে লাইনে আছেন, ভিতরে ঢুকছেন, খাওয়াদাওয়া করছেন। কোনও রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতির ভেদাভেদ নেই৷ সবকিছুকে অতিক্রম করে খাওয়াটাই আগে এসেছে।'

শিলাদিত্য যোগ করেন, 'জাতীয় রাজনীতিতে হয়ত এসব হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে মনে হয় না এরকম কিছু হবে! পশ্চিমবঙ্গের মানুষ খাদ্যপ্রেমী মানুষ। বাঙালি ইদ যেভাবে উদযাপন করে, সেভাবেই ক্রিসমাস বা পয়লা বৈশাখে মাতোয়ারা হয়। ক্যালকাটা ইজ ট্রুলি আ প্লেস অফ ডাইভার্সিটি, এখানে সব ধরণের মানুষ সব কিছু নিয়ে থাকে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে এর কোনও প্রভাব পড়বে না।'
অওধ যদিও পৌঁছে গিয়েছে বাংলার বাইরেও। দুই ভাই জানালেন, ইতিমধ্যেই নয়ডার সেক্টর ১৮-তে খুলেছে তাঁদের আউটলেট। আগামী দিনে মুম্বই বা দক্ষিণ ভারতেও পৌঁছে যাওয়ার ভাবনা রয়েছে তাঁদের। দেবাদিত্য জানালেন, এতদিন কলকাতার লোকে দিল্লি-লখনউয়ের বিরিয়ানি খেয়েছে। এবার দিল্লিতে গিয়ে তাঁরা কলকাতার বিরিয়ানি খাওয়াবেন। একেবারে ওয়াজিদ আলি শাহের খানসামাদের বানানো অকৃত্রিম কলকাতা বিরিয়ানি!
আগে বলা হত, বাঙালির দ্বারা ব্যবসা হয় না। আর আজ অওধের বাঙালি কর্ণধার বলছেন, ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে বিরিয়ানির সব চেয়ে বড় ব্র্যান্ডের রাজধানী হবে কলকাতা।
কর্নাটকের সঙ্গে বাংলার যোগ বহুদিনের, সেন রাজাদের আমল থেকে ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ বা টিপু সুলতান মসজিদ