
শেষ আপডেট: 31 May 2022 10:59
বছর ত্রিশের সুদীপ্ত বেশ গর্বের সঙ্গেই জানাল, সিগারেটটা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে সে। কিন্তু, গুটখার নেশাটা ঠিক ছাড়তে পারছে না। রোজ না হলেও মাঝেমধ্যে পকেট রাখা পাউচ থেকে সেটা জিভের স্পর্শে চলেই আসে। তাতে আর এমন কী! একদিন হঠাৎ করেই অফিসে এসে দেখল জিভে সাদা সাদা দানার মতো জিনিস বেশ যন্ত্রণা দিচ্ছে (Oral Cancer)। তড়িঘড়ি ছুটল ডাক্তারের কাছে। বেশ লাল চোখে সুদীপ্তকে মেপে নিয়ে ডাক্তার বললেন, ‘‘নেশাগুলো ছাড়ো। এখন ভয়ের কিছু নেই। এটা শ্লেষ্মা। পরেই এটাই মাথাচাড়া দিয়ে জিভের ক্যানসারের আকার নেবে না এটা কে বলতে পারে।’’
সুদীপ্ত এখন সিগারেট, গুটখা, তামাক ছেড়েছে। তবে এই জিভের ক্যানসার ব্যাপারটা কিন্তু আমাদের দেশে বেশ জাঁকিয়েই বসেছে। মার্কিন মুলুকে, যেখানে মুখগহ্বরের ক্যানসারের পরিসংখ্যান মাত্র ৩% , ভারতে সেটাই প্রায় ৩০%। কমার বদলে উত্তরোত্তর সেটা বাড়ছে। মুম্বইয়ের ‘জাসলক হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর অঙ্কোলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডঃ রাকেশ কাটনা জানিয়েছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই মারণ রোগ বেশি থাবা বসাচ্ছে। যার অন্যতম প্রধান কারণই হল সিগারেট, গুটখা, খৈনি-সহ যথেচ্ছ সুপুরি ও তামাক চিবোনোর নেশা।
মুখগহ্বরের ক্যানসার বা Oral Cancer-এর নিরিখে বিচার করলে আমাদের দেশ এক নম্বরে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের এক সমীক্ষায় জানা গিয়েছে যে, পুরুষদের মধ্যে মুখগহ্বরের ক্যানসারের ঝুঁকি মেয়েদের তুলনায় দ্বিগুণ। তামাক জনিত ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত ১,০২,৩০০। অন্য দিকে মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত ৯৯,৪৯৫ জন। পরিসংখ্যান দেখে আঁতকে উঠছেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞরাও।
এখন দেখে নেওয়া যাক ভারতে এই রোগের প্রভাব কেমন?
রাস্তাঘাটে চলতে ফিরতে প্রায়শই কোনও না কোনও তরুণকে দেখা যায় পকেট থেকে গুটখা বা পানমশলা বার করে মুখে ঢেলে দিতে। বেশ আয়েশ করে চিবোতে চিবোতে সিগারেটে লম্বা একটা টান। শুধু, পুরুষ নয়, অনেক মহিলারাও সুপুরি বা বাহারি পানমশলা মুখে রাখতে পছন্দ করেন। ডঃ রাকেশ কাটনার মতে, সাধারণত ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সীদের মধ্যেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। সমীক্ষা বলছে, ৫০ শতাংশ ধূমপায়ী এই জিভের ক্যানসারের শিকার। বাকিরা ভোগেন অন্যান্য তামাক জাতীয় নেশার কারণে।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখগহ্বরের ক্যানসার শুধু জিভ নয়, মাড়ি, টনসিল, ঠোঁট, গালের ভিতরের অংশ জিভের নীচের নরম অংশেও হতে পারে।
রয়েছে আরও কারণ। যার মধ্যে অন্যতম হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস (HPV Infection)। এইচপিভি সংক্রমণ মূলত অনিয়ন্ত্রিত যৌন সংসর্গের কারণে হয়। Oral Sex যার মধ্যে অন্যতম। ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে Sexually Transmitted Infection (STI) । ১০০ রকমের এইচপিভি সংক্রমণ রয়েছে যার মধ্যে ৪০ রকম দেখা যায় জননাঙ্গে (Genital Area)।
কোনও ক্রনিক রোগ থাকলে সেখান থেকেও ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা ছাড়া বংশগত বা জিনগত কারণও এর জন্য দায়ী। তবে, মহিলাদের থেকে পুরুষদের ওরাল ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় দ্বিগুণ।
ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উপসর্গগুলি দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।
যে কোনও রোগেই ওষুধের থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা বেশি প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞেরা বললেও বর্তমান প্রজন্মের কাছে সেটা শুধু কথার কথা মাত্রই। তাও জেনে রাখুন কী ভাবে এই রোগ থেকে দূরে থাকবেন।
প্রথমত-সিগারেট, গুটখা, তামাকজাত সমস্ত জিনিসকে বলতে হবে গুডবাই।
দ্বিতীয়ত- ওরাল ক্যানসারের জন্যে দায়ী পরিচ্ছন্নতার অভাব। নিয়মিত দু’বেলা ব্রাশ করা ও খাবার পরে ভাল করে কুলকুচি করে মুখ পরিষ্কার রাখা দরকার।
তৃতীয়ত- তামাক আর ক্যানসার সমার্থক। তা সে ধোঁয়া ওড়ানো তামাকই হোক বা চিবোনোর তামাক। একই রকম ক্ষতিকর পান, সুপুরি, চুন ও খয়ের। পান পাতার কিছু গুণ আছে ঠিকই কিন্তু চুন, সুপুরি, খয়ের আর জর্দা সহযোগে পান মারাত্মক ক্ষতিকর।
এক্স-রে (X-rays), সিটি স্ক্যান (CT scan), পেট স্ক্যান (PET scan), এমআরআই স্ক্যান (MRI scan) এবং এন্ডোস্কোপি (Endoscopy)-সহ নানা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে গিয়ে এই রোগের বিষয় নিশ্চিত হন ডাক্তারেরা। সার্জারি, কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপির আরোগ্য লাভের সব কটি পদ্ধতিই বেশ যন্ত্রণাদায়ক। তবে, আরোগ্য মিলবেই কিনা সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারেন না ডক্তারেরা। তাই শরীরকে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। বরং, নেশাগুলোকেই বলে দিন আলবিদা! ঠিক কিনা ?
দামি সিগারেট ঠোঁটে বয়ঃসন্ধি, ধূমপানে বেশি আসক্ত মহিলারা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, বাড়ছে বন্ধ্যাত্ব