দ্য ওয়াল ব্যুরো: শরীর দুর্বল। সেই সঙ্গে মনও। দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা, পেশিতে অসহ্য ব্যথা, মাথা যন্ত্রণা-মাইগ্রেন, খাদ্যনালী-মূত্রনালীতে রোগ, সেই সঙ্গে অসাড় হয়ে যাচ্ছে হাত-পা। মাথার ভেতর যেন গুলিয়ে যাচ্ছে সবই। শরীর তো ভাঙছেই, জন্ম নিচ্ছে নানা মানসিক রোগও। অবসাদ, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব যেন গ্রাস করছে। ডাক্তাররা বলেন, এ হল জটিল স্নায়বিক সমস্যা। এমন এক স্নায়ু রোগ যার প্রকৃত কারণ আজও অজানা। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (Multiple Sclerosis) বা এমএস।
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস কেন হয়, তা ঠিকমতো বলা যায় না। এই জটিল স্নায়ুর রোগের কারণ নিয়ে আজও গবেষণা চলছে। ডাক্তারবাবুরা বলেন, মাথার স্নায়ু যদি বিগড়ে যায়, তাহলে শরীর ও মস্তিষ্কের মধ্যে যে সেতুটা আছে, সেটাই ভেঙে পড়ে। মাথা ও শরীরে এই বাঁধনটাই যদি ভেঙে যায় তাহলে আর মস্তিষ্ক থেকে খবরাখবর শরীরে এসে পৌঁছতে পারে না। এর ফলে যা হওয়ার তাই হয়, সারা শরীর অসাড় হতে থাকে, বিভিন্ন অঙ্গে রোগ বাসা বাঁধে। একই সঙ্গে মানসিক রোগও দেখা দেয়।
দেখা গেছে, বিশ্বে প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এই স্নায়ুর রোগে ভোগেন। মহিলাদের আবার মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি পুরুষদের থেকে বেশ। গবেষকরা বলেন মহিলাদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় তিন গুণ বেশি। রোগ যে বয়সকালে আসবে তেমনটাও নয়। সাধারণত দেখা গেছে, ২০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যেই এই স্নায়ুর রোগ বেশি হানা দেয়। পরিবেশগত কারণ থাকতে পারে, জিনের কারসাজিও হতে পারে, বংশগত কারণও থাকতে পারে তবে সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি গবেষকরা।
কী থেকে হয় মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস?
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসকে বলা হয় অটোইমিউন ডিজিজ। এটি ডি-মায়েলিটিন রোগ যেখানে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপরে প্রভাব পড়ে। কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বলতে বোঝায় মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ড। গবেষকরা বলেন, মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস হলে মস্তিষ্ক ও স্নায়ুরজ্জুতে থাকা স্নায়ুকোষগুলোর আবরণ নষ্ট হয়ে যায়। এই অবরণকে বলে মায়েলিন। মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে এই মায়েলিনের আবরণীতে ক্ষত তৈরি হয়।

সেটা কীভাবে? স্নায়ুতন্ত্র তৈরি হয় নিউরন বা স্নায়ুকোষ দিয়ে। মানুষের মাথায় হাজার কোটির বেশি স্নায়ুকোষ বা নার্ভ সেল থাকে। এই স্নায়ুকোষ বা নিউরনগুলি পরস্পরের সঙ্গে যে সুতো দিয়ে বাঁধা থাকে তাকে বলে স্নায়ুতন্তু। এবার প্রতিটি স্নায়ুকোষের একটা মাথা থাকে আর লম্বা লজের মতো অংশ থাকে। মাথাকে বলে কোষদেহ, আর লম্বা অংশটা অ্যাক্সন। এই অ্যাক্সনের চারদিকে পাতলা সোয়ান কোষ তৈরি আবরণ থাকে যাকে বলে নিউরিলেমা। এই নিউরিলেমা পরিবেষ্টিত অ্যাক্সনকে বলে স্নায়ুতন্তু। নিউরিলেমা ও অ্যাক্সনের মাঝে যে ফাঁক থাকে সেখানে স্নেহপদার্থের একটা স্তর থাকে, যাকে মায়েলিন আবরণ বলে। এই মায়েলিনের কাজ হল স্নায়ুতন্তু বা নার্ভ ফাইবারকে সুরক্ষা দেওয়া। যদি এই স্তরে ক্ষত তৈরি হয় বা স্তরটি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে স্নায়ুতন্তু মস্তিষ্ক ও শরীরের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করতে পারে না। অর্থাৎ সোজা কথা বলতে গেলে, মাথার সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অংশের যোগসূত্র বিচ্ছিন্ন হতে থাকে। যে কারণেই নানাবিধ শারীরিক ও মানসিক সমস্যা দেখা দেয়।
একই রকম উপসর্গ সকলের হয় না, নানা লক্ষণ আছে এই রোগের
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস রোগে অনৈচ্ছিক পেশির ওপরে প্রভাব পড়ে। যার ফলে দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনেকেরই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে পারে।
পেশির দুর্বলতা এই রোগের অন্যতম লক্ষণ। পেশিতে ব্যথা হয় এবং সেই সঙ্গে হাত-পা নাড়ানো মুশকিল হয়ে পড়ে। পেশিতে টান, খিঁচুনি সবই দেখা দেয়।
একটা সময়ের পরে অসাড় হতে থাকে হাত-পা। পিন ফোটালেও কোনও স্পর্শের অনুভূতি থাকে না।
এই রোগের সবচেয়ে খারাপ দিক হল শরীরের ভারসাম্য বিগড়ে যায়। হাঁটাচলা করা, খাবার খাওয়া, খাবার গেলা, কথা বলায় সমস্যা হয় অনেকের।

শরীরের নানা অঙ্গে রোগ দেখা দিতে পারে। খাদ্যনালী, অন্ত্র, মূত্রনালীতে জটিল রোগ হতে পারে।
শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক রোগও চাগিয়ে ওঠে। অবসাদ, উৎকণ্ঠা, একাকীত্বে ভুগতে থাকেন রোগী। হতাশা গ্রাস করে। কম বয়সে এই রোগ হলে বুদ্ধির বিকাশ বাধা পায়। ব্যবহারে, কথাবার্তায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সারাক্ষণ রোগীর মধ্যে একটা অস্থির ভাব থাকে। স্বাভাবিক ভাবনা-চিন্তায় সমস্যা হয়।
অনেকের আবার শ্রবণশক্তিও চলে যায়। মাঝে মাঝেই শরীরে কাঁপুনি দেখা দেয়। স্বাভাবিক অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন না রোগী। তবে সকলেরই যে একরকম উপসর্গ হবে তেমনটা নয়। গবেষকরা বলছেন, এই রোগের প্রকৃত কারণ যেহেতু অজানা তাই রোগের নানা লক্ষণ দেখেই সমস্যা অনুমান করা হয়।
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের নানা ধরণ
ক্লিনিকালি আইসোলেটেড সিন্ড্রোম, যেখানে মায়েলিন স্তর ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ডিমায়েলিটিন রোগ বলা হয় একে।
রিল্যাপসিং-রেমিটিং এমএস প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়। এই রোগের লক্ষণ খুব মৃদু, অনেক সময় বোঝা যায় না।
প্রাইমারি প্রোগ্রেসিভ মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসে স্নায়ুর কার্যকারিতা পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। একাধিক উপসর্গ দেখা দেয় এই রোগে।
সেকেন্ডারি প্রোগ্রেসিভ এমএসে রোগীর অবস্থা আরও খারাপের দিকে যায়। স্নায়ুর কার্যকারিতা ধীরে ধীরে নষ্ট হতে থাকে।
রোগ ধরা হয় কীভাবে?
কিছু টেস্ট আছে যেগুলির সাহায্যে রোগের লক্ষণ বুঝতে পারেন ডাক্তাররা। যেমন
ম্যাগনেটিক রেসোন্যান্স ইমেজিং বা এমআরআই স্ক্যান (MRI)করা হয় রোগীর।
অপটিক্যাল কোহেরেন্স টোমোগ্রাফি (OCT) টেস্টে চোখের স্নায়ুর ছবি তোলা হয়। অপটিক নার্ভের কতটা ক্ষতি হচ্ছে সেটা বোঝা যায়।
স্পাইনাল ট্যাপ (lumbar puncture) পরীক্ষায় ধরা যায় স্পাইনাল ফ্লুইঢের কতটা ক্ষতি হয়েছে। রোগ কতটা ছড়িয়েছে সেটাও নির্ণয় করতে পারেন ডাক্তাররা। সেই মতো থেরাপি শুরু হয়।
ইভোক পোটেনশিয়াল টেস্টে (VEP) ব্রেন ড্যামেজ হয়েছে কিনা ধরা যায়। মস্তিষ্কে স্নায়ুর কতটা ক্ষতি হয়েছে নির্ধারণ করেন ডাক্তাররা।
শুরুতে ধরা পড়লে রোগ সারানো সম্ভব
আগে মনে করা হত স্নায়ুর রোগের নিরাময় তেমনভাবে হয় না। কিন্তু এখন স্নায়ুর রোগের এতরকম চিকিৎসা বেরিয়ে গেছে, যে রোগ শুরুতে ধরা পড়লে তার থেরাপি করা সহজ। ডাক্তারের নির্দেশ মেনে চললে, সঠিক ট্রিটমেন্ট, মেডিকেশনে ভাল থাকে রোগী। কিছু থেরাপিও আছে যাতে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিসের মতো জটিল স্নায়ুর অসুখকেও বশে রাখা সম্ভব।
ফিজিক্যাল থেরাপি আছে, আকুপাংচার থেরাপিও করেন ডাক্তাররা। নানা রকম যোগা ও কাউন্সেলিং করানো হয় রোগীকে। মানসিক সমস্যা দেখা দিলে তার অনেকটা নিরাময় হয় এভাবেই।
অনেক রকম ওষুধ আছে যেমন ডিজিজ-মডিফাইং ওষুধ, প্রদাহ কমাতে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটারি ওষুধ। স্টেরয়েড দিয়েও চিকিৎসা করা হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপিউটিক এজেন্ট ব্যবহার করেন ডাক্তাররা। ইমিউনোসাপ্রেসিভ ড্রাগও আছে।
এগুলো ছাড়াও শরীরচর্চা, পুষ্টিকর খাবার ও দিনে কিছুটা সময় মেডিটেশন করার নিদান দেন ডাক্তারবাবুরা। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম ও কাউন্সেলিংয়ে এই জটিল স্নায়ুর রোগের মোকাবিলা করা সম্ভব বলেই মনে করেন ডাক্তাররা।