দ্য ওয়াল ব্যুরো: করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কাদের বেশি, আর কাদেরই বা কম, এই নিয়ে গত এক বছর ধরে নানারকম সমীক্ষা চালিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন হাসপাতাল-নার্সিংহোম, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কোভিড কেয়ার সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে রোগীদের উপর পরীক্ষা নিরীক্ষাও করা হয়েছে। সম্প্রতি ‘কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ’ (সিএসআইআর)-এর বিজ্ঞানীরা বলেছেন, নিরামিষাশী তথা শাকাহারী যাঁরা, তাঁদের করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি কম। আবার এমনও দেখা গেছে, ধূমপান করেন যাঁরা অর্থাৎ স্মোকারদের সংক্রমণের ঝুঁকি কম। যদিও ধূমপায়ীদের কোভিড ঝুঁকি বেশি না কম, এই নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে দ্বিমত আছে। গত বছরই স্বাস্থ্যমন্ত্রকের গাইডলাইনে বলা হয়েছিল স্মোকাররা কোভিড সংক্রমণের হাই-রিস্কে রয়েছেন।
সিএসআইআরের গবেষণা কী বলছে
সিএসআইআরের অধীনস্থ ইনস্টিটিউট অব জিনোমিক্স অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ বায়োলজি (আইজিআইবি)-র গবেষক শান্তনু সেনগুপ্ত বলেছেন, ১০ হাজার ৪২৭ জনের ওপর সেরোসার্ভে করে দেখা গেছে অন্তত ১০৫৮ জন সেরো-পজিটিভ অর্থাৎ এদের রক্তে করোনার অ্যান্টিবডি রয়েছে। ৩৪৬ জনকে তিন মাস পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা গেছে কিছু জনের রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ কমে গেছে। ভাইরাস ঠেকানোর মতো প্লাজমায় প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। আবার ৩৫ জন রোগীকে আলাদা করে পর্যবেক্ষণে রেখে দেখা গেছে তাঁদের রক্তে অ্যান্টিবডি কমতে সময় লেগেছে ৬ মাস। বিজ্ঞানী বলছেন, কতটা অ্যান্টিবডি কমছে বা সংক্রমণের রিস্ক-ফ্যাক্টর কতটা বাড়ছে সেটা নির্ভর করছে কিছু বিষয়ের ওপরে।
যেমন দেখা গেছে, যাঁরা নিরামিষ বেশি খান, সবুজ শাক-সব্জি, ফল ইত্যাদি তাঁদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। তুলনায় যাঁরা সবুজ শাকসব্জি কম খান, তাঁদের প্রতিরোধ ক্ষমতাও অনেক কম।

বিজ্ঞানী বলছেন, দুর্বল শরীর ও কম ইমিউনিটি থাকলেই ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে। তাই শাকসব্জি, ফাইবার জাতীয় খাবার বেশি করে খেতে হবে। মরসুমি ফল ডায়েটে রাখতেই হবে। ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল খেতে হবে বেশি করে। অ্যালকোহল যতটা সম্ভব কম খাওয়াই ভাল। বিজ্ঞানী বলছেন, লাইফস্টাইল, ডায়েট, পরিবারে কোনও রোগের ইতিহাস, মেলামেশার ধরন ইত্যাদি অনেকগুলো ফ্যাক্টরের ওপর সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ভর করে।
ধূমপান নিয়ে দ্বিমত
সিএসআইআরের বিজ্ঞানীরা বলছেন, সিগারেট বা তামাক জাত দ্রব্যের নেশা আছে যাঁদের, তাঁদের ক্ষেত্রে কোভিড সংক্রমণের ঝুঁকি কম। নিকোটিন ভাইরাল প্রোটিনকে মানুষের দেহকোষের ভেতরে ঢুকতে দেয় না। দেহকোষের যে সারফেস প্রোটিন বা বাহক প্রোটিনের সঙ্গে জোট বেঁধে ভাইরাস কোষের মধ্যে ঢোকে, সেই জোট বাঁধার প্রক্রিয়াকে আটকে দেয় নিকোটিন। তার মানে এই নয় যে সংক্রমণ ঠেকানোর জন্য মানুষকে ধূমপান করতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। বরং নিকোটিনের অনেক খারাপ দিকও আছে। অতিরিক্ত ধূমপানে শরীরে ক্ষতি হয়। ফ্রান্সের বিজ্ঞানীরাও একই দাবি করেছিলেন।
অন্যমতও আছে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক গত বছরই বলেছিল, অতিরিক্ত ধূমপানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তামাকজাত দ্রব্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে কোভিড সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে। একই দাবি করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। বলা হয়েছিল, করোনাভাইরাস সংক্রমণের রিস্ক-ফ্যাক্টর হতে পারে সিগারেট ও তামাকজাত দ্রব্য। কারণ লাগাছাড়া ধূমপানে ফুসফুস দুর্বল হয়। আর সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেন যেহেতু ফুসফুসের কোষেই প্রথম সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে, তাই শরীরের এই অঙ্গটি দুর্বল হওয়া মানেই ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। স্বাস্থ্য আধিকারিকরা বলছেন, করোনার সংক্রমণেই ফুসফুসের জটিল রোগ তথা সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটারি সিন্ড্রোমে আক্রান্ত হয় রোগী। তাই ফুসফুসের ক্ষতি করে এমন যে কোনও নেশার জিনিসই এই সময় মারাত্মক হতে পারে।

লাগাতার ধূমপানে ফুসফুসের রোগ ঠেকানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফুসফুসের মধ্যে যে সিলিয়েটেড কোষ থাকে সেগুলো দুর্বল হতে থাকে। এই সিলিয়েটেড কোষে ছোট ছোট চুলের মতো অংশ থাকে যা বাইরে থেকে শরীরে ঢোকা রোগজীবাণু বা ধুলোবালি ছেঁকে বাইরে বার করে দিতে পারে। অধিক ধূমপানে এই কোষের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। তাই ধূমপায়ীদের মধ্যে যে কোনও ধরনের ফুসফুসের সংক্রমণ নিউমোনিয়া, ইনফ্লুয়েঞ্জা, টিবি ইত্যাদি বেশি হতে দেখা যায়। এই একই কারণে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কাও তাঁদের বেশি।
রক্তের কোন গ্রুপে কোভিড রিস্ক-ফ্যাক্টর বেশি
রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ভাইরাস সংক্রমণের যোগসূত্রের কথা আগেও বলেছেন বিজ্ঞানীরা। সিএসআইআর জানাচ্ছে, ‘ও’ (O Blood) রক্তের গ্রুপ যাদের আছে, তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ছড়াবার ঝুঁকি কম। আবার এমনও দেখা গেছে, ‘বি’ (A Blood) রক্তের গ্রুপ যাদের, তাদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের ঝুঁকি নাকি অনেকটাই বেশি। বিজ্ঞানীদের দাবি, ‘বি’ ও ‘এবি’ গ্রপের মধ্যেই নাকি করোনার সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে। তুলনামূলকভাবে ও-গ্রুপ অনেকটাই সুরক্ষিত।

রক্তের শ্রেণিবিন্যাস চিহ্নিত করে যে
এবিও (ABO) জিন, তার উপরে নির্ভর করে কোন ব্যক্তির শরীরে সংক্রমণ চট করে ধরে নেবে, আর কার শরীরে সংক্রমণের ঝুঁকি তেমনভাবে নেই। এই
এবিও জিন (আলফা ১-৩-এন-অসিটাইলগ্যালাকটোসামিনাইলট্রান্সফারেজ এবং অলফা ১-৩ গ্যালাকটোসিল ট্রান্সফারেজ) হল প্রোটিন-কোডিং জিন। এই জিন এবিও ব্লাড গ্রুপ (ABO Blood Group) নির্ধারণ করে। রক্তের এই শ্রেণিবিন্যাস নির্ভর করে লোহিত রক্ত কণিকা বা এরিথ্রোসাইটের উপর। লোহিত রক্তকণিকার সারফেসে উপস্থিত অ্যান্টিজেন এ বা অ্যান্টিজেন বি-এর উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির উপরেই নির্ভর করে রক্তের গ্রুপ টাইপ এ, টাইপ বি, টাইপ এবি বা টাইপ ও।
কোভিড রোগীর ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ‘ও’ (O Blood) রক্তের গ্রুপ যাদের আছে, তাদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ছড়াবার ঝুঁকি কম। বি গ্রুপ এবং এবি গ্রুপের মধ্যে বেশি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, সংক্রমণ কীভাবে মানুষের শরীরে ছড়াবে সেটা নির্ভর করে কয়েকটা ফ্যাক্টরের ওপর। যেমন, রিসেপটর প্রোটিন, রোগীর বয়স, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ইত্যাদি। গবেষকরা বলছেন, এই ফ্যাক্টরগুলো ছাড়াও জিনের প্রভাবও রয়েছে। যদিও সে বিষয় বিস্তারিত তথ্য এখনও মেলেনি। তবে গবেষকদের দাবি, রক্তের গ্রুপও একটা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।