
শেষ আপডেট: 1 June 2023 09:56
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জীবনে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলেননি (N Srinivasan)। অথচ এককালে তিনিই ছিলেন দেশের অলিখিত ক্রিকেট-মহারাজ। নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসন (N Srinivasan)। এমনই তাঁর প্রভাব যে, সেই সময় বিসিসিআই (BCCI) নিয়ে লিখতে গিয়ে সাংবাদিকরা বলাবলি করতেন, 'এখন শ্রীনি যুগ চলছে!' আইপিএলের ফাইনালে চেন্নাই সুপার-কিংস জেতার পর আবার যেন সেই পুরনো কথাটা ফিরে এল (richest cricket owner)। দেশের অন্যতম শীর্ষ সিমেন্ট সংস্থার কর্ণধার শ্রীনিবাসনই যে চেন্নাই সুপার-কিংসের মালিক। বলা হচ্ছে, আইপিএল জেতায় একধাক্কায় বিপুল বেড়ে গেল সিএসকে ফ্র্যাঞ্চাইজির বাজারদর। তাই আলোয় উজ্জ্বল শ্রীনির ভাঁড়ারও।
লেখার সম্পর্কে এককালে বলা হত, 'কালি-কলম-মন/ লেখে তিনজন!' এদেশে ক্রিকেট খেলাটা নিয়েও সেরকম বলা যায় বটে! খাতায় কলমে খেলাটা মাঠে ব্যাট-বল দিয়ে খেলোয়াড়রা খেলে থাকেন বটে, তবে আড়ালে তাতে জড়িত থাকেন তিনশো থেকে তিন হাজার জন! ক্ষমতার নিক্তিতে মাপা হয়, কার কেমন ওজন! অবধারিতভাবেই এই ক্ষমতাবানদের তালিকায় সবচেয়ে উঁচুতে থাকেন দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি বা প্রেসিডেন্ট! তিনি কেমন হবেন, বস্তুত তার ওপরেই নির্ভর করে দেশের ক্রিকেট লেখচিত্র কোনদিকে বাঁক নেবে!
প্রায় বছরতিনেকের বেশি সময় বিসিসিআই সভাপতি পদে ছিলেন শ্রীনিবাসন। অথচ 'শেওয়াগ-শচীন' জুটির চাইতেও বহু আলোচিত ছিল 'শ্রীনি-ধোনি' যুগলবন্দি। বোর্ড সভাপতির প্রিয়তম মহেন্দ্র সিং ধোনি তখন অধিনায়ক। শোনা যায়, বিসিসিআই সভাপতি পদে যখন যিনি থাকেন, কার্যত তাঁর শহরটাই হয়ে ওঠে দেশের ক্রিকেট-রাজধানী। এককালে বিসিসিআইয়ের সর্বেসর্বা ছিলেন জগমোহন ডালমিয়া। দেশের পুরো ক্রিকেট মানচিত্রটাই নিয়ন্ত্রণ করা হত কলকাতা থেকে। ১৯৮৭ সালের কথা। প্রথমবার ইংল্যান্ডের বাইরে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আসর বসানোর কথা চলছে। ডালমিয়া এবং ইন্দরজিৎ সিং বিন্দ্রা প্রস্তাব দিলেন ভারতের কথা। শেষে ভারত-পাকিস্তান দুই দেশ মিলিয়ে হল সেই বিশ্বকাপ। ডালমিয়ার চেষ্টাতেই তার ফাইনাল হল ইডেনে। লর্ডসের বাইরে দ্বিতীয় মাঠ, যাতে বিশ্বকাপ ফাইনাল হল।
ডালমিয়ার আগে বিসিসিআই সভাপতি ছিলেন রাজ সিংহ দুঙ্গারপুর! বলা হয়, শচীন তেন্ডুলকার নামক নক্ষত্রের আবিষ্কর্তা তিনিই। ডালমিয়ার আমলে শুরু সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় যুগ। তারপর শরদ পওয়ার, শশাঙ্ক মনোহরের আমলে ক্রিকেট রাজধানী সরে যায় মুম্বইতে। পরে শ্রীনি আসতেই রাতারাতি ভারতীয় ক্রিকেটের স্নায়ুকেন্দ্র হয়ে ওঠে চেন্নাই।
নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসনের আগেও দক্ষিণ ভারত থেকে বিসিসিআই সভাপতি পেয়েছে। বস্তুত, ১৯৮৭ সালে যখন ভারতে বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয়, তখন বিসিসিআই সভাপতি ছিলেন শ্রীনিবাসন শ্রীরামণ। ইনি ছিলেন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী, এককালে কংগ্রেস সভাপতি কামরাজের ছোটবেলার বন্ধু। পরে রাজ সিং দুঙ্গারপুরের পর বোর্ড সভাপতি হয়েছিলেন মুথাইয়া আন্নামালাই চিদাম্বরমের পুত্র এ সি মুথাইয়া। তাঁর পিতার নামেই আজ চেন্নাইয়ের চিপক স্টেডিয়াম নামাঙ্কিত। বস্তুত, এই মুথাইয়াই ক্রিকেট প্রশাসনে নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসনকে নিয়ে আসেন।
শ্রীনিবাসনের পড়াশোনা চেন্নাইতেই। বিখ্যাত লয়োলা কলেজের প্রাক্তনী তিনি। পরে শিকাগোর ইলিনয় ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে তিনি বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা করেন। পরে কাজ শুরু করেন 'ইন্ডিয়া সিমেন্টস'-এ। দক্ষিণ ভারতের অন্যতম নামী, বিত্তবান এই সিমেন্ট সংস্থার মালিকানা আদতে তাঁদের পরিবারেরই। ১৯৪৬ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক পরেই চেন্নাইয়ের কাছে এই সংস্থার প্রথম কারখানা স্থাপন করেন শ্রীনিবাসনের পিতা টি এস নারায়ণস্বামী।
চেন্নাই সুপার-কিংস ও মুম্বই ইন্ডিয়ানস ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে এই মুহূর্তে আইপিএল দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিত্তবান। প্রায় ৭৫২ কোটি টাকায় চেন্নাই দলের মালিকানা কিনেছিলেন নারায়ণস্বামী শ্রীনিবাসন। অধিনায়ক হন মহেন্দ্র সিং ধোনি। এখন এই দলের 'ভ্যালুয়েশন' ৭০০০ কোটি টাকারও বেশি। এক সাক্ষাৎকারে শ্রীনি বলেছিলেন, 'এরপর একদিন চেন্নাই দলের আয় আমার সিমেন্ট ব্যবসাকে ছাপিয়ে গেলেও আমি অবাক হব না!'
শ্রীনির আগে বিসিসিআই সভাপতি ছিলেন নাগপুরের ডাকসাইটে উকিল শশাঙ্ক মনোহর। অতীব সাদামাটা, কিন্তু আইনের ব্যাপারে অত্যন্ত কড়া শশাঙ্ক মনোহর স্বচ্ছ ভাবমূর্তির জন্য দেশে-বিদেশে পরিচিত ছিলেন। শোনা যায়, বহুদিন অবধি তাঁর পাসপোর্ট ছিল না, বিদেশ যাওয়ার দরকার পড়েনি বলে। শ্রীনিবাসনের আমলে পুরোপুরি কর্পোরেট ধাঁচে সেজে ওঠে বিসিসিআই। আয় বাড়ে প্রচুর। বিতর্কও বাড়ে। আইপিএলে দুর্নীতিকে ঘিরে তোলপাড় হয়ে ওঠে দেশ। গ্রেফতার হ'ন শ্রীনির জামাই গুরুনাথ মইয়াপ্পন। কিন্তু পদ ছাড়তে চাননি শ্রীনি। রীতিমত সুপ্রিম কোর্টের কড়া ধমকে শ্রীনি পদত্যাগ করেন। দায়িত্ব নেন জগমোহন ডালমিয়া, পরে শশাঙ্ক মনোহর।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের হিসেবে, এই মুহূর্তে শ্রীনির সম্পত্তি প্রায় ৭২০ কোটি টাকা। আইপিএলের ট্রফি জিতে ইতিমধ্যেই তা তিরুপতি মন্দিরে নিয়ে গিয়েছেন চেন্নাই কর্তারা। বেঙ্কটেশ্বরের আশীর্বাদে এই ট্রফি শ্রীনির পকেটে কতটা লক্ষ্মীর আশীর্বাদ নিয়ে আসে, করমণ্ডল উপকূলে এখন সেটাই জল্পনা।
হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হতে পারে ধোনির, চেন্নাই কর্তার কথায় মাহির অবসর ইঙ্গিত