
শেষ আপডেট: 7 December 2018 18:30
ফানেলের মতো আকৃতির রবার বা সিলিকনের কাপ। মূলত মেডিক্যাল গ্রেড সিলিকন (মার্কিন মুলুকে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন FDA এবং রেডিওলজিক্যাল হেলথ CDRH গবেষণায় এই সিলিকনকে স্বীকৃতি দিয়েছে ) তৈরি হয় এই কাপের খোলস। তা ছাড়া ল্যাটেক্স এবং থার্মোপ্লাস্টিক ইলাস্টোমারও (TPE) কাপ তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি ভাঁজ করে যোনিপথ দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়। ছেড়ে দিলে ইলাস্টিকের মতো সেটা প্রসারিত জরায়ুমুখে আটকে যায়। ঋতুস্রাবের সময় এর মধ্যেই জমে ঋতুকালীন রক্ত। ৮-৯ ঘণ্টা পরপর (অধিক ঋতুস্রাব হলে ৪-৭ ঘণ্টা অন্তর) সেই ফানেল বা কাপ বের করে পরিষ্কার করে আবার জরায়ুমুখে ঢোকানো যায়। নির্মাতা সংস্থাগুলির দাবি, ঠিকঠাক ব্যবহার করলে এক-একটি কাপ ৮-১০ বছর চলতে পারে।
প্যাডের ব্যবহার ধীরে ধীরে সেকেলে হয়ে যাচ্ছে, দাবি অনেক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞেরই। ডঃ মল্লিনাথ জানালেন, বারে বারে প্যাড বদলের চিন্তা থাকে। জামা কাপড়ে দাগ লাগারও আশঙ্কা থেকে যায়। কাপে সেই সমস্যা নেই। উপরন্তু এটা ফের ব্যবহার করা করার সুবিধা রয়েছে। একবার দাম দিয়ে কিনলে অন্তত দশ বছরের জন্য নিশ্চিন্ত। বর্জ্য তৈরি হয না বলে পরিবেশবান্ধবও।
ব্র্যান্ডের উপর নির্ভর করে কাপের দাম মোটামুটি ৪০০ থেকে ১২০০ টাকার মতো। বিদেশি সংস্থার তৈরি কাপ ২ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা মতো দাম পড়ে। বেশ কয়েকটি নির্মাতা সংস্থার কাপ এখন জনপ্রিয়, তাদের মধ্যে রয়েছে কিপার কাপ, মুন কাপ, লুনেট মেনস্ট্রুয়াল কাপ, ডিভা কাপ, লেনা কাপ এবং লিলি কাপ। অনলাইনে যে কোনও নির্মাতা সংস্থার ওয়েবসাইট থেকে কেনা যাবে এই কাপ।
ডঃ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়[/caption]
মেনস্ট্রুয়াল কাপের উপকারিতা রয়েছে অনেক। ডাক্তারবাবুর কথায়, বর্তমানে স্টেম সেল থেরাপি নিয়ে গবেষণা চলছে।স্টেম হল অবিভাজিত জীবকোষ, যা আজীবন আরও অনেক স্টেম সেল তৈরি করতে পারে। এই এক কোষ থেকে বিভাজন ও পৃথকীকরণ পদ্ধতিতে আরও অনেক কোষ তৈরি হয়। সন্তান জন্মের পর মায়ের স্টেম সেল ধরে রেখে ভবিষ্যতে চিকিৎসার কাজে লাগানো হয়। ঋতুস্রাবের রক্তেও থাকে স্টেম কোষ। চিকিৎসকরা অনেক সময়ই ঋতুস্রাবের রক্ত ধরে রেখে তার মধ্যেকার স্টেম কোষ ভবিষ্যতে নানা জটিল অসুখ সারানোর কাজে ব্যবহার করেন।
ডঃ মল্লিনাথের কথায়, এই কাপ যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে পারলে, তার মধ্যে জমা হওয়া ঋতুস্রাবের রক্ত স্টোর করে রাখা যেতে পারে। এক জন মহিলার দিনে গড়ে ২৫-৩০ মিলিলিটার ঋতুস্রাব হয়, আর কাপের ফানেলে জমা হতে পারে প্রায় ৬০ মিলিলিটার রক্ত। কাজেই উপযুক্ত ভাবে স্টেরিলাইজ করার পর এই কাপে জমা হওয়া রক্ত সহজেই স্টোর করে রাখা যেতে পারে।
কয়েকটি বিধি। কী ধরনের কাপ ব্যবহার করবেন সেটা বিশেষজ্ঞেরা প্রধাণত শরীরের গঠন এবং নানা বিষয় দেখেই ঠিক করে দেন। প্রথমত দেখা হয় বয়স, তার পর কার্ভিক্সের গঠন (যৌনাঙ্গের নীচের অংশ যা জরায়ুর সঙ্গে যুক্ত), হেভি পিরিয়ডের সমস্যা আছে কি না, কাপের ক্যাপাসিটি এবং সন্তানধারণ করেছেন কিনা।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়স ৩০ বছরের নীচে হলে ছোট কাপ ব্যবহারেরই পরামর্শ দেওয়া হয়, ত্রিশের উপর বয়স হলে এবং সন্তানের জন্ম দিলে যৌনাঙ্গের পেশি অনেক শিথিল থাকে, তখন বড় কাপ ব্যবহারেরই পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা।
হাত ভালো করে ধুয়ে কাপটি লুব্রিকেট করে নিতে হবে (জল বা কোনও লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করতে পারেন)। কাপের খোলা মুখটি উপরে রেখে নীচের অংশ শক্ত করে ধরে কার্ভিক্সের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে। ছাতার মতো খুলে গিয়ে কাপটি আটকে যাবে যৌনাঙ্গে। এ বার ঘুরিয়ে সেটির মুখ আটকাতে হবে, যাতে ঋতুস্রাবের রক্ত বাইরে না বেরিয়ে আসে। কোনও রকম সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। টানা ৮ ঘণ্টা ব্যবহার করা যাবে এই কাপ। প্রতি বার খুলে ফেলার পর গরম জলে ফুটিয়ে সেটিকে স্টেরিলাইজ করতে হবে। সঙ্গমের সময়ে এই কাপ ব্যবহার করা যাবে না।
ডাক্তারবাবুর কথায়, প্যাড বা ট্যাম্পন ব্যবহারের যে অসুবিধাগুলো রয়েছে, সেটা কাপের ক্ষেত্রে অনেকটাই কম। ট্যাম্পন (কাপের মতোই যৌনাঙ্গে ঢুকিয়ে ঋতুস্রাবের রক্ত ধরে রাখার ব্যবস্থা) ব্যবহার সঠিক ভাবে না করলে সংক্রমণজনিত রোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দীর্ঘ সময় যৌনাঙ্গে ট্যাম্পন ঢোকানো থাকলে, তাতে জমা হওয়া ঋতুস্রাবের রক্তে ব্যাকটেরিয়া জন্ম নেয়। অনেক সময়েই দেখা যায় এই ব্যাকটেরিয়া যৌনাঙ্গে প্রবেশ করে জটিল রোগ তৈরি করে, যাকে 'টক্সিক শক সিনড্রোম' (TSS) বলে। কাপের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা অনেক কম, তবে নির্দিষ্ট সময় অন্তর কাপ বার করে স্টেরিলাইজ না করলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যায়।