
শেষ আপডেট: 7 February 2020 02:30
রত্না ভট্টাচার্য্য শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
ছোট্ট পাহাড়ি ডুলুং নদীর পূর্বদিকে জঙ্গলের অপরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশে মন্দিরটির অবস্থান। চিলকিগড় গ্রামের পশ্চিমপ্রান্তে গভীর শাল জঙ্গল। ডুলুং নদীটির গতিপথ পূর্বদিকে বইতে বইতে চিলকিগড় গ্রামের উত্তর সীমানায় একেবারে সোজা দক্ষিণদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে প্রায় সমকোণের সৃষ্টি করেছে। এই বাঁকটির বাঁদিকে কনকদুর্গা মন্দিরের জঙ্গল।
এই জঙ্গলটির ভূষণ, প্রায় ৪৩৩ প্রজাতির গাছগাছড়া। লক্ষ করলে দেখা যাবে, দেবদারু, অর্জুন, নিম, বাবলা, বাঁদরলাঠির মত গাছ যেমন রয়েছে, তেমন বিরাজ করছে লং, পিপুল, গুলঞ্চ, পুনর্নবা, অতসী, মৃতসঞ্জীবনী ইত্যাদি গাছও। গাছগাছড়ার যেমন ভেষজ গুণ আছে, তেমন রয়েছে গ্রামীণ অর্থনৈতিক গুরুত্ব। ঝুড়ি বোনা থেকে শুরু করে নিমকাঠিতে শালপাতার বাসনপত্র তৈরি, খাড়াং জাতীয় গাছ থেকে তৈরি ভাল ঝাঁটা ইত্যাদি। নানাবিধ ফুল ও ফলের গাছ আর সেই গাছে আশ্রয় নেওয়া পাখপাখালির আওয়াজ মন্দিরকে দান করেছে আশ্রমিক পরিবেশ। জঙ্গলের পথ ধরে এগোতে এগোতে পৌঁছে যাওয়া যাবে মন্দিরের কাছে।
মন্দির বলতে, পুরনো আমলের যে মন্দির রয়েছে, সেটি বর্তমানে ভগ্নাবশেষমাত্র। এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন সামন্তরাজা গোপীনাথ সিংহ মত্তগজ, ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দে। প্রাচীন পঞ্চরত্ন মন্দিরটি জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ায় একই চত্বরে তৎকালীন রাজা জগদীশচন্দ্র দেও ধবলদেবের উদ্যোগে পাশেই নতুন মন্দির নির্মিত হয় ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে।
নতুন মন্দিরটির স্থাপত্যশৈলী বেশ আধুনিক। মন্দিরটি দক্ষিণমুখী। একরত্ন মন্দিরের চূড়া গির্জার মত সুচালো। রয়েছে গর্ভগৃহ ও চারিদিকে খোলা বারান্দা। সামনের দিকে খানিকটা অংশ সিঁড়ির পর একটি টিনের বড় চালা, যাকে জগমোহন বলা হয়। এই প্রশস্ত জায়গাটিতে আছে বিরাট হোমকুণ্ড আর উত্তরে বলিদানের স্থান। মোষ বলির জন্য পোঁতা রয়েছে দু’টি মোটা কাঠ আর হাঁড়িকাঠ রয়েছে ছাগল বা মেষ বলি দেওয়ার জন্য। ওড়িশা থেকে স্থপতি আনিয়ে পুরনো এবং নতুন দুটো মন্দিরই নির্মিত হয়।
কথিত আছে যে, রাজা গোপীনাথ সিংহ মত্তগজের আমলে পাথরে খোদাই করা মূর্তির অনুকরণেই কনকদুর্গার বর্তমান বিগ্রহের রূপ। রাজা, রাজপুরোহিত ও ধাতুশিল্পী যোগী কামিল্যা, তিনজনেই দেবীর একই রূপ দেখেছিলেন স্বপ্নে। স্বপ্নাদেশের বর্ণনা অনুযায়ী দেবীর মূর্তি নির্মিত হয়। অশ্ববাহিনী, ত্রিনয়না, চতুর্ভুজা মূর্তি তৈরি হয় রানি গোবিন্দমণির হাতের সোনার কঙ্কন দিয়ে। সোনার দুর্গা তাই কনকদুর্গা মন্দির।
দেবী চণ্ডীর একটি লোকরূপ হল কনকদুর্গা। দেবীর চারটি হাত। ওপরের বামহাতে পানপাত্র, নীচের বামহাতে ঘোড়ার লাগাম। ওপরের ডানহাতে খড়্গ আর নীচের ডানহাতে বরাভয় মুদ্রা। মন্দিরের নিত্যসঙ্গী নির্জনতা হলেও দুর্গাপূজার কয়েকটি দিন হাজার মানুষের উপস্থিতি ও মাদলের শব্দ সেই নির্জনতাকে খানখান করে দেয়। চণ্ডীপাঠের গুরুগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ আর তার সঙ্গে হোমকুণ্ডের ‘ওম স্বাহা’ শব্দ ছড়িয়ে পড়ে দিগদিগন্তে।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, চিলকিগড়ের চিরচেনা ছবিটা সম্প্রতি বদলে গেছে সৌন্দর্যায়নের হুজুগে। পর্যটন দফতরের বরাদ্দ কোটি টাকায় বন দপ্তরের উদ্যোগে কনকদুর্গা মন্দির চত্বরে নানা ধরনের পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। ঢোকার মুখে পিচরাস্তার ওপর তৈরি হয়েছে বিশাল ‘অশ্বদুয়ার’। দেবীর বাহন অশ্ব। তাই প্রকাণ্ড কংক্রিটের প্রবেশপথের মাথায় দু’টি ঘোড়ার মূর্তির মাঝে রয়েছে দেবীমূর্তির কংক্রিটের রেপ্লিকা। মন্দিরে যাবার লাল মোরাম বিছানো পথ আজ কংক্রিটের ঢালাই রাস্তা। রাস্তার দু’ধারে বাতিস্তম্ভ। মন্দির চত্বর জুড়ে তৈরি হয়েছে নীল-সাদা রঙের ফোয়ারা, সবুজ ঘাসের লন, পর্যটকদের বসার আসন, শিশু উদ্যানে রয়েছে দোলনা, স্লিপারের ব্যবস্থা। পুজোর সামগ্রী ও খাবার দোকানের অস্থায়ী ঘরগুলি ভেঙে কংক্রিটের সাতটি দোকান ও একটি গুদামঘর হয়েছে। চড়ুইভাতি করার জন্য জঙ্গলের ভেতরে এদিক-সেদিক অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া ৮টি সিমেন্টের বেদি তৈরি হয়েছে। পাশে রয়েছে জলের ট্যাপ। এগুলির পোশাকি নাম বনভোজন ছাউনি।
সৌন্দর্যায়নের নামে কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়ে প্রকৃতিকে ধ্বংস করে চিলকিগড়ের আসল মজাটাই হারিয়ে যাচ্ছে। সেদিকে অবিলম্বে নজর দেওয়া উচিত মন্দির উন্নয়ন কমিটির।
তবে মন্দিরের পাশ দিয়ে কাঁচা মাটির রাস্তা অবিকৃতই আছে। সেই এবড়োখেবড়ো পথ ধরে খানিকটা গেলেই মিষ্টি ডুলুং নদীর সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। নামটি তার জলতরঙ্গের মত, চরিত্র পাহাড়ি নদীর। পাথরে পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে তিরতির করে আপনমনে বয়ে চলেছে। নদীর বেড থেকে দু’পাশের পাড় অনেকটা উঁচু।
জামবনি রাজবাড়ি
ডুলুং নদীর পশ্চিম তীরে দেও ধবলদেবদের রাজবাড়ি। নদীর উলটো দিকের পাড়ে উঠে প্রথমে পড়বে মাঠ, তারপর আদিবাসীদের গ্রাম। গ্রামের শেষপ্রান্তে জামবনি রাজপ্রাসাদ বা চিলকিগড় রাজপ্রাসাদ। অনেকটা জায়গা জুড়ে রাজবাড়ি। বিশাল লোহার দরজা পেরিয়ে সামনে বড়সড় চত্বর। আগে ফুলের বাগান ছিল। এখন সব শূন্য। রয়েছে প্রাচীন এক অশ্বত্থগাছ। গাছের পাশে একরত্ন শিবমন্দির।
ডাইনে রাজপ্রাসাদ। প্রাসাদের গায়ে বাঁদিকে কালাচাঁদের পূর্বমুখী একরত্ন মন্দির। কালাচাঁদের একরত্ন ও শিবলিঙ্গের একরত্ন মন্দির দু’টি গুরুত্বপূর্ণ না হলেও স্থাপত্যবৈশিষ্ট্যে অভিনব। কারণ, এখানকার এই দেবগৃহে দালানমন্দিরের ওপরে যথাক্রমে নবরত্ন ও একরত্নের সংযোজন প্রথাবহির্ভূত রীতির উদাহরণ। প্রাসাদের ঘরগুলি সবই তালাবন্ধ। চত্বরের মাঝে রয়েছে একাকী নিঃসঙ্গ এক কুয়ো। গ্রামবাসীরা এখনও এই কুয়োর জল ব্যবহার করেন।
ঝাড়গ্রামে রাত্রিবাস করে জায়গাটি দেখে নেওয়া যায়। ঝাড়গ্রামে রাত্রিবাসের ঠিকানা- ঝাড়গ্রাম টুরিস্ট কমপ্লেক্স, চলভাষ- ৭৪৭৭৪২৪৮৫৪। অরণ্যসুন্দরী গেস্ট হাউস, দূরভাষ- ০৩২২১ ২৫৬৮৭২, চলভাষ- ৯৫৪৭৬৬৮৯৬৬।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।