
শেষ আপডেট: 19 February 2021 09:36
মোঘল আমলের বহু আগে থেকেই, যেমন খ্রিস্টীয় নবম-দশম শতাব্দীতে ছড়রা ছিল পাকবিড়রা, বুধপুর বা আনাইজামবাদের মতো এক বিখ্যাত জৈন তীর্থক্ষেত্র। ফলে বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে ছড়রায় এক সময় সাতটি দেউল ছিল। J. D. Beglar-এর লেখায় তারই প্রমাণ পাওয়া যায়, ‘Here are some ruins of old temples, two tamples partitally ruined, still exciest।’
যদিও বর্তমানে একটি দেউলই চোখে পড়ে। পাথরের দেউলটি পোদ্দারপাড়ায় গোপাল নন্দীর বাড়িতে অবস্থিত। দেউলটির একেবারে জীর্ণদশা। মস্তক অংশের আমলকটি ভগ্নদশাপ্রাপ্ত, কলস ও পতাকাদণ্ড বিনষ্টিত। দেউলটির গর্ভগৃহ বেশ খানিকটা মাটিতে বসে গেছে। দেউল বিগ্রহহীন। বিগ্রহগুলি স্থান পেয়েছে স্থানীয় ধর্মঠাকুরের মন্দিরে, বাসন্তীদেবীর মন্দির গাত্রে এবং শিবমন্দিরে। এটি একটি রেখ দেউল। উচ্চতা প্রায় ২২ ফুট। তেলকুপি, বান্দার দেউলের সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে। দেউলটির রক্ষণাবেক্ষণের কোনও প্রচেষ্টা সরকার বা জনসাধারণ কেউই করেনি। মন্দিরটি পরিত্যক্ত।
এই গ্রামটিতে রয়েছে কতগুলি ছোট ছোট পাড়া। যেমন বাদ্যকরপাড়া, ব্রাহ্মণপাড়া, পোদ্দারপাড়া প্রভৃতি। বাদ্যকরপাড়ায় ঢুকলেই মনে হবে যেন কোনও সংগ্রহশালায় আসা হয়েছে। বাদ্যকরপাড়ায় রয়েছে ধর্মঠাকুরের মন্দির ও মনসামন্দির। মন্দির বলতে সিমেন্টের পাকা বড় ঘর। এই ঘরে রয়েছে দুটি কাঠের সিংহাসনের ওপরে বেশ কিছু ভাঙা মূর্তি। মূর্তিগুলির বেশির ভাগই তীর্থঙ্করদের মুখ বা দেহের বিভিন্ন অংশ। এগুলিকে ধর্মরাজ শিলা বলে পূজা করেন ডোম সম্প্রদায়ের মানুষেরা। মন্দিরের বাইরের দেওয়ালে পার্শ্বনাথের মূর্তি আটকানো রয়েছে। আরও একটি তীর্থঙ্কর মূর্তি ডান দিকের দেওয়ালে আটকানো রয়েছে। বাঁ দিকের দেওয়ালে বল্লম ও তলোয়ার হাতে একটি বীরস্তম্ভ রয়েছে।
মন্দিরের সামনে রয়েছে এক বড় চাতাল। সেখানে রয়েছে শ্বেতপাথরে নির্মিত পাদযুগল, পদ্মাকৃতির একটি প্রস্তরখণ্ড (এটিকে গ্রামবাসীরা সূর্যদেবতা জ্ঞানে পূজা করেন) তিনটি চৈত্য, পাঁচটি কলস। চৈত্যগুলি দেউল আকৃতির, যেন বড় কোনও দেউলের ক্ষুদ্র রূপ, চারিপাশে খোদিত জৈন তীর্থঙ্কর মূর্তি। ছড়রায় প্রাপ্ত বেশ কিছু অক্ষত মূর্তি রাখা আছে রামকৃষ্ণ মিশন সংগ্রহশালায়। এই মন্দিরের পুরোহিত বাদ্যকারগণ। প্রতি বছর রাখী পূর্ণিমায় ধর্মপূজা হয় এবং এই পূজা উপলক্ষ্যে বিরাট মেলা বসে এবং প্রচুর জনসমাগম হয়।
এই গ্রামে ধর্মরাজের মন্দির ছাড়াও রয়েছে শিবমন্দির, বাসন্তী মাতার মন্দির ও কালীমন্দির। শিবমন্দিরের প্রবেশপথের ডান দিকের দেওয়ালের গায়ে একটি জৈন মূর্তি, বাসন্তী মাতার মন্দিরের দেওয়ালের গায়ে আর একটি মূর্তি রয়েছে। কিন্তু মূর্তিটির গায়ে সবুজ রং দিয়ে মূর্তিটিকে বিকৃত করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চপ্রাথমিক বিদ্যালয়, ব্যাঙ্ক ও গ্রামপঞ্চায়েতের অফিস নিয়ে গ্রামটি স্বয়ংসম্পূর্ণ। গ্রামের কেন্দ্রে হরিমেলায় প্রতিদিন সবজি বাজার বসে।
গ্রাম থেকে দূরে ছড়রা লাইন হোটেল বা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ৫ মিনিটের হাঁটাপথে একটি গাছের তলায় ১০ থেকে ১২টি বীরস্তম্ভ রয়ে গেছে। জনশ্রুতি, বর-কনে বিয়ে করে ফেরার পথে বিশ্রামরত অবস্থায় প্রস্তরীভূত হয়ে যায়। অনুমান করা যায়, ওই স্থানটি পূর্বে কবরস্থান বা শ্মশান ছিল। বর্তমানে শ্মশানটি দূরে সরে গেছে।
গ্রামের শেষ প্রান্তে একটি বড় তেঁতুলতলায় রয়ে গেছে বাঘরুথ নামে গ্রামদেবতা। পৌষ সংক্রান্তিতে এখানে পূজা হয়। মন যদি কৌতূহলী ও অনুসন্ধিৎসু হয় তবেই এ গ্রাম ঘুরলে মজা পাওয়া যাবে।
বীরস্তম্ভ : এগুলি আসলে সমাধিপ্রস্তর। পুরুলিয়ার হো, মুন্ডা, ভূমিজ, সর্দার প্রভৃতি জাতির বীর যোদ্ধা যখন কোনও যুদ্ধে নিহত হতেন তখন তাঁর স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে এবং তাঁকে মনে রাখার জন্য তাঁর সমাধিতে এই ধরনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হত। লম্বা পাথরের ফলকের ওপর খোদাই করে বীরস্তম্ভগুলি তৈরি হত। প্রথম দিকে প্রস্তরখণ্ডগুলি সাদামাঠা থাকলেও পরবর্তীকালে এগুলি কারুকার্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। মূর্তির ওপরে সিংহের বা বাঘের মূর্তিও খোদাই করা হয়ে থাকে। এগুলি যেখানে মৃতদেহকে সমাধিস্থ করা হত সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হত তবে তা সাধারণত প্রতিষ্ঠিত হত গাঁয়ের মাথায়, পুকুরপাড়ে বা বড় গাছের নীচে।
সরকারি হস্তক্ষেপে খননকার্য বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে গজপুর প্রত্নস্থল সরকার কর্তৃক অধিগৃহীত এবং মূর্তিগুলোকে নিয়ে পুরুলিয়ার সার্কিট হাউসে রাখা হয়েছে।
এখানে এখনও পাণ্ডাপ্রথা চালু আছে। গৌরীনাথধামে বাবাকে সাক্ষী রেখে বিবাহাদি সম্পন্ন হচ্ছে আজকাল। মন্দির খোলা থাকে সকাল ৫টা থেকে ২.৩০ পর্যন্ত এবং বিকাল ৫টা থেকে ৯টা পর্যন্ত। বাবার নামানুসারে নিকটবর্তী রেলস্টেশনের নামও হয়েছে গৌরীনাথধাম। পুরুলিয়া স্টেশনের পরের স্টেশনই গৌরীনাথধাম। গৌরীনাথধাম স্টেশন থেকে অথবা সড়কপথে পুরুলিয়া থেকে ঝালদাগামী বাসে চাস মোড়ে নেমে হেঁটে বা রিকশায় এখানে আসা যায়।
চাকলতোড় বিখ্যাত তার ছাতা মেলা বা ছাতা পরবের জন্য। এছাড়াও এই গ্রামে রয়েছে অষ্টাদশ শতকে তৈরি শ্যামচাঁদের জোড়বাংলা মন্দির। মন্দিরটি একেবারেই সাদামাটা। অভ্যন্তরে কৃষ্ণের অপরূপ মূর্তি। বাল্যভোগ ও অন্নভোগের নিত্য ব্যবস্থা আছে। ছাতা পরবের নেপথ্যে এক নয়, একাধিক ইতিহাস আছে। কোনও একসময় পঞ্চকোটের রাজার সঙ্গে ছাতনার রাজার যুদ্ধ বেধেছিল। সেই যুদ্ধে পঞ্চকোটরাজ জয়লাভ করেন। এই ছাতা মেলা তারই বিজয় উৎসব। সময় ও লগ্ন দেখে বিকেলের দিকে পঞ্চকোট রাজবংশের কেউ এসে একটি বিরাট লম্বা বাঁশের ডগায় একটি বিরাট সাদা রঙের ছাতা উত্তোলন করেন। এই ছাতা পরবকে উপলক্ষ্য করে একটি মেলা হয় প্রতি বছর। মেলাটি এক রাত্রির হলেও লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষজনই এই মেলায় বেশি করে যোগদান করেন কারণ, আদিবাসীদের মধ্যে একটি নিয়ম প্রচলিত আছে যে মেয়েদের একবার এই ছাতা মেলায় যেতেই হবে। তাই প্রায় সকলেই অন্তত একবার এই মেলায় যাওয়ার চেষ্টা করে।
আর একটি প্রচলিত কাহিনি হল, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পঞ্চকোটরাজ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তখন সাঁওতাল বিদ্রোহের আগুন জ্বলে উঠেছে। সাঁওতালদের ইতস্তত বিচ্ছিন্ন হতে না দিয়ে একত্রিত করে সাংগঠনিকভাবে ইংরেজ শক্তির বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। শোনা যায়, হাজার হাজার সাঁওতাল ভাদ্র সংক্রান্তির দিনে চাকলতোড়ের ছাতা মাঠে সমবেত হয়ে এক ঐতিহাসিক শপথ গ্রহণ করেন। প্রতি বছর এই মাঠে, এই দিনে একদিনের জন্য সকলে মিলিত হওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। সম্ভবত এই কারণেই এই মেলাতে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের আধিক্য দেখা যায়। এছাড়াও এই মেলার সঙ্গে ‘ভাদু’ পরবের একটা সম্পর্ক আছে বলে শোনা যায়। পঞ্চকোট রাজবংশে ভদ্রাবতী নামে একজন সুন্দরী মেয়ে ছিলেন। তিনি কুমারী অবস্থায় মারা যান। তাঁরই স্মরণে প্রতিমা তৈরি করে সারা মাস ধরে চলে ভাদু গান এবং সংক্রান্তির দিনে বিসর্জন দেওয়া হয়। ওই দিনেই ছাতা মেলা অনুষ্ঠিত হয়।
পুরুলিয়া শহরে রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া যায়, রাত্রিবাসের ঠিকানা : হোটেল আকাশ, দূরভাষ : ০৩২৫২ ২২৪৫৩৫, চলভাষ : ৯৭৩৫১৪৪১৫৫।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।