শেষ আপডেট: 10 April 2020 09:07
এই গ্রামের পুণ্য মাটিতে ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দের মাঘ মাসের শুক্লাপঞ্চমীর দিন সরস্বতী দেবীর বরপুত্র মহাকবি কৃত্তিবাস জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বনমালী ও মাতা মালিনীদেবী। এঁদের আসল পদবি ছিল মুখোপাধ্যায়। কৃত্তিবাসের প্রপিতামহ নৃসিংহ মুখোপাধ্যায় ছিলেন মহাপণ্ডিত ও চার বেদে সমান অধিকারী, চতুর্বেদী। সমস্ত বঙ্গদেশ এমনকি কাশী, কনৌজ থেকেও তাঁর কাছে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা বেদের পাঠ নিতে আসতেন, এজন্য তিনি উপাধ্যায় বলে কথিত হতেন। মুখে মুখে পদবি উপাধ্যায় থেকে ওঝায় পরিণত হয়।
গুরুগৃহে শিক্ষা শেষ হওয়ার পর কৃত্তিবাস পণ্ডিতরূপে খ্যাতি লাভ করেন। রাজপণ্ডিত হওয়ার আশায় তিনি গৌড়েশ্বরের সভায় যান এবং নিজের লেখা পাঁচটি সংস্কৃত শ্লোক রাজার নিকট পাঠান। গৌড়েশ্বর অত্যন্ত প্রীত হন কৃত্তিবাসের সঙ্গে পরিচিত হয়ে। তাঁরই ইচ্ছানুসারে কৃত্তিবাস গ্রামে ফিরে এসে বাংলাভাষায় রামায়ণ লিখতে শুরু করেন। কৃত্তিবাস বাল্মীকির রামায়ণের যথাযথ অনুবাদ না করে অন্যান্য পুরাণ থেকে বা কথকগণের কাছ থেকে শুনে কিছু নতুন বিষয়ের সংযোগ করেন। এইখানেই কৃত্তিবাসের মৌলিকত্ব। যদিও রামায়ণ লিখতে গিয়ে তাঁকে অনেক প্রতিকূল পরিবেশে পড়তে হয়েছিল। একঘরে হওয়ার ভয়কে উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন বলেই আমরা এমন একটি মৌলিক মহাকাব্য হাতে পেয়েছি। এই রামায়ণ শ্রীরামপুর ছাপাখানা থেকে উইলিয়াম কেরি সাহেবের অক্লান্ত পরিশ্রমে ও অসাধারণ প্রচেষ্টায় ১৮০২ বা ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে ছাপার অক্ষরে বেরিয়ে আসে।
মহাকবি কৃত্তিবাসের জন্মভিটা ধ্বংসের কবলে চলে গেছে। ভিটেমাটিতে গড়ে উঠেছে শ্বেতপাথরের স্মৃতিস্তম্ভ। স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় এর ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন প্রায় ১০০ বছর আগে। স্মৃতিস্তম্ভের উত্তর দিকে স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয় ও খেলার মাঠ। মাঠের এককোণে একটি বহুদিনের পুরনো ইঁদারা, গায়ে লেখা কৃত্তিবাস কূপ। ইঁদারাটি আগাছায় পরিপূর্ণ। স্মৃতিস্তম্ভের পিছনেই এক বিশাল বটগাছ। গাছের গোড়াটি সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো, তার গায়েও প্রস্তরফলক লাগানো রয়েছে। লেখা রয়েছে-– “এই বটবৃক্ষের শীতল ছায়ায় বসিয়া কবি কৃত্তিবাস তাঁর প্রসিদ্ধ রামায়ণ রচনা করেছিলেন।“
পাশেই কৃত্তিবাস-মন্দির। ইদানীং কালের। কৃত্তিবাসের মূর্তির পাশাপাশি রয়েছে রাম-সীতা-লক্ষ্মণ-হনুমান। প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ রবিবার কৃত্তিবাসের জন্মোৎসব পালিত হয়। সেই অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হয়েছে একটি বড়সড় স্থায়ী মঞ্চ। এই মঞ্চে কৃত্তিবাসকে স্মরণ করে নানাবিধ অনুষ্ঠান, তৎসহ রামায়ণ প্রদর্শনী ও রামায়ণ গান প্রভৃতি হয়ে থাকে।
মাত্র ৫০ গজ দূরে কৃত্তিবাস স্মৃতিভবন ও সংগ্রহশালা। এখানে রাখা আছে কবির হাতের লেখা। তাঁর লেখা পুথি মাইক্রোফিল্মে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এই গ্রন্থাগারে। এখানে রয়েছে বিভিন্ন ভাষায় লেখা রামায়ণের বহু সংস্করণ। সংগ্রহশালায় রয়েছে ৩৬টি তৈলচিত্রে বর্ণিত রামের জীবনী। সংগ্রহশালাটি গাছপালায় ছাওয়া, সুন্দর।
সংগ্রহশালার গায়েই লাগানো রয়েছে চৈতন্যগতপ্রাণ যবন হরিদাসের ভজনস্থলী বা সাধনপীঠ। এই অঞ্চলের আর এক কিংবদন্তি পুরুষ ছিলেন হরিদাস ঠাকুর। তিনি জাতিতে ছিলেন মুসলমান কিন্তু শ্রীচৈতন্যের একান্ত অনুরক্ত। তিনি সবসময় নাম জপ করতেন। মুসলমান হয়েও বৈষ্ণবীয় ক্রিয়াকলাপে লিপ্ত থাকার অপরাধে প্রাদেশিক শাসনকর্তা তাঁকে ‘বাইশ বাজারে’ বেত্রাঘাত করার আদেশ দেন। সাধারণত দু’টি-তিনটি বাজারের বেত্রাঘাতেই জীবনের অন্তিম দশা উপস্থিত হওয়ার কথা। হরিদাস বেতের আঘাত সহ্য করতে করতে বলেছিলেন, ‘এ সব জীবেরে প্রভু করহ প্রসাদ/ মোরে দহু নহু এ সবার অপরাধ।’ মহাপুরুষদের জীবনের শাশ্বত বাণী-– সবাইকে ভালবাস। নীলাচল যাওয়ার পথে শ্রীচৈতন্য এখানে এসে হরিদাসের সাধনপীঠে কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং ভক্তদের দর্শন দেন।
বড় বড় আম, বেল, নিম, অশ্বত্থ, কাঠচাঁপা গাছে, পাতায় ছাওয়া ভজনস্থলীটি শান্ত ও ধ্যানগম্ভীর। ঢুকতেই নজরে আসে পাশাপাশি ৮টি তুলসীমঞ্চ, কৃষ্ণের আট সখীকে কল্পনা করে করা হয়েছে। তুলসীমঞ্চ পেরোলেই একটি দালান মন্দির। রয়েছে বৈষ্ণব ভক্ত জগদানন্দ গোস্বামী কর্তৃক স্থাপিত কৃষ্ণ-রাধিকা ও বলরাম-রেবতীর চারটি মূর্তি। হরিদাসের ভজন গোফায় তৈরি হয়েছে তাঁর মন্দির। এখানকার একটি গাছের মূলের বেদি হরিদাসের নামজপের স্থান বলে পরিচিত। অদূরেই রয়েছে কৃত্তিবাসের অস্থি সমাধি। বৈষ্ণবদের কাছে হরিদাসের ভজনাস্থল এক পরমতীর্থরূপে পরিগণিত। দোল পূর্ণিমায় এখানে বহু ভক্তের আগমন ঘটে।
পাশেই বাংলাদেশের টাঙ্গাইল থেকে আগত তাঁতশিল্পীদের টাঙ্গাইল শাড়ি বুননের কাজ চলছে তাঁত কেন্দ্রগুলিতে অর্থাৎ ফুলিয়া গ্রামে। তাঁতিদের হাতেবোনা কাজ দেখা ও কেনা উভয়েরই ব্যবস্থা আছে। অনেকে মনে করেন যে কোনও জায়গায় বেড়াতে গেলে যদি কেনাকাটার সুবিধা না থাকে তবে ঘুরে পোষায় না। ফুলিয়ায় ঘুরতে গেলে সে আক্ষেপ পুষিয়ে যাবে।
ট্রেনে শিয়ালদহ থেকে শান্তিপুর লোকালে ফুলিয়া। সেখান থেকে ভ্যান-রিকশায় কৃত্তিবাস। ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারেই কৃত্তিবাস স্মৃতি তোরণ। তোরণের মাথায় লেখা–- বাংলা রামায়ণ রচয়িতা আদিকবি কৃত্তিবাস স্মৃতি তোরণ। শান্তিপুরের শিল্পী কানাই দেউরীর তৈরি তোরণটির মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়। এই তোরণ সর্বদা অভ্যর্থনা করতে প্রস্তুত তাদের, যারা কৃত্তিবাসের গ্রামে যেতে ইচ্ছুক। এই তোরণ থেকে কৃত্তিবাসের গ্রাম মাত্র দেড় কিলোমিটার।
ফুলিয়া থেকে ঘুরে আসা যায় বাগআঁচড়া। প্রবাদে বলে ‘ভিন্ন রুচির্হি মানবাঃ’। ভ্রমণার্থীরাও বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। কেউ যায় তীর্থ ভ্রমণে, কেউ যায় প্রকৃতি বীক্ষণে, কেউ যায় ঐতিহাসিক তথ্যানুসন্ধানে। আর কেবলমাত্র গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে দু’চোখ ভরে দেখতে বা গ্রামীণ জীবনের স্বাদ উপলব্ধি করতে হলে যেতে হবে শান্তিপুর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বাগআঁচড়া গ্রামে।
এই গ্রামে তিনটি দিক দিয়ে প্রবেশ করা যায়। শান্তিপুর স্টেশন থেকে পাকা সড়ক পথে অথবা ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে দিগনগরের কাছে বালিয়াডাঙার মোড় থেকে পিচের শাখা রাস্তা ধরে অথবা নদীপথে কালনা থেকে। একসময় এই গ্রাম গঙ্গা তীরবর্তী ছিল। এখনও খুব একটা দূরে নয়। পাশেই গঙ্গার প্রাচীন খাত, বর্তমানে ‘গোপিয়ার বিল’ নামে খ্যাত। কথিত আছে, রাজা রুদ্র একটি আদর্শ ব্রাহ্মণপ্রধান গ্রাম স্থাপন করার অভিপ্রায়ে গ্রামটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং বহু ব্রাহ্মণকে ভূসম্পত্তি দান করেন। ব্রাহ্মণদের সুপ্রতিষ্ঠাহেতু এ গ্রামের নাম হয় ব্রহ্মশাসন। অফুরান সবুজের মাঝে একটি ছোট্ট গ্রাম আঁকা ছবির মতো সুন্দর।
এই গ্রামের মূল আকর্ষণ হল বাগআঁচড়া দেবীর মন্দির। এই মন্দির গড়ে ওঠার নেপথ্যের কারণের জন্য নির্ভর করতে হয় কিছু জনশ্রুতির ওপর। ঠিক সেরকমই এক জনশ্রুতি হল, খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতকের মধ্যভাগে সাধক রঘুনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবী বাগ দেবীকে এই গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন। বাগ দেবী মানে দেবী সরস্বতী নন। দুর্গার প্রাচীন মূর্তি ছিল ব্যাঘ্রবাহিনী। ব্যাঘ্র থেকেই বাগ শব্দের উৎপত্তি।
রঘুনন্দন ছিলেন একজন শক্তিমান সাধক। তিনি পঞ্চমুণ্ডির আসনে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। তাঁর ভাগিনেয় মহাদেব মুখোপাধ্যায়ও এখানে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। ফলে স্থানটি সিদ্ধাশ্রম হিসাবে চিহ্নিত। বাগ দেবীর কোনও মূর্তি নেই। আছে প্রতীক শিলা ও ঘট। তিনটি সিঁদুরলিপ্ত ঘটেই পূজা হয়ে থাকে। এই সিঁদুরলিপ্ত ঘটটি নাকি রঘুনন্দন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ভক্তরা ঘটকেই জাগ্রত দেবী বলে মনে করেন এবং পূজা-মানতাদি দিয়ে যান। দেবীর দালান মন্দিরটি সাম্প্রতিক কালে নির্মিত হয়েছে। বড় বড় তেঁতুল, গাব, বটে ছাওয়া জায়গাটি উপাসনা করার আদর্শ স্থল। মন্দিরের একপাশে মানতের চিহ্নস্বরূপ প্রচুর ঢিল বাঁধা রয়েছে।
রঘুনন্দনের অভিশাপেই নাকি রাজা রুদ্র রায়ের দেওয়ান চাঁদ রায় নির্বংশ হন। চাঁদ রায় নামক এক প্রভাবশালী জমিদার প্রথমে বাগ দেবীর মন্দির নির্মাণ করেন। তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয় সংশয়াচ্ছন্ন। কেউ কেউ তাকে নদীয়ারাজ রুদ্র রায়ের দেওয়ান বলে মনে করে থাকেন। বাগ দেবী মন্দিরের কাছে রঘুনন্দনের বংশধররা এখনও বাস করেন এবং এই দেবীর পূজা তাঁরাই বংশপরম্পরায় করে আসছেন। মন্দিরের বর্তমান পূজারির নাম দেবব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, ফাল্গুন মাসের প্রতি মঙ্গল ও শনিবার বার্ষিক উৎসব ও পূজাদি হয়ে থাকে। বলি দেওয়ার রীতি আছে। উৎসব উপলক্ষ্যে এখানে একটি মেলাও বসে এবং বহু দূর থেকে প্রচুর ভক্তের সমাগম হয়ে থাকে। বন্দ্যোপাধ্যায় বাটীতে রঘুনন্দন পূজিত শ্যামরাইয়ের বিগ্রহ এখনও নিত্য পূজিত।
গোপিয়ার বিলের পাড়ে একটি চতুষ্কোণ উঁচু জমির চার কোণে চারটি মন্দির প্রতিষ্ঠিত ছিল। তার মধ্যে একটি ছিল শিবমন্দির, বাংলা আটচালা রীতির। বর্তমানে মন্দিরের কিছুমাত্র অবশিষ্ট নেই, কেবলমাত্র রয়ে গেছেন শিবমন্দিরের শিব যিনি সারাবছর বিলের জলে অবস্থান করেন। সন্ন্যাসীরা গাজনের সময় প্রত্যেক বছর বিলের জল থেকে শিবকে তুলে এনে একটু উঁচু জমিতে স্থাপন করে পূজা করে থাকেন। পূজা শেষে শিবকে আবার জলে ডুবিয়ে রাখা হয় একবছরের জন্য।
একটি ছোট্ট ছুটির অবকাশে গ্রামবাংলার ধুলোমাটির সঙ্গে মিশে থাকা ইতিহাস, জনশ্রুতি, প্রবাদ, লৌকিক দেবদেবীর গল্প শুনতে শুনতে কখন সময় কেটে যাবে তা খেয়ালই থাকবে না।
শান্তিপুরে রাত্রিবাস করে জায়গাগুলি দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। পুর অতিথি নিবাস, মতিগঞ্জ মোড়, শান্তিপুর, যোগাযোগ-- শান্তিপুর পুরসভা, দূরভাষ: ০৩৪৭২ ২৭৮০১৮।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।