Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে হেরে টেবিলের তলানিতে কেকেআর! গুরুতর বদলের ইঙ্গিত রাহানের নববর্ষের 'শুভনন্দন'-এও মুখ্যমন্ত্রীর SIR তোপ! বাংলায় পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রীরইরানের সব পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে‌ দেওয়া হয়েছে, দাবি আমেরিকার, চিন্তা ইরানি ল্যান্ডমাইনও Poila Baisakh: দক্ষিণেশ্বর থেকে কালীঘাট, নববর্ষে অগণিত ভক্তের ভিড়, পুজো দিতে লম্বা লাইনপয়লা বৈশাখেই কালবৈশাখীর দুর্যোগ! মাটি হতে পারে বেরনোর প্ল্যান, কোন কোন জেলায় বৃষ্টির পূর্বাভাসমেয়েকে শ্বাসরোধ করে মেরে আত্মঘাতী মহিলা! বেঙ্গালুরুর ফ্ল্যাটে জোড়া মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য UCL: চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ চারে পিএসজি-আতলেতিকো, ছিটকে গেল বার্সা-লিভারপুল‘ইরানকে বিশ্বাস নেই’, যুদ্ধবিরতির মাঝে বিস্ফোরক জেডি ভ্যান্স! তবে কি ভেস্তে যাবে শান্তি আলোচনা?১৮০ নাবালিকাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে শোষণ! মোবাইলে মিলল ৩৫০ অশ্লীল ভিডিও, ধৃতের রয়েছে রাজনৈতিক যোগ ৩৩ বছর পর মুখোমুখি ইজরায়েল-লেবানন! ওয়াশিংটনের বৈঠকে কি মিলবে যুদ্ধবিরতির সমাধান?

শিলদা ও তার ভৈরব

রত্না ভট্টাচার্য্য শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখনও বাড়ির বাইরে বেরতে মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি

শিলদা ও তার ভৈরব

শেষ আপডেট: 6 November 2020 06:34

রত্না ভট্টাচার্য্য শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য

বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এখনও বাড়ির বাইরে বেরতে মানা। বেড়াতে যাওয়ার চ্যাপ্টার আপাতত ক্লোজ। লকডাউন চলছে। বাসা-বন্দি বাঙালির প্রাণপাখি ছটফট করছে। তবুও ‘পায়ে পায়ে বাংলা’ যথারীতি প্রকাশিত হল। আপাতত ভ্রমণকাহিনি পাঠেই হোক আপামর বাঙালির মানসভ্রমণ।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় বিনপুর থানার অন্তর্গত আদিবাসী অধ্যুষিত শিলদা একটি প্রাচীন গঞ্জ। শিলদার মূল বাসস্টপ তেমাথা থেকে একটি রাস্তা মটগোদা, রাইপুর, তালড্যাংরা হয়ে বাঁকুড়া অবধি গেছে। একটি রাস্তা বিনপুর, দহিজুড়ি হয়ে ঝাড়গ্রাম আর একটি রাস্তা নারায়ণপুর হয়ে বেলপাহাড়ি গেছে। ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ শিলদার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘জঙ্গলমহলের বিখ্যাত চুয়াড় বিদ্রোহের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি ছিল শিলদা।’ শিলদা পরগনার আগের নাম ছিল ঝাটিবনি। এ অঞ্চল যে একসময় স্থানীয় আদিবাসীদের সম্পূর্ণ দখলে ছিল তা আজও বোঝা যায়। শিলদা ছাড়িয়ে আরও উত্তর-পশ্চিমে বেলপাহাড়ি ও তামাজুড়ি। তামাজুড়িতে প্রাগৈতিহাসিক যুগের তামার হাতিয়ার পাওয়া গেছে। শিলদা রাজবংশের গড়বাড়ি ও মন্দিরাদির ধ্বংসাবশেষ আজও রয়েছে। অনেকটা এলাকা জুড়ে ঘেরা রাজবাড়ি। তার চৌহদ্দির মধ্যেই একাধিক দেবালয় প্রতিষ্ঠিত। একটি দেবালয়ের গায়ে লিপি রয়েছে–- ১৭৪২ শকাব্দ অর্থাৎ ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তখন রানি কিশোরমণির রাজত্বকাল (১৮২০-১৮৪৮)। কিশোরমণিই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। গড়বাড়ি বা কাছারিবাড়ি এলাকার চৌহদ্দির মধ্যে রয়েছে দুর্গার দক্ষিণমুখী একটি দালানমন্দির। মন্দিরের খিলানশীর্ষে পোড়ামাটির কিছু দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে। এটি ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরটি ২৭ ফুট উঁচু ঝামাপাথরে নির্মিত আটচালার। সামনে পাথরের একটি বড় তুলসীমঞ্চ আছে। কাছারিবাড়ির প্রবেশপথে একটি বড় নহবতখানা ও বাইরে একটি নবরত্ন রাসমঞ্চ আছে। তবে দুটিরই ভগ্নদশা। এলাকার মধ্যে গাছতলায় খোলা জায়গায় একটি বড় শিবলিঙ্গ রয়েছে যিনি নিত্যপূজা পান। বর্তমানে এই এলাকার মধ্যে পাঠাগার, উপ-ডাকঘর হয়েছে। এখান থেকে কাছে রাজার বাঁধ বা শিলদার বাঁধ নামে বেশ বড়সড় জলাশয়ের ধারে কিশোরমণির প্রতিষ্ঠিত ৩০ ফুট উচ্চতার একটি পঞ্চরত্ন মন্দিরে উমেশ্বরনাথ শিব রোজ পূজিত হন। এটি ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে রানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জলাশয়টিও দেখার মতো। কিশোরমণির রাজত্বকালেই এই জলাশয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। নতুন বাজারে দ্বাদশনাথ শিব খুব জাগ্রত। চৈত্র গাজনে ধুমধাম হয়। চারচালা এই মন্দিরটিও রানির কীর্তি। আপালগঞ্জে শিবের একটি আটচালা মন্দির ও এখান থেকে একটু এগিয়ে শিলদা মডেল প্রাইমারি স্কুলের সামনে শম্ভুনাথের পঞ্চরথ শিখর দেউল রয়েছে। মন্দিরটি পাথরের। মন্দিরগুলির প্রতিষ্ঠালিপি না থাকলেও এগুলি উনিশ শতকে নির্মিত বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যে কারণে শিলদা ইতিহাসে খ্যাত হয়ে আছে সেটি হল, ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিসের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর প্রতিক্রিয়ায় যে চুয়াড় বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল তার প্রথম আগুন জ্বলে উঠেছিল এই শিলদাতেই। ১৭৯৮ সালে বাগদি সর্দার গোবর্ধন দিকপতির নেতৃত্বে দুটি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে সূচনা হয়েছিল চুয়াড় বিদ্রোহের। শুক্রবারে হাট বসে শিলদায়। সে হাটও বেশ বৈচিত্র্যময়।

ওড়গোঁদা

ইতিহাসখ্যাত ছোট্ট গঞ্জ শিলদার তিন সড়কের মোড় থেকে ৩ কিলোমিটার পথ গেলেই ওড়গোঁদা গ্রাম। এই গ্রামে রয়েছে ভৈরবনাথ দেবতার থান। আদিবাসীরা বলে থাকেন, ইনি আসলে আদিবাসীদের দেবতা মারাংবুরু। হিন্দু সমাজের হস্তক্ষেপে বাবা ভৈরবনাথে পরিণত হয়েছেন। এখানকার মানুষের বিশ্বাস, এই ভৈরব এক জাগ্রত দেবতা। শুধু ওড়গোঁদা গ্রামেই নয়, তাঁর পরিচিতি আজ গ্রাম অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। শস্যলাভ, সন্তানলাভ, অসুখ-বিসুখ, আপদ-বিপদ, মামলা-মোকদ্দমা প্রতিটি কাজেই মানুষের কাছে তিনি মহাদেবতা। শিলদা থেকে বাঁকুড়া যাওয়ার রাস্তার ধারে ২ কিলোমিটার গেলেই ফাঁকা পাথুরে জমির মাঝখানে দু-একটি গাছের তলায় মাকড়া পাথরের তৈরি অসম্পূর্ণ মন্দিরকে দেখতে পাওয়া যাবে। স্থানটি লোকমুখে ভৈরব মাড়ো নামেই পরিচিত। মাড়ো অর্থাৎ মণ্ডপ। এই মণ্ডপটি প্রায় সাড়ে চার ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট ত্রিরথ আকারের। বেদীর ওপর ৮টি স্তরের চিহ্ন বর্তমান। সিঁড়ির ধাপ রয়েছে। মনে হয় অতীতে কোনও দেবালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। মণ্ডপে আসীন কলসমূর্তিরূপী ভীষণদর্শন ভৈরব এবং সাতটি ডাকিনী মূর্তি। ভৈরবের মূর্তি প্রায় ৪ ফুট উঁচু। হাট-পা নেই, দেহের নিম্নাংশও নেই। চোখে দুটি কড়ি বসানো। তা সবসময় জ্বলজ্বল করে। অসম্পূর্ণ মন্দির নিয়ে লোকশ্রুতি আছে, বিশ্বকর্মা ষাঁড়ের পিঠে করে পাথর এনে এই মন্দির তৈরি করেছিলেন। ভোরবেলায় মোরগ ডেকে ওঠায় মন্দির আর সম্পূর্ণ হয়নি। মোরগ আর ষাঁড় পাথরে পরিণত হয়ে যায়। ওড়গোঁদায় প্রবেশের মুখেই মোরগ ও ষাঁড়কে দেখা যাবে। আরও একটি জনপ্রিয় লোকশ্রুতি ঘিরে আছে ভৈরবনাথকে নিয়ে। ভৈরবনাথের মূর্তিটি বসানো আছে একটি সুড়ঙ্গের ওপর। এখানকার পূজারিরা বলেন, এই সুড়ঙ্গ আসলে একটি পথ। পথটি গেছে ভৈরব থান থেকে ঘাটশিলা ধলভূমগড়ের রঙ্কিনী মন্দির পর্যন্ত। রঙ্কিনীদেবীই হলেন এই ভৈরবের ভৈরবী। যখন তারা মিলিত হবার জন্য এই সুড়ঙ্গপথে যাতায়াত করেন তখন মাটি থরথর করে কাঁপতে থাকে, গুড়গুড় শব্দ উঠতে থাকে মাটির তলা থেকে। সুড়ঙ্গের মুখ থেকে বের হতে থাকে গরম জল, বাষ্প। স্থানীয় মানুষরা তখন সুড়ঙ্গমুখে জল ঢেলে ভৈরবকে শান্ত করতে চেষ্টা করেন। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভৈরব টিলাটি আসলে একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। জ্বালামুখের ঠিক ওপরেই বিগ্রহটি স্থাপিত। আগ্নেয়গিরিটি যে জীবন্ত ছিল তার প্রকৃষ্ট নিদর্শন বিস্তীর্ণ প্রান্তর ঘিরে আগ্নেয়শিলার স্তূপ ও চতুর্দিকে রুক্ষ, বৃক্ষহীন শিলাময় উঁচু প্রান্তর। বর্তমানে আগ্নেয়গিরিটি সুপ্ত হলেও মাঝে মাঝে জেগে ওঠে আর তখনই হয় ভূমিকম্প। সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে বের হতে থাকে বালি, বাষ্প, গরমজল। বাবা ভৈরবের পূজা শুরু হয় দুর্গাপূজার দশমীর দিন। উৎসব চলে বিজয়ার পর চার দিন। প্রথম দিন প্রধানত রাজবংশ ও হিন্দু প্রজাদের পূজা। শিলদার রানি কিশোরমণি এই বিগ্রহের সেবার ভার নেন ১২০৮ বঙ্গাব্দে। তখন থেকেই শিলদার রাজবংশ ও হিন্দু প্রজাদের পূজার পর দ্বিতীয় দিন থেকে চতুর্থ দিন পর্যন্ত আদিবাসী ও অন্যান্য উপজাতির লোকেরা এই ভৈরবের থানে আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। তিন দিনের উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশাল এলাকা জুড়ে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি রাতে লক্ষ লক্ষ লোকের সমাগমে মেলা প্রাঙ্গণ গমগম করতে থাকে। এই মেলা পাটা বিঁধা বা পাতা বিঁধা নামেও পরিচিত। এই মেলার উৎপত্তির ইতিহাসের পশ্চাতে রয়েছে এক কিংবদন্তি। শিলদার এক পরাক্রমশালী রাজা ছিলেন হুদুড়দুর্গা। যদুবংশীয় এই রাজা কেবল পরাক্রান্তই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সুবিচারক ও প্রজাবৎসল। প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন প্রবল জনপ্রিয়। তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত ছিলেন পাশাপাশি রাজ্যের রাজারা। তারা তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেন এবং যুদ্ধে হুদড়দুর্গা নিহত হন। এরপর প্রজাদের ওপর এত নির্মমভাবে অত্যাচার শুরু হয় যে যদুবংশীয়রা এলাকা ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। একটি অদ্ভুত বিষয় হল যে, আক্রমণকারীরা মহিলাদের ওপর আক্রমণ করত না। সেই কারণে বহু পুরুষ নারীদের পোশাক পরে আত্মরক্ষা করতেন। ধীরে ধীরে আক্রমণ স্তিমিত হয়ে যায়। আদিবাসী সমাজও আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করে নিজেদের অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য। তাই অনুষ্ঠানের নামে আদিবাসী মানুষজন মিলতে শুরু করেন। বাবা ভৈরবের সামনে নারীর পোশাকে বিভিন্ন নাচ যেমন পাতা নাচ, ভুয়াং নাচ ও ছো নাচ হতে থাকে যেগুলি আসলে রণনৃত্যেরই এক একটি অঙ্গ। এইসব রণনৃত্যের মাধ্যমে আদিবাসীরা চেষ্টা করেন উচ্চবর্ণের অত্যাচারের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করতে। ঝাড়গ্রামে রাত্রিবাস করে শিলদা দেখে নেওয়া সুবিধার হবে। রাত্রিবাসের ঠিকানা : রাজবাড়ি টুরিস্ট লজ, চলভাষ : ৯৭৩২১০০৯৩০ এবং অরণ্যসুন্দরী গেস্ট হাউস, চলভাষ : ৯৫৪৭৬৬৮৯৬৬।

কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।

পায়ে পায়ে বাংলা


```