
শেষ আপডেট: 23 October 2020 04:59
এ গ্রামের গুণপনার শেষ নেই। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল পঁচেটগড়। শত বছর আগে এখানে হাইস্কুল, কৃষি সমবায় সমিতি, থিয়েটারের জন্য রঙ্গমঞ্চ তৈরি হয়েছিল। গ্রামে গড়ে উঠেছিল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিক্ষা ও চর্চার পীঠস্থান। এছাড়া, স্থাপিত হয়েছিল সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্য শিক্ষার চতুষ্পাঠী। এসব কিন্তু হঠাৎ করে হয়নি। যাঁদের অবদানে এসব গড়ে উঠেছিল তাঁরা চৌধুরী দাস মহাপাত্র পরিবার। এই পরিবারের আদিপুরুষ কালামুরারী ওড়িশার গঞ্জাম জেলা থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন।
গ্রামের কেন্দ্রে সুপ্রাচীন বিশাল অট্টালিকা, যা লোকমুখে হয়েছে রাজবাড়ি। পরিখা ঘেরা চৌধুরীদের ভদ্রাসনের বিরাট এলাকার নাম পঁচেটগড়। এই গ্রামটির চারদিকে রয়েছে চারটি পাড়া। এই চারটি পাড়াতে সবরকমের পেশার মানুষজন যেমন ব্রাহ্মণ, কামার, কুমোর, তাঁতি, চর্মকারদের এনে বসানো হয়। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে তৎকালীন সময়ে জাতিভেদের প্রাবল্য ছিল না। সবাই মিলে গড়ে তোলেন স্বনির্ভর গ্রাম। অতিথিপরায়ণ রাজপরিবারের শিক্ষা ও সঙ্গীতের অনুরাগে মুগ্ধ হয়ে ইংরেজরা তাদের চৌধুরী উপাধি দেয়।
এবার একটু পঁচেটগড়ের দিকে উঁকি দেওয়া যাক। রাজবাড়ি ঘিরে বিভিন্ন দেবদেবীর মন্দির। ভোরবেলা গ্রাম জেগে ওঠে মন্দিরে মন্দিরে মঙ্গলারতির শঙ্খরবে। দেবতাদের সন্ধ্যারতির সময় গৃহবধূরা নিজ নিজ গৃহে তুলসীমঞ্চে প্রদীপ জ্বেলে দেন। রাজবাড়ির কুলদেবতা কখন যেন অজান্তে গ্রামের দেবতা হয়ে ওঠেন। দক্ষিণ ভারতীয় স্থাপত্যে নির্মিত পঞ্চ শিবের দেবালয়।
রাজবাড়ি নির্মাণের সময় নাকি শাবলের কোপ মাটির তলায় পাথরের ওপর পড়ে। বারংবার আঘাতের ফলে কালো কষ্টিপাথরের কিছু অংশ ভেঙে যায়। মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে বেরিয়ে আসে বিশাল শিবলিঙ্গ। এই শিবলিঙ্গকে কেন্দ্র করে পরে চার কোণে পশুপতি, নীলকণ্ঠ, চন্দ্রশেখর ও গঙ্গাধর নামে আরও চারটি শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়। পাঁচটি শিবলিঙ্গ অর্থাৎ পঞ্চেশ্বর লোকমুখে আজ পঁচেট হয়েছে। পঞ্চেশ্বর শিবমন্দিরের অবস্থান একটু উঁচুতে। টেরাকোটা শিল্পের অনুসরণে তৈরি চার কোণে চারটি গম্বুজের মতো শিখর দেউল। মূল মন্দির এক প্রকোষ্ঠবিশিষ্ট। প্রায় দশটি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। নিচু হয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়, যেহেতু মন্দিরে মাথা নিচু করে দেবদর্শন করাই নিয়ম। মন্দির চত্বরে রয়েছে পাথরের বিষ্ণুমূর্তি যেটি স্থানীয় পুকুর খননের সময় পাওয়া যায়।
রাজবাড়ির মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে, ডান দিকে টানা বারান্দা আর বাঁ দিকে কর্মচারীদের ঘর। বারান্দা পেরিয়ে হলঘর। হলঘরটিতে রয়েছে বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র। ওপরে আছে রাজাদের ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রের সম্ভার। রাসের সময় ছাড়া অস্ত্রশস্ত্র দেখার অনুমতি নেই। বিভিন্ন বিষয়ের বই ও পাঠ্যপুস্তক নিয়ে একটি পাঠাগারও রয়েছে।
রাজবাড়ির প্রাঙ্গণ পেরোলেই এক বিশাল চত্বরের বাম কোণে কিশোররায় জীউয়ের পুবমুখী জগমোহনযুক্ত শিখর দেউল। তার ডান দিকে ঝুলনমঞ্চ। এই পরিবার আদিতে ছিল শৈবধর্মে দীক্ষিত। চৈতন্যদেবের শ্রীক্ষেত্রে যাত্রাকালে এইসব অঞ্চলগুলি প্রেমধর্মের বন্যায় ভেসে যায়। সেই প্রভাবের ধারা ধরেই পরবর্তীকালে বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করে পরিবারটি। রাজবাড়ির মধ্যে নির্মিত হয় কুলদেবতা কিশোররায় জীউয়ের মন্দির। সেই থেকে শুরু হয় ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’। তার মধ্যে কৃষ্ণলীলা বিষয়ক উৎসবগুলিই জনপ্রিয়তা পেয়েছে বেশি।
এইসব উৎসবের মধ্যে রাধাকৃষ্ণের রাসলীলা উপলক্ষে উৎসব ও মেলা পঁচেটগড়ের প্রধান অনুষ্ঠান। কিশোররায় জীউয়ের মন্দিরে ওড়িশার রথ দেউলের শৈলীর ছাপ রয়েছে। মন্দিরের ভেতর অবস্থান করছেন চার জোড়া রাধাকৃষ্ণের সঙ্গে দুটি গোপাল মূর্তি। সামনে থালায় বেশ কিছু শালগ্রাম শিলাও রয়েছে। মন্দিরের সামনে তুলসীমঞ্চ। ঝুলনমঞ্চে নন্দোৎসব বসে জন্মাষ্টমীর পরের দিন। ঝুলনমঞ্চটিতে স্টাকো অলংকরণে অলংকৃত মুসলিম স্থাপত্যের ছাপ রয়েছে।
নন্দোৎসবটি বেশ মজাদার। গোয়ালার ঘর থেকে গোয়ালিনী প্রথামাফিক পালকি করে আসেন। রাজবাড়ির দেওয়া নতুন শাড়ি, কাপড়, গয়নায় নন্দরানী বেশে গোপাল ঠাকুরকে কোলে তুলে ননী খাওয়ান। নানাবিধ মিষ্টান্ন, ফলমূল পিঠে-পুলি দিয়ে ঠাকুরকে ভোগ নিবেদন করা হয়। সঙ্গে চলতে থাকে নামসংকীর্তন। সেই ধ্বনিতে পঁচেটগড় অনুরণিত হতে থাকে।
রাজবাড়ির সামনের বিশাল মাঠের কেন্দ্রে দোতলা সমান রাসমঞ্চ। কথিত আছে, প্রায় ৫০০ বছর ধরে প্রতিবছর কার্তিক মাসে রাস পূর্ণিমায় রাসযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। পঁচেটগড়ের রাজপরিবার কর্তৃক প্রবর্তিত রাস উৎসব জেলার সবচেয়ে প্রাচীন রাস উৎসব।
রাসের সময় রাসমঞ্চ সেজে ওঠে শোলার ফুল, পাখি, ঝালর-ঝরনায়। মঞ্চ সাজান গ্রামীণ শিল্পীরা। রাস-গাছ অর্থাৎ একটি কদমগাছকে শোলার ফুলে সাজিয়ে স্থাপন করা হয় মঞ্চের কেন্দ্রে। গাছের তলায় থাকে সুসজ্জিত সিংহাসন। মূল মন্দির থেকে কৃষ্ণ নটবর সাজে শ্রীরাধিকাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে থাকেন রাসমঞ্চ অভিমুখে, সঙ্গে চলে বর্ণময় শোভাযাত্রা। সারি সারি দেববিগ্রহের সামনে পিছনে চলে বাণ-নিশান, আসা-সোটা, পাখা-চামর, চক্র-ছত্র বাহকের দল। সমানতালে বাজতে থাকে ঢাক-ঢোল, খোল-করতাল, শিঙা-সানাই। এ এক অপূর্ব শোভাযাত্রা। সঙ্গে চলতে থাকেন পুণ্য লোভাতুর ভক্তের দল। নটবর সাজ, রাজবেশ, বনমালী, মোহন ও পুস্পসজ্জা এই পাঁচরকম ভাবে লীলাময় কৃষ্ণ সেজে ওঠেন পাঁচ সন্ধ্যায়।
রাসমঞ্চ ঘিরে জমে ওঠে মেলা। কয়েকশো বছরের প্রাচীন মেলা এ অঞ্চলের জনজীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। বহুদূর থেকে লোকজন এই মেলায় আসেন।
মাঠের কিনারে বহু প্রাচীন শীতলা মায়ের মন্দির। মন্দির অভ্যন্তরে রয়েছে গণেশ, শীতলা ও চণ্ডী দেবীর পিতলের কলসমূর্তি। এটি পুবমুখী পঞ্চরত্ন মন্দির।
রাজা, রাজবাড়ি, গড় ইত্যাদি শব্দগুলো আস্তে আস্তে আমাদের জীবন থেকে মুছে গেলেও এখনও বোধহয় পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। একটু রাজকীয় মহিমা উপলব্ধি করতে হলে যাওয়াই যায় পঁচেট মোড়, এগরা থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে। বাস, ট্রেকার, ভ্যান-রিকশা সবই পাওয়া যায়। হাওড়া থেকে বাজকুল-ভগবানপুর-মংলামোড়ো হয়ে বাসে সরাসরি পঁচেট মোড় যাওয়া যায়। মোড় থেকে ৩ কিলোমিটার রাস্তা মোরাম বিছানো। বড় রমণীয় সে যাত্রা। তারপর ছোট একটা বাজার। বাজার টপকালেই শীতলা মায়ের মন্দির ও রাসমঞ্চ বুকে নিয়ে বিরাট মাঠ। মাঠ পেরিয়েই গড়ের রাজবাড়ি। ইচ্ছে থাকলেও থাকার কোনও উপায় নেই। কাঁথিতে থেকে ঘুরে নেওয়াই বাঞ্ছনীয় হবে।
কাঁথিতে রাত্রিবাসের ঠিকানা : তিলোত্তমা হোটেল ও লজ, আপনজন লজ, হিন্দুস্থান হোটেল প্রভৃতি।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।