
শেষ আপডেট: 10 March 2024 00:18
সঞ্চিতা চট্টোপাধ্যায়
ভাত আজ অনেক বাঙালির পাতেই ব্রাত্য। অথচ মায়ের দুধ ছেড়ে অন্নপ্রাশনের সময় এই ভাতের স্বাদই প্রথম পায় শিশুরা। প্রথম শক্ত খাবার খাওয়ার সূচনা হয় ভাত দিয়েই। কিন্তু দেখুন, এখনকার সময়ে ভাতকেই ব্রাত্য করে দিচ্ছেন লোকজন। ডায়েটের চক্করে দামি খাবারেই বেশি ভরসা করছেন।
ভারতীয় আয়ুর্বেদে ভাতকে কিন্তু স্বাস্থ্য, সম্পদ এবং ধনশীলতার প্রতীক হিসেবে মানা হয়েছে। তাই আমাদের পুজোপার্বনে, অন্নপ্রাশনে, বিয়েতে প্রতিটি লোকাচারে চালের ব্যবহার অপরিহার্য। এখন আমরা প্রায়ই শুনে থাকি, ভাতে কার্বোহাইড্রেট আছে, তাই ভাত এড়িয়ে চলা উচিত। কিন্তু এটাও ভেবে দেখা দরকার এইসব কথার কতখানি সার্থকতা আছে। কোন খাবারেই শুধু কার্বোহাইড্রেট বা শুধু প্রোটিন অথবা শুধুমাত্র ফ্যাট থাকে না। ভাতেও তাই। একথা ভুললে চলবে না, ভাতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ও মিনারেল (খনিজ উপাদান) আছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে। পাশাপাশি, অনেক ফাইটো নিউট্রিয়েন্টও আছে ভাতে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে ভাত কতটা উপকারি।
কার্বোহাইড্রেট নিয়ে যে ভ্রান্ত ধারণা আছে সেটা ভাঙা দরকার। কার্বোহাইড্রেট কিন্তু মানুষের শরীরের পুষ্টির জন্য অপরিহার্য। অর্থাৎ নন নেগোসিয়েবল। ভাত খেলে শরীর অনেক ঠান্ডা থাকে, ক্লান্তিভাব কমে যায়।
এখন প্রায়ই শুনবেন, ব্রাউন রাইস খান সাদা ভাত ভাল নয়। কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে আমরা ঢেঁকি ছাটা চাল অথবা সিঙ্গল পলিশ চাল যা সাদা রঙের ভাত খেতেই অভ্যস্ত। বাদামি রঙের নয়। এই সিঙ্গেল পলিশ চালে ফাইবারের পরিমাণ সঠিক থাকে, বেশি নয়। ব্রাউন রাইসে ফাইবারের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। আর এটা তো ঠিক কথা সব কিছু বেশি মানেই সেটা ভাল নাও হতে পারে। বেশি বেশি ফাইবারযুক্ত ভাত সঙ্গে সব্জি মিশিয়ে খেলে ভাত ও সব্জির ফাইবার বেশিমাত্রায় শরীরে ঢুকে খনিজ শোষণে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ফলে হজমে সমস্যা হবে। তাই সাদা ভাতই ভাল। এটি নন অ্যালার্জেন গ্লুটেন ফ্রি, বাঙালির কমফোর্ট ফুড একেবারেই।
চালের এসেন্সিয়াল অ্যামাইনো অ্যাসিড এমন যে ডালের সাথে মিশিয়ে খেলে সেটি মাছ মাংসের সমতুল্য প্রোটিন আপনাকে দিতে পারে। এর এল লাইসিন বডি বিল্ডিং-এ সাহায্য করে। রাতে যে গ্রোথ হরমোন পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে বেরিয়ে আপনার শরীরের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ মেরামতি ও বৃদ্ধির কাজকর্মে সাহায্য করে, চালের লাইসিন তার অগ্রদূত হিসাবে কাজ করে। তাই ভাত খেলে অনেক বেশি সতেজ ও সজীব থাকা যায়।
অনেকেই বলে রাতে ভাত খেতে না, ওজন বাড়বে। ডায়াবেটিসের রোগীদের রাতে ভাত খেতে বারণ করা হয়। এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। রাতে ভাত খাওয়ার উপকারিতা অনেক। ভাতের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স অনেক বেশি, তাই ডায়াবেটিকরা ভাত খেতে পারবেন না এটা একেবারেই ঠিক নয়। বরং বাঙালির পঞ্চব্যাঞ্জন যেমন ভাতের সঙ্গে ঘি, ডাল, তরকারি, শুক্তো, মাছ, মাংস ইত্যাদি খেলে প্রতিটা খাবারই সিঙ্গল পলিশ চালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের মাত্রা ঠিক রাখে, তাই ভাত খেলে কোনও ক্ষতি হয় না। ডায়াবেটিক রোগীদের কাছে ভাত সুরক্ষিত খাবার। তাই ভাত খেলে ডায়াবেটিস হবে বা ভাতের জন্য সুগার বেড়ে যাবে এটা একেবারেই সঠিক কথা নয়।
ভাতের আরও অনেক গুণ আছে। জেনে রাখুন, ভাত প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আর প্রোবায়োটিক শরীরের জন্য ভীষণ জরুরি। ভাত খুব সহজপাচ্য। তাই শিশুর প্রথম খাদ্যই হল ভাত। ভাত চুল ভাল রাখে, ত্বকের স্বাস্থ্য ভাল রাখে, বলিরেখা পড়তে দেয় না। ভাত কিন্তু ফ্যাট বার্নার হিসেবেও কাজ করে। ভাত খেলে মন ভাল থাকে। অ্যাংজাইটি বা খিটখিটে ভাব কমে। কথায় বলে মাছে-ভাতে বাঙালি। তাই নিশ্চিন্তে ভাত খান। গরম ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাতের কোনও বিকল্প নেই। তবে মনে রাখবেন, সিঙ্গল পলিশ হোয়াইট রাইসই শরীরের জন্য ভাল। নামী দামি কোম্পানির প্যাকেটজাত রাইস নয়। ভাতই অন্যতম পুষ্টিকর খাদ্য, বরং বলা ভাল ভাতই আপনার শরীর ভাল রাখবে, তাই ভাতকে ব্রাত্য করে দেওয়ার কোনও মানেই হয় না।
(লেখিকা কলকাতার বিসি রায় হাসপাতালের প্রাক্তন পুষ্টিবিদ, মতামত তাঁর নিজস্ব)