আমাদের দাঁতে তেমন সমস্যা না হলে আমরা দাঁতের ডাক্তারের কাছে যাই না। সহজ কথায়, দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝি না। কিন্তু সামান্য সমস্যাতেই সেই মর্ম রীতিমতো দর্দে পরিণত হয়। পেন কিলার ফেল করলে খোঁজ পড়ে ডেন্টিস্টের। অথত সমস্যা এড়িয়ে দাঁত ভাল রাখা যায় কী ভাবে, সে পরামর্শ নেওয়ার ধার ধারি না। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, একটু যত্ন নিলেই অনেক সমস্যা এড়িয়ে চলা যায়।
ডেনটিস্ট সৌমিত্র ঘোষ ও কুশল চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা বললাম আমরা। দাঁতের যত্ন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ডাক্তারবাবুরা বললেন, কিছু জিনিস আমাদের মনে রাখা উচিত রোজকার জীবনে।
দ্য ওয়াল- দাঁত এবং মুখের সার্বিক স্বাস্থ্য ভাল রাখতে কী কী করা উচিত সাধারণ ভাবে?
ডঃ চক্রবর্তী- ভাল করে মুখ পরিষ্কার রাখা। দিনে দু'বার দাঁত মাজা, এক বার অন্তত ফ্লসিং, যতবার খাবে খাওয়ার পরে প্রতি বার মুখ ধোয়া। মুখের ভিতরে জিভ, দাঁত, মাড়ি সব কিছুকে সুস্থ সুন্দর রাখতে অন্তত এটুকু প্রয়োজন।
দ্য ওয়াল- দু'বার দাঁত না মাজলে কী কী ক্ষতি?
ডঃ ঘোষ- দু'বার করে না মাজলে দাঁত এবং মাড়ির সংযোগস্থলে প্রথমে খাবার জমতে থাকে। তা থেকে যা তৈরি হয়, তাকে ডাক্তারি পরিভাষায় 'প্লাক' বলা হয়। তার পরে তা ক্রমশ শক্ত হয়ে, ক্যালসিফায়েড হয়ে 'ক্যালকুলাস' তৈরি হয়। অর্থাৎ পাথর জমতে থাকে। মাড়ি হাল্কা হতে হতে হাড় ক্ষয়ে যায়। সার্বিক ভাবে দেখতেও খারাপ লাগে। এই সব কিছু আপনি নিজে বোধ করছেন। কিন্তু যখন পাশের লোকটিও আপনার এই মুখ এবং দাঁতের সমস্যা থেকে পরোক্ষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তখন বুঝতে হবে ধীরে ধীরে আপনার হ্যালিটোসিস হচ্ছে।
দ্য ওয়াল- কী এই হ্যালিটোসিস?
ডঃ ঘোষ- মুখ অপরিষ্কার রাখলে মুখে খাবার জমছে, দাঁত মাড়ি আলগা হচ্ছে আপনি তাতেও বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন না।তার পরে হয় হ্যালিটোসিস। মুখ থেকে দুর্গন্ধ বেরোয়। এই হ্যালিটোসিস যেমন মুখ অপরিষ্কার রাখলে হয়, তেমনই আপনার লিভার বা লাংসের সমস্যা থাকলে বা সর্দি-কাশি থাকলেও হতে পারে। তবে তার স্থায়িত্ব কম থাকে। নিয়মিত মুখ পরিষ্কার না করলে হ্যালিটোসিস চরম আকার নিতে পারে। হ্যালিটোসিসের নির্দিষ্ট কোনও বয়স নেই। শিশুদেরও হতে পারে, তাই ছোট থেকেই কিছু খাওয়ানোর পরে মুখ ধুয়ে দিতে হয় নইলে দাঁতে পেলিক্যাল তৈরি হতে পারে। আমরা দাঁত ব্রাশ করার কিছু ক্ষণ পর থেকেই দাঁতে তৈরি হয় এক ধরনের আস্তরণ। তাই শিশুদেরও সব সময়ে মুখ ধুয়ে দেওয়া উচিত। দিনের বড় খাওয়াগুলির পর ব্রাশ করতে হবে। চিটচিটে হলে সমস্যা বাড়ায় ব্যাকটিরিয়া। সেখান থেকেই প্লাক তৈরি হয়। ফ্লসিংও জরুরি, নইলে দু'টি দাঁতের মাঝে আটকে যেতে পারে খাবার। তাই যে কোনও কিছু খেলেই কুলকুচি করে মুখ ধোয়া এবং বড় খাবার খেলে অবশ্যই ব্রাশ করা জরুরি। এছাড়া সারা বছরে এক বার অন্তত ডেনটিস্টের কাছে যেতে হবে দাঁত দেখিয়ে নিতে।
দ্য ওয়াল- নিয়মিত খাদ্যাভ্যাস কতটা প্রভাবিত করে দাঁত ও মুখের স্বাস্থ্যকে?
ডঃ চক্রবর্তী- জাঙ্কফুড বা রিফাইনড কার্বোহাইড্রেট ব্যাকটিরিয়ার খুব ভাল খাদ্য। তাই এ সব খেলে সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা বাড়বে। বাড়ির খাবার এই সমস্যা তৈরি করে কম। চিপস বা বার্গার জাতীয় খাবারের কুপ্রভাব আমরা স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে শুনেই থাকি। কিন্তু এগুলো যে সমান ভাবে আমাদের দাঁত ও মুখেরও ক্ষতি করে, আমরা অনেকেই জানি না। এই জাতীয় ফাস্টফুডে যে উপকরণ থাকে, চিজ বা মেয়োনিজ, সেগুলো খাওয়ার পরে আমরা মুখ কুলকুচি করে ধুইও না অনেক সময়। ফলে সেই স্টিকি ফুডগুলো সমস্যা আরও বাড়ায়।মুখের ভিতরে তৈরি হয় জীবাণু। আগেকার দিনে শাকসব্জি বেশি খাওয়া হতো। ফলে ব্যাকটিরিয়া তৈরি হতো না সে ভাবে। তাই দাঁতের সুরক্ষায় জাঙ্ক ফুড নৈব নৈব চ। বরং বেশি করে খাওয়া হোক বাড়িতে রান্না করা ফাইবার জাতীয় জিনিস, শাক, সবজি, ডাঁটা এই সব। এগুলি খেতে সময়সাপেক্ষ হলেও দাঁত ভাল থাকে। রাস্তায় চলার পথে চাইলে আপনি ফলও খেতেই পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও সাবধানী হন। পেয়ারা জাতীয় ফল খেলে তার বীজ আপনার দাঁতের ফাঁকে আটকে যেতে পারে এবং সমস্যা বাড়তে পারে। ফল খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে না হলেও অন্তত কিছু ক্ষণ পরে মুখ কুলকুচি করে ধুয়ে নিন। বাড়ি ফিরে অবশ্যই ব্রাশ করে নিন।
দ্য ওয়াল- যাঁরা নেশা করেন, দাঁতের সমস্যা কী কী হতে পারে?
ডঃ ঘোষ- যে কোনও নেশাই ক্ষতিকর। মারণরোগ ক্যানসারও হতে পারে তাতে। তবে অ্যালকোহল সে ভাবে দাঁতের সরাসরি ক্ষতি করে না। ধূমপান বা গুটখা জাতীয় খাবার হলে দাঁতে ছোপ তৈরি করে। সঙ্গে মুখের ভিতরের টেম্পারেচারেরও পরিবর্তন হয়। ছোপগুলো বাড়তে থাকলে তা থেকেই টার্টার অর্থাৎ দাঁতে পাথর তৈরি হয়। তাই কোনও নেশাই দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য ঠিক নয়।
দ্য ওয়াল- ক্যাভিটি কী?
ডঃ চক্রবর্তী- দাঁত না মাজলে ক্ষয় হয়। তা থেকেই তৈরি হয় 'কেরিস', যা বেড়ে দাঁড়ায় 'ক্যাভিটি'-তে। অনেকেই একে দাঁতে পোকা বলে থাকেন। এ ক্ষেত্রেও একই কথা, অর্থাৎ দাঁত পরিষ্কার না রাখলে খাবার জমে গিয়ে দাঁতে পোকা বা সমস্যা শুরু হয়। এতে দাঁত ব্যথা থেকে শুরু করে মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া বা হ্যালিটোসিস সবই হতে পারে। তাই ব্যাকটিরিয়াকে কোনও ভাবেই বাড়তে দেওয়া যাবে না। ব্যাকটিরিয়া বাড়লে অ্যাসিড তৈরি হয়, দাঁতের এনামেল ক্ষয় হতে থাকে। তা থেকেই কেরি এবং তা বাড়তে বাড়তেই ক্যাভিটি। দাঁতের এনামেল আসলে একটা বর্মর মত কাজ করে। তাই অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকলে বা ভুলভাল খাওয়ার পরে মুখ না ধুলে, ওই বর্ম ভাঙতে থাকে ব্যাকটিরিয়ার জন্য। তাতেই দাঁতের ক্ষয় শুরু হয়।
দ্য ওয়াল- ক্যাভিটি থেকে মুক্তির উপায় কী দাঁত তুলে ফেলা না রুট ক্যানাল?
ডঃ চক্রবর্তী- কোনওটাই লাগে না, নিয়মিত পরীক্ষা করালে। ব্যথা নেই অথচ দাঁতে ফুটো বা কেরি আছে , খাবার ঢুকলে কাঠি দিয়ে খোঁচাচ্ছেন-- এই অবস্থাও বেশি দিন রাখা ঠিক নয়। করিয়ে নিন রুট ক্যানাল। বেশি দিন ফেলে রাখলে কিন্তু সমস্যা বাড়ে। শুরুতে করে নিলে আপনি শুধুমাত্র দাঁতে ফিলিং করাবেন, আর সময় বয়ে গেলে রুট ক্যানাল বা পরবর্তীতে দাঁত তুলে ফেলতেও হতে পারে।
দ্য ওয়াল- সেন্সিটিভিটি কেন হয়? আমরা দাঁতে শিরশিরানি বোধ করি। কেন? কী করা যায়?
ডঃ ঘোষ- দাঁত বা মাড়ি দু'ক্ষেত্রেই এই সেন্সিটিভিটি কাজ করে। দাঁত যদি ভেঙে যায় কিংবা ক্যাভিটি তৈরি হয়, বা ইনফেকশনের কারণে মাড়ি যদি নীচের দিকে নেমে যায় অথবা সাপোর্টিং হাড় নীচে যায়, তা হলে শিরশিরানি হতে পারে।আবার যারা জোরে জোরে ঘষে দাঁত মাজেন, তাদেরও দাঁতের এনামেল ক্ষয়ে গিয়ে সেন্সিটিভিটি হতে পারে। তা হলে এই কারণগুলো আগে বন্ধ করতে হবে। তা হলেই আর দরকার নেই বাজারচলতি পেস্টগুলোর। শিরশিরানির হাত থেকেও বাঁচা যায়।
দ্য ওয়াল- স্কেলিং বা প্রতি বছর দাঁত পরিষ্কার করা কতটা জরুরি? শিশুদেরও কি স্কেলিং করাতে হবে? হলে কত বছর থেকে?
ডঃ ঘোষ- ৬ মাসে এক বার না পারলেও বছরে অন্তত এক বার হলে ভালো হয়। জিঞ্জিভাইটিস বা মাড়ির ইনফেকশন হয় বেশির ভাগ বাচ্চার। সে ক্ষেত্রে দুধের দাঁত পড়ে নতুন দাঁত ওঠার পর থেকেই ৬ মাসে এক বার বা বছরে এক বার করা যেতে পারে এই স্কেলিং।
দ্য ওয়াল- দাঁতে ছোপ হয় কেন ?
ডঃ ঘোষ- বাহ্যিক এবং অভ্যন্তরীণ দু'রকম কারণে হতে পারে এই ছোপ। বাইরের কারণ হতে পারে জল, হাওয়া, ধূমপান বা খাবার। ভিতরের অনেক কারণ থাকতে পারে ।লাংস থেকে লিভার যে কোনও কিছুই হতে পারে এ ক্ষেত্রে। অর্থাৎ আপনার লাংস বা লিভার যখনই কোনও সমস্যায় আছে, আপনার দাঁতে সেই ছাপ পড়তেই পারে। বাহ্যিক কারণ জল হাওয়া বা খাবার হলে সে দাগ সহজেই তুলে ফেলা যায় স্কেলিং এবং পলিশিং-এর মাধ্যমে। অভ্যন্তরীণ কারণে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধও দায়ী হয়।ছোট বেলায় কোনও ওষুধ খেলে তার সাইড এফেক্ট হয়তো এখন হল। এই অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো হলে এনামেল খারাপ হয়ে যায়। প্রথমে ব্লিচিং এবং পরে ভিনিয়ারিং অর্থাৎ দাঁতের উপরের ওই ছোপগুলো ঘষে তুলে সেরামিক সেট করা হয়। আগে ভিনিয়ারিং-এর ক্ষেত্রে ছোপ ধরা দাঁতটা কেটে ফেলে তাতে একটা ক্রাউন পরানো হত।এখন চিকিৎসা ব্যহস্থা অনেকটাই উন্নত হয়ে গেছে।
দ্য ওয়াল- লিভার কতটা যুক্ত দাঁতের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে? কারণ অনেকেই বলেন, লিভার ঠিক না থাকলে দাঁত খারাপ হয়ে যায়!
ডঃ ঘোষ- লোকাল এবং সিস্টেম্যাটিক-- দু'রকম ভাবে ক্ষতি হয় দাঁতের। লোকালে খাবার থেকে নেশার জিনিস বা জল এগুলো প্রভাব ফেললেও সিস্টেম্যাটিক কজে লিভার থেকে লাংস এগুলো ক্ষতি করে। এর বাইরে আলাদা করে কোনও প্রভাব লিভার দাঁতে ফেলে না।
দ্য ওয়াল- পাইরিয়া কী? কেন হয়? মাড়ি থেকে রক্ত বেরোয় কেন?
ডঃচক্রবর্তী- মাড়ির ইনফেকশন জিঞ্জিভাইটিস শিশুদের হয় আর বড়দের হয় পাইরিয়া। এটা খুব চলতি কথা। মূলত মুখে ব্যকটিরিয়া তৈরি হলেই মাড়িতে ইনফেকশন হয়। তাই সেটা হতে দেওয়া যাবে না। ক্যালসিয়ামের অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই দাঁত ভাঙতে থাকে, মাড়িতে তার প্রভাব পড়ে।তাই শিশু বয়স থেকে তো বটেই সঙ্গে মেনোপজ স্টেজে গেলেও রোজকার ফুডে রাখতেই হবে দুধ। এছাড়া সমস্যা বাড়লে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে ক্যলসিয়ামের ওষুধ খেতে হবে। তবে ক্যালসিয়ামকে বাগে রাখতে ২৪ ঘণ্টায় এক বার দুধ খাওয়া জরুরি।
দ্য ওয়াল- মাউথওয়াশ কতটা উপকারি? কতটাই বা প্রয়োজন?
ডঃ ঘোষ- মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে মাউথওয়াশ অনেকেই ব্যবহর করেন। তবে সেগুলো প্রেসক্রাইব না করা হলে কখনওই নিজে থেকে ব্যবহার করা উচিত নয়।কারণ এগুলো আসলে রাসায়নিকই। আর বাজার চলতি মাউথওয়াশগুলো আসলে মাউথ রিফ্রেশনার। ক্লোরহেক্সিডিন জাতীয় মাউথওয়াশই ডাক্তাররা প্রেসক্রাইব করেন। সেটাও রাসায়নিক, তাই তার সাইড এফেক্ট থাকে। এটা রেগুলার ব্যবহার করাও ঠিক নয়।
দ্য ওয়াল- নুনতেল বা গরমজলে নুন দিয়ে কুলকুচি করা কতটা ঠিক?
ডঃ ঘোষ- গরম নুন জল খুব কাজে দেয়। ওটা অ্যান্টি ব্যাকটিরিয়াল লিকুইড। তাই মুখের ভেতরে ব্যাকটিরিয়া তৈরি হতে দেয় না। কাজেই এটা রোজ এক-দু'বার করলে উপকার অবশ্যই পাবেন। কিন্তু তেল নুন ঘষলে নুন দাঁতের এনামেল নষ্ট করে দিতে পারে। তাই সেটা খুব একটা ঠিক নয় দাঁতের স্বাস্থ্যের জন্য।
দ্য ওয়াল- দাঁত বাধানোর পরে হাড় বা মাছের কাঁটা চিবিয়ে খাওয়া যায় কি?
ডঃ চক্রবর্তী- এখন অনেক ক্ষেত্রে দাঁত ইমপ্ল্যান্ট করতে হয়। আগে এতটা আধুনিক ছিল না ব্যবস্থা। এখন হাড় ভাল থাকলে ইমপ্ল্যান্ট করাই যায়। তবে ইমপ্ল্যান্ট করা দাঁত হোক বা স্বাভাবিক দাঁত, সবেতেই এ জাতীয় খাবার অর্থাৎ হাড় বা কাঁটা না চিবিয়ে খাওয়াই ভালো। তাতে দাঁত সুস্থ থাকে।
অর্থাৎ মুখ এবং দাঁতের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে রোজ মেনে চলুন কিছু নিয়ম। আর ডাক্তার চক্রবর্তী এবং ডাক্তার ঘোষ কী বলছেন রুট ক্যানাল নিয়ে, শুনে নিন তাঁদের মুখ থেকেই।
আরও ঝকঝকে হোক আপনার হাসি।
https://www.youtube.com/watch?v=yN2SBotDfSc
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়।