সঞ্জীব আচার্য
কর্ণধার সিরাম অ্যানালিসিস

করোনা ঠেকাতে ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন কতটা কার্যকরী সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কিছু ক্ষেত্রে এই ওষুধের সুফল দেখা গেছে ঠিকই, তবে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের নিজস্ব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো চিন্তার বিষয়। শুরুর দিকে মার্কিন গবেষকরা এই ওষুধকে ‘গেম চেঞ্জার’ বলে দাগিয়ে দিলেও, এখন অনেকেই দাবি করছেন সংক্রমণ রুখতে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা দেখা যায়নি। বরং এই ওষুধের ডোজের হেরফের হলে তার পরিণতি মৃত্যুও হতে পারে।
আমজনতার মনেও এই ওষুধ নিয়ে নানা মত তৈরি হয়েছে। হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত তারাও। কেউ মনে করছেন ডাক্তারের পরামর্শ মেনে এই ওষুধ খেলে কাজ হবে ঠিকই, আবার এই ওষুধ প্রয়োগের জটিলতা ও তার নানা ক্ষতিকর দিক নিয়েও ভাবিত অনেকে।
এখন দেখে নেওয়া যাক হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন আসলে কী—
ক্লোরোকুইন ফসফেট হল ম্যালেরিয়ার প্রতিষেধক। প্লাসমোডিয়াম ভাইভাক্স, প্লাসমোডিয়াম ওভাল ও প্লাসমোডিয়াম ম্যালেরির সংক্রমণের চিকিৎসায় এই ওষুধ কাজে লাগে। এই ক্লোরোকুইনেরই হাইড্রক্সিলেটেড সল্টকে বলে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন। এর রাসায়নিক গঠন এবং কাজ অনেকটাই ম্যালেরিয়ার ওষুধ ক্লোরোকুইনের মতোই। ম্যালেরিয়া ছাড়াও অ্যামিবিয়েসিস এমনকি কিছু ক্ষেত্রে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের রোগীদের উপরেও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন প্রয়োগ করে সুফল পাওয়া গেছে। তাছাড়াও আরও কিছু রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয় যেমন, লুপাস, জোগ্রেন সিন্ড্রোম, স্ক্লেরোডার্মা, পলিমায়োসিটিস, পরফাইরা কিউটেনিয়া টারডা ইত্যাদি।
কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঠেকাতে ক্লোরোকুইন কতটা উপযোগী সে নিয়ে জোরদার গবেষণা করছেন আমেরিকা ও চিনের বিজ্ঞানীরা। ভারতে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চে (আইসিএমআর) এই ওষুধের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। একে প্রোফাইল্যাক্টিক বা রোগ প্রতিরোধে সাহায্যকারী ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আইসিএমআরের তরফে। বলা হয়েছিল, করোনা রোগীর চিকিৎসা করছেন এমন ডাক্তার, নার্স বা হোম আইসোলেশনে থাকা রোগীর সেবা করছেন এমন ব্যক্তি বা স্বাস্থ্যকর্মীদের উপরেই প্রয়োগ করা যেতে পারে এই ওষুধ। যদিও সম্প্রতি আইসিএমআর জানিয়েছে, এই ওষুধের নানাবিধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে কিছু স্বাস্থ্যকর্মীর উপরে।
হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত বিজ্ঞানীমহলও
মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) জানিয়েছে, কোভিড-১৯ সংক্রমণ যদি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে অথবা অল্পের উপর হয় তাহলে ক্লোরোকুইনের নির্দিষ্ট ডোজে সেটা কমতে পারে। গোটা শরীরে যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে তাহলে কীভাবে সেটা ক্লোরোকুইন প্রয়োগ করে রোখা যাবে সেটা এখনও জানা যায়নি। এফডিএ এমনও বলেছে, ক্লোরোকুইন ফসফেট ড্রাগের মাত্রা যদি ২ গ্রামের বেশি হয়ে যায়, তাহলে সেটা রোগীর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই করোনার সংক্রমণ কমাতে ক্লোরোকুইনের প্রয়োগ যে সবক্ষেত্রেই সাফল্য আনবে সেটা জোর গলায় বলা যাচ্ছে না।
আমেরিকার ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কয়েকজন করোনা আক্রান্ত রোগীর উপরে এই ড্রাগের প্রয়োগ করে দেখা গেছে সংক্রমণ কিছুটা হলেও কমেছে। তবে এই ড্রাগ টেস্টের রেজাল্ট কতটা পজিটিভ সেটা জানা যাবে আরও বহুবার ট্রায়ালের পরেই।
আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজ-এর অধিকর্তা অ্যান্টনি ফৌসি হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের পক্ষপাতী নন। তিনি বলেছিলেন, যতক্ষণ না কনট্রোলড ক্লিনিকাল ট্রায়াল করা যাবে, ততক্ষণ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না এই ওষুধ কতটা কার্যকরী হতে পারে করোনা রোগীদের উপরে। কারণ এই ওষুধের নিজস্ব কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। তাই ওষুধ খাওয়ানোর পরেও সংশয় থেকেই যাবে।
কী ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন খেলে
এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নির্ভর করছে রোগীর শারীরিক অবস্থার উপরে। অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে এখানে, যেমন রোগীর কোনও ক্রনিক রোগ রয়েছে কিনা, হার্টের অবস্থা কেমন, ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ রয়েছে কিনা। তাছাড়াও হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন যাঁরা খাচ্ছেন তাঁরা ঠিক কী ডোজে খাচ্ছেন, কতদিন ধরে খাওয়া হচ্ছে এই ওষুধ, ওষুধ খাওয়ার আগে স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো হয়েছে কিনা, রোগীর বয়স ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার উপরেও এই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নির্ভর করে।
সাধারণ যে উপসর্গগুলো দেখা যায়, তার মধ্যে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, পেটের সমস্যা, বমিভাব, পেশীর ব্যথা, অ্যালার্জি, ত্বকের র্যাশ-চুলকানি, চুল পড়ে যাওয়া।
হৃদরোগীদের একটা বড় অংশের ক্ষেত্রে এই ওষুধ ‘কার্ডিয়াক অ্যারিদমিয়া’ নামের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বেশ কিছু সমস্যা যেমন সোরিয়াসিস, পরফাইরিয়া, লিভারের অসুখ, অ্যালকোহলিজম ইত্যাদি থাকলে ওষুধের প্রতিক্রিয়ায় বড় ক্ষতি হতে পারে। অভিজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া তাই হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন একেবারেই খাওয়া উচিত নয়।
এই ওষুধ অধিক ডোজে খেলে অস্থিমজ্জায় তার প্রভাব পড়ে। শ্বেত রক্তকণিকার পরিমাণ কমতে থাকে, অনুচক্রিকা বা প্লেটলেটসও কমে যায়, ফলে রক্তাল্পতায় আক্রান্ত হতে পারেন রোগী।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রভাবে চোখের সমস্যা শুরু হয়েছে রোগীর। অনেক ডাক্তারই বলেন, এই ওষুধের ডোজের হেরফের হলে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। দৃষ্টিহীনতা এবং কালার ব্লাইন্ডনেসে আক্রান্ত হতে পারেন রোগী।
G6PD এনজাইমের ক্ষরণ কমতে পারে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের প্রভাবে। যার কারণে ক্ষতিগ্রস্থ হয় লোহিত রক্তকণিকা। রক্তাল্পতার প্রকোপও দেখা দিতে পারে।