শেষ আপডেট: 31 January 2020 02:30
রত্না ভট্টাচার্য্য শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য
বাঁকুড়া শহর থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে গঙ্গাজলঘাঁটি থানা এলাকায় অমরকানন অবস্থিত। অতীতের মাছরাঙা জঙ্গলের অমরকাননে পরিণত হওয়ার গল্প বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। প্রায় কয়েকশো বছর আগে রাজপুতানা থেকে একদল মানুষ এসে উঁচু-নিচু ডাঙাজমির জঙ্গল পরিষ্কার করে গ্রামের পত্তন করেন এবং চাষবাসে মন দেন। রাজপুতানা থেকে আগত মানুষজন ছিলেন ক্ষত্রিয় বংশজাত ও সিংহ পদবিধারী। কালে কালে এঁরা কেবল বাঙালিদের সঙ্গে মিলেমিশেই যাননি, স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঁকুড়া জেলায় এঁদের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য।
বিংশ শতকের প্রথমদিকে জমিদার হন দিবাকর সিংহের পুত্র গোবিন্দপ্রসাদ সিংহ। জমিদার হলেও তিনি অত্যাচারী ছিলেন না। বরং দুঃখী মানুষদের দুর্দশায় তিনি বিচলিত হয়ে পড়তেন। বিবেকানন্দ শিকাগো থেকে ফেরার পর দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আগামী ৫০ বছর দেশের মানুষ যেন দেশমাতাকেই তাদের আরাধ্য দেবী মনে করেন।’ গোবিন্দ সিংহ এই আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ স্থির করে ফেলেন। স্বদেশপ্রেম ও বিপ্লবী-চেতনায় উজ্জীবিত কতিপয় মানুষজনকে নিয়ে দেশ গড়ার লক্ষ্যে গড়ে তুললেন শ্রীরামকৃষ্ণ সেবাদল আশ্রম। সৎশিক্ষার মাধ্যমে ভারতের অগণিত নিপীড়িত নরনারীর মুক্তি হবে-– এই ছিল তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস। ফলে জঙ্গলের মধ্যে পাহাড়ের কোলে নির্জন স্থানে গড়ে উঠল আশ্রম, বিদ্যালয় আর বর্তমানে কলেজ। তাঁরই আহ্বানে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের দ্বারোদঘাটন করেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, ১৩৩২ সালের ২৪ আষাঢ়। আশ্রমে রামকৃষ্ণের প্রতিকৃতি স্থাপিত। আজও আশ্রমটি এলাকার শিক্ষাবিস্তারে কাজ করছে। এটি দুস্থ ছাত্রদের থাকার ঠিকানাও। তা ছাড়া কৃষিকাজ, কাঠের কাজ, সূচিশিল্প ও পঞ্চায়েতের সঙ্গে নানাবিধ গ্রামোন্নয়ন প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে চলেছে।
যেহেতু আশ্রমটি ছিল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র, সেহেতু অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এখানে পদার্পণ ঘটেছিল। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কাজী নজরুল ইসলাম, যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
গোবিন্দপ্রসাদ সিংহের পরমবন্ধু ছিলেন অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তিনিও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। তরুণ বয়সে তাঁর অকালমৃত্যু ঘটে। বন্ধুর স্মরণে গোবিন্দপ্রসাদ এ স্থানের নামকরণ করেন অমরকানন।
এই অমরকাননকে নিয়ে কাজী নজরুল একটি অবিস্মরণীয় গান লেখেন-– ‘অমর কানন মোদের অমরকানন/ বনকে বলে রে ভাই আমাদের এ তপোবন/ আমাদের এ তপোবন।’
নজরুল যে গাছের তলায় বসে এ গান লিখেছিলেন, সে গাছটি আজও বিদ্যমান। কেবল সে গাছই নয়, আরও নানাবিধ গাছগাছালি, ফুলে-ফুলে একেবারে আশ্রমিক পরিবেশ। আশ্রমের গেট খুললেই ব্যস্ত বাসরাস্তা, যানবাহন, কোলাহল। কিন্তু এখানের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। একেবারে ভাবগম্ভীর পরিবেশ। অশান্ত মন একলহমায় শান্ত হতে বাধ্য।
কোড়ো পাহাড় ও তপোবন
অমরকাননের সংলগ্ন গ্রাম হল কাপিষ্ঠা। এই গ্রামের অবস্থান কোড়ো পাহাড়ের তলায়। অমরকাননের পুবমুখী পাহাড়টি প্রকৃতির খেয়ালে কোন আদিমকালে তৈরি হয়েছে, তা বলা মুশকিল। এই পাহাড়ে উঠতে গেলে কোনও পরিশ্রম করতে হয় না। উচ্চতা প্রায় ৪০০ ফুট। শরীর এর কোয়ার্টজাইট পাথরে তৈরি। মিনিট-কুড়ি চড়াই ভাঙলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে পাহাড়ের পাদদেশে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন তপোবন উত্তমাশ্রমে। ১৩২৯ বঙ্গাব্দে শ্রীমৎ মহিমানন্দ মহারাজ এখানে একটি আশ্রম স্থাপন করেন, নাম দেন উত্তমাশ্রম। নানাবিধ ফুলগাছ ও রঙিন ফুলের শোভায় আশ্রমটি কেবল বর্ণময়ই নয়, পরিবেশটিও বেশ শান্ত। চড়াই ভাঙার পরে ক্লান্ত লাগলে আশ্রমে একটু জিরিয়ে এগিয়ে যেতে হবে কোড়ো পাহাড়ের চূড়ায়। চূড়ায় মুকুটের মত শোভা পাচ্ছে অষ্টভুজা পার্বতী মন্দির। চূড়ায় ওঠবার কোনও কষ্ট নেই, বর্তমানে সিমেন্টের সিঁড়ি তৈরি হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, এ রকম একটি অনির্বচনীয় স্থানে এমন সুন্দর আশ্রম বানাবার পরিকল্পনা, কার মাথায় এল? সেটা জানতে গেলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় ১০০ বছর আগে।
হিমালয়ের পথে চলেছেন এক সাধু। বিশ্রাম নিতে আশ্রয় নিলেন কাপিষ্ঠা গ্রামে। রাতে তিনি ধ্যানে জানতে পারলেন, এই কোড়ো পাহাড়ে অধিষ্ঠান করছেন মাতৃশক্তি ও শিবশক্তি যুগপৎভাবে। তার পর আর সাধুর খোঁজ পাওয়া যায় না। গ্রামবাসীরা এটুকু জানতে পেরেছিলেন যে, তিনি এসেছিলেন হুগলির ডুমুরদহ থেকে, নাম স্বামী বীরানন্দ। গ্রামবাসীরা লোক পাঠালেন ডুমুরদহে। ডুমুরদহের স্বামী মহিমানন্দ ও স্বামী বিজ্ঞানানন্দ এখানে এসে ঘন অরণ্যসংকুল পাহাড়ের ওপর খড়ের ছাউনি দেওয়া কুটিরে বসবাস শুরু করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই এক ঝড়ের রাতে উভয়েই পৃথকভাবে একই স্বপ্ন দেখলেন যে, মাতা পার্বতী তাদের আদেশ করছেন আশ্রম প্রতিষ্ঠার। ওই একই স্বপ্ন একই রাতে আর একজনও দেখেছিলেন, তিনি হলেন ডুমুরদহের ধ্রুবানন্দ স্বামী। মহিমানন্দ ও বিজ্ঞানানন্দ ডুমুরদহে ফিরে ধ্রুবানন্দ স্বামীকে এ স্বপ্নের কথা জানালেন। ত্রিবেণীর বিত্তশালী বেণু বসু, যিনি এখানে বছরে দু’-তিন মাস থাকতেন, সব কিছু জানতে পেরে তাঁরই বাড়িতে মূর্তিপূজা শুরু করেন। সেটা ছিল ১৩৬১ বঙ্গাব্দ।
১৩৬৪ বঙ্গাব্দে লক্ষাধিক ভক্তসমাগমের মধ্য দিয়ে পাহাড়ের শীর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমানের মন্দির। শ্রীশ্রীঅষ্টভুজা পার্বতীদেবীর মন্দির। দেবী এখানে সিংহবাহিনী। ২৬ বিঘার উত্তমাশ্রমে রয়েছে বিষ্ণু মন্দির, হোমকুণ্ড, ১০৭ ফুট গভীর ইঁদারা। আর পার্বতী মন্দিরের পেছনে রয়েছে অচিন গাছ, যার তলায় রয়েছেন শিব ও তাঁর বাহন নন্দী। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা মন্দিরটি। প্রাচীরের গায়ে নানা মহাপুরুষের বাণী ও গীতার শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়েছে। দূরে তাকালে নীলাভ পাহাড়, নীচে অমরকানন, সবুজ ফসলের খেত মনকে আনমনা করে তোলে। পাহাড়ের নিচে দু’পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে শীর্ণকায়া স্রোতস্বিনী, মিশেছে শীলা নদীতে। আগে থেকে বলা থাকলে এই আশ্রমে দুপুরে নিরামিষ আহারও পাওয়া যায়। মন্দির খোলা থাকে সকাল ৬-৩০ থেকে ১২টা পর্যন্ত আর বিকেল ৪টে থেকে ৭টা পর্যন্ত। গ্রামের মেঠোপথ পেরিয়ে পাহাড়ে ওঠার অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে যায় এক অনন্য লোকে। এ রকম একটি স্বর্গের অমরকাননে থাকার ইচ্ছে হলে, সে ইচ্ছেকে অনায়াসে প্রশ্রয় দেওয়া যায়। কারণ, শ্রীরামকৃষ্ণ সেবাদল আশ্রম বা কোড়ো পাহাড়ের উত্তমাশ্রম অথবা ফরেস্ট বাংলো, যে কোনও জায়গায় থাকা যায়।
শ্রীরামকৃষ্ণ সেবাদল আশ্রম পঞ্চাশজন পর্যন্ত থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। আগাম অনুমতি নিতে হবে–- সম্পাদক, অমরকানন, শ্রীরামকৃষ্ণ সেবাদল আশ্রম, অমরকানন, বাঁকুড়া এই ঠিকানায়। বনভোজনের কোনও দলকে অবশ্য অনুমতি দেওয়া হয় না।
মেট্যালা
অমরকানন থেকে উত্তরে ৫ কিলোমিটার দূরে শান্ত, সুন্দর মেট্যালা গ্রাম। এর নামকরণ নিয়ে মজা আছে। মল্লভূমের রাজারা বর্গি আক্রমণ প্রতিহত করতে উত্তরপ্রদেশ থেকে অনেক পদাতিক সৈন্য নিয়ে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে তিলকচন্দ্র রায় সেনাবাহিনীতে দক্ষতার পরিচয় দিলে, মল্লরাজারা তাঁকে এই অঞ্চলের অনেক ভূসম্পত্তি দান করেন। সেই কারণে বাকি সৈন্যদের কাছে তিনি মাটিওয়ালা নামে পরিচিত হন আর তা থেকে গ্রামের নাম অপভ্রংশে মেট্যালা হয়েছে। তিলকচন্দ্র রায় ১৭১৮ খ্রিস্টাব্দে এই গ্রামে লক্ষ্মীনারায়ণের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। লক্ষ্মীনারায়ণ আসলে শালগ্রাম শিলা। প্রায় ৪০ ফুট উচ্চতার ইটের তৈরি পঞ্চরত্ন মন্দিরটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ২২ ফুট। মন্দিরটির তিনদিক পোড়ামাটির কাজে অলংকৃত। কৃষ্ণলীলা, লঙ্কাযুদ্ধ, সামাজিক কাহিনি, পৌরাণিক কাহিনি, ফুল-লতাপাতা ও দশাবতার অলঙ্করণ মন্দিরটির মর্যাদা বাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের লোকেরা এখনও এখানে বাস করেন ও মন্দিরটির রক্ষণাবেক্ষণ করেন। সম্প্রতি সংস্কারের ফলে চড়া রঙের ব্যবহারে মন্দিরটির মূল পোড়ামাটির কাজগুলি আবছা ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চৈত্রে রামনবমী এখানকার প্রধান উৎসব, যা প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই চলে আসছে। বাঁকুড়া শহরে থেকেও অমরকানন ঘুরে দেখে নেওয়া যায়, শহরে রাত্রিবাসের ঠিকানা হল-– হোটেল সপ্তপর্ণা, দূরভাষ: ০৩২৪২ ২৫৪৩৭৫ ও হোটেল সপ্তর্ষি, দূরভাষ: ০৩২৪২ ২৫১০৫২।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।