
শেষ আপডেট: 30 August 2019 11:02
প্রশ্নঃ কিডনি স্টোনের চিকিৎসায় ‘লিথোট্রিপসি’ পদ্ধতির কথা প্রায়ই শোনা যায়, এটা আসলে কেমন পদ্ধতি ?
ডাঃ ঘোষ: দেখুন এখন দিনকাল বদলেছে। কিডনি স্টোন চিকিৎসার ক্ষেত্রে গত দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে। এখন স্টোন অপারেশনের জন্য বেশ কয়েকটি নতুন পদ্ধতি রয়েছে। ফলে আগেকার পুরনো পদ্ধতির আর সাহায্য নেওয়া হয় না।
প্রশ্নঃ যেমন?
ডাঃ ঘোষ: ‘লিথোট্রিপসি’ পদ্ধতির কথাটা বলার আগে বড় স্টোন ও ছোট স্টোনের ক্ষেত্রে কী করা হয়, সেটা একটু বলা দরকার। বড় স্টোনের ক্ষেত্রে ইদানীং একটি ছোট ফুটো করে অনেক কম সময়ে, কম খরচে মাত্র দু’একদিন হাসপাতালে থাকলেই কিডনি স্টোন থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। এই পদ্ধতিকে বলে ‘কি হোল সার্জারি’। শুধুমাত্র বড় আকারের স্টোন অপসারণের জন্যই এই পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতির নাম পি.সি.এন.এল. বা পার কিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথেটিমি।
আবার ছোট স্টোনের ক্ষেত্রে একস্ট্রা-কর্পোরিয়াল শক ওয়েভ লিথোট্রিপসি বা ই.সি.এস.ডব্লুউ.এল. পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়। যন্ত্রের সাহায্যে ছোট স্টোন গুঁড়ো করে দেওয়া হয়। তবে এই পদ্ধতির প্রচলিত নাম লিথোট্রিপসি। স্টোনের আকৃতি বিচার করে বিশষজ্ঞ ইউরোলজিস্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন ঠিক কী ধরণের অস্ত্রোপচার করে স্টোনটিকে অপসারণ করা হবে।
প্রশ্নঃ স্টোন অপসারণে লিথোট্রিপসিই কি তাহলে আদর্শ?
ডাঃ ঘোষ: লিথোট্রিপসি শব্দটিকে ভাগ করলে দুটি শব্দ পাওয়া যাবে। ‘লিথো’ এবং ‘ট্রিপসি’। ‘লিথো’ কথাটির অর্থ স্টোন বা পাথর। আর ট্রিপসি কথাটির মানে ভাঙা। তাই দুটি শব্দ জুড়েই পদ্ধতিটির নাম লিথোট্রিপসি দেওয়া হয়েছে। কিডনি স্টোনের চিকিৎসায় এটি একটি নন-ইন্ভেসিভ পদ্ধতি অর্থাৎ লিথোট্রিপসির জন্য কোনও রকম কাটাকাটির দরকার পড়ে না। এই পদ্ধতি ১৯৮০ সালে জার্মানিতে উদ্ভাবিত হয়। তবে ১৯৮৩ সাল থেকে এইচ.এম.থ্রি লিথোট্রিপসি সহ এই পদ্ধতির ব্যবহার খুবই বেড়ে যায়। সেই সময় থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে ই.এস.ডব্লুউ.এল. কিডনি স্টোনের চিকিৎসায় এর ব্যবহারও বিশ্বব্যাপী অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
প্রশ্নঃ লিথোট্রিপসি কী ভাবে মানুষের শরীরে কাজ করে?
ডাঃ ঘোষ: লিথোট্রিপসির প্রথম পর্যায়ে আইসোসেন্ট্রিক আলট্রা সাউন্ড ইমেজিং সিস্টেমের মাধ্যমে স্টোনের স্থানীয়করণ বা লোকালাইজেশন করা হয়ে থাকে। এই পদ্ধতি একবার সেই নির্দিষ্ট অঞ্চল নির্ধারিত হয়ে গেলে যন্ত্রটির শক ওয়েভ থেরাপি মূল কাজ শুরু করে দেয়। তারপর কিডনি স্টোন লক্ষ্য করে হাই-এনার্জি শক ওয়েভ নির্গত হতে থাকলে (নিরবচ্ছিন্ন আলট্রাসাউন্ডের নজরদারিতে) স্টোনটি প্রথমে টুকরো-টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে। পরে তা গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে বালির মতো হয়ে যায়।
প্রশ্নঃ এত কিছুতে সময় কতটা লাগে?
ডাঃ ঘোষ: গোটা পদ্ধতির জন্য মাত্র ৪৫ মিনিট বা তার চেয়ে সামান্য কিছু বেশি সময় লাগে।
প্রশ্নঃ স্টোন ভেঙে টুকরো-টুকরো হয়ে বালির মতো হয়ে যায়। কিন্তু সেগুলি কি পরে শরীর থেকে নিঃসৃত হয়?
ডাঃ ঘোষ: গুঁড়ো-গুঁড়ো বালির মতো হয়ে যাওয়া স্টোনের টুকরোগুলো বেশ কিছুদিন ধরে প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। তাই লিথোট্রিপসি হয়ে যাওয়ার পরে প্রচুর জল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। স্টোনের টুকরোগুলো ঠিক মতো বেরিয়ে গেল কিনা তা কিন্তু নজরে রাখা দরকার। ততক্ষণ ধরে নজরদারি বজায় রাখতে হয়। এর জন্য প্রতি মাসে একবার করে এক্সরে ও ইউরিন কালচার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি দেখা যায় সব বেরিয়ে গেছে, তাও প্রতি বছর একবার করে এক্সরে করে দেখে নিতে হয় যে আবারও কিডনিতে নতুন করে পাথর তৈরি হল কিনা।
প্রশ্নঃ লিথোট্রিপসির অনেক ধাপ আছে কি? থাকলে সেটা কী রকম?
ডাঃ ঘোষ: লিথোট্রিপসি করার জন্য একদিনই যথেষ্ট। কিছু বিশেষ পরীক্ষা করা হয়, কোনও কোনও রোগীর ক্ষেত্রে। সাধারণত অ্যাডমিট না হওয়া রোগীর ক্ষেত্রে এ.সি.ডি.ওর. হিসেবে ই.এস.ডব্লুউ.এল বা লিথোট্রিপসি করা হয়। আগের রাত থেকে রোগীকে না খেয়ে থাকতে বলা হয়। তার আগে কারমিনেটিভ ও ল্যাক্সেটিভ ব্যবহার করে রোগীর পাচননালীকে সম্পূর্ণভাবে গ্যাসমুক্ত করা হয়। এই পদ্ধতি শুরু করার আগে একবার এক্সরে করে দেখে নিতে হয় কিডনি স্টোন ঠিক কোথায় আছে। তারপর নিম্নলিখিত ধাপ অনুসরণ করা হয়।
(১) লিথোট্রিপসির জন্য কোনও অ্যানাস্থেসিয়া প্রয়োগ করা হয় না। তবে রোগীকে অ্যানালজেসিয়া দিতে হতে পারে।
(২) এক্সরে গাইডেন্সের সাহায্যে শক ওয়েভকে কিডনি স্টোনের দিকে তাক করে লিথোট্রিপসি যন্ত্র চালু করা হয়।
(৩) গোটা পদ্ধতি চলাকালীন একজন ইউরোলজিস্ট রোগীর ওপরে সর্বদাই নজর চালিয়ে যান।
(৪) পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার জন্য রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে বলা হয়।
প্রশ্নঃ লিথোট্রিপসির পরে কী কী করতে হবে রোগীকে?
ডাঃ ঘোষ: লিথোট্রিপসি হয়ে যাওয়ার ঘন্টা দুয়েক পরে রোগীকে রিকভারি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। দিন দুয়েকের জন্য রোগীকে ব্যথা কমানোর ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হতে পারে। এছাড়াও সংক্রমণের সম্ভাবনা এড়াতে রোগীকে অনেক সময় অ্যান্টিবায়োটিকও দেওয়া হয়। তবে হাসপাতাল ছাড়ার আগে রোগীকে ফলো-আপ অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হয়। সঙ্গে কিছু পরামর্শও। যেমন, বাড়িতে পুরোপুরি বিশ্রাম নেওয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথা কমানোর ওষুধ খেয়ে যাওয়া। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়া, যাতে স্টোনের কোনও গুঁড়ো থেকে থাকলে তা যেন প্রস্রাবের সঙ্গে বেরিয়ে যায়।
প্রশ্নঃ লিথোট্রিপসির কোনও বিশেষ সুবিধা আছে কি?
ডাঃ ঘোষ: অবশ্যই আছে। যেমন অ্যানাস্থেসিয়া লাগে না। শরীরে কোনও ক্ষত থাকে না। কোনও রক্তক্ষরণ হয় না। কোনও ব্যথা-বেদনা থাকে না। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকতে হয় না। সকালে এসে বিকেলে বা সন্ধ্যেতে বাড়ি চলে যাওয়া যায়। লিথোট্রিপসিতে কোনও সংক্রমণ হয় না। তবে সামান্য কিছু ঝুঁকিও আছে।
প্রশ্নঃ ঝুঁকি কতটা?
ডাঃ ঘোষ: বড় কোনও ঝুঁকি না থাকলেও কিছু সামান্য সমস্যার কারণে একটু সতর্ক থাকা দরকার। সেটা চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়াই ভালো। ব্যথা ও অস্বাচ্ছন্দ্য, কিডনি ঘিরে রক্তপাত বা কিডনির ক্ষতি, সংক্রমণ, স্টোনের গুঁড়ো থেকে সংক্রমণ বা তিনদিন ধরে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত, ইউটেরাসে প্রতিবন্ধকতা, স্টমাকে আলসার ইত্যাদি সমস্যা অনেক সময় দেখা যেতে পারে। তবে খুব বেশি নয়, ১০০ জনের মধ্যে ৫ জনের হয় তো এগুলো হতে পারে।
প্রশ্নঃ এই ঝুঁকির কারণ কী?
ডাঃ ঘোষ: অনেকগুলি কারণ আছে। প্রথমতঃ লিঙ্গ বা সেক্স। যেমন সত্তর বছর বয়সের মধ্যে প্রতি একশো জনের মধ্যে ১২ জন পুরুষ ও ৫ জন মহিলা কিডনি স্টোনের সমস্যায় ভুগতে পারেন। দ্বিতীয়তঃ বয়স। দেখা গেছে ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী মানুষদের সাধারণভাবে কিডনি স্টোন হয়। তবে সমস্ত প্রাপ্তবয়স্কদেরই ক্যালসিয়াম স্টোনের ঝুঁকি রয়েছে। তবে কিছু বংশগত কারণে শিশুরাও এই কিডনি স্টোনের সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। তৃতীয়তঃ বংশগত ঝুঁকি, দেখা গেছে ৪৫ শতাংশ কিডনি স্টোনের পিছনে রয়েছে বংশগত কারণ। চতুর্থতঃ খাদ্যাভাস। নানা গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কোনও জনগোষ্ঠীতে কিডনি স্টোনের সঙ্গে প্রাণীজ প্রোটিন গ্রহণের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। স্টোন সৃষ্টিতে প্রাণীজ প্রোটিনের ভূমিকা রয়েছে। প্রাণীজ প্রোটিন, ইউরিক অ্যাসিড ও ক্যালসিয়াম অক্সালেট যৌথ ভাবে স্টোনের ব্যাপকতা বাড়িয়ে দেয়। পঞ্চমতঃ জল ও অন্য পানীয়। এখন তো কিডনি স্টোন হওয়া আটকাতে প্রচুর জল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিডনি স্টোন হওয়ার নেপথ্যে জল ছাড়াও অন্য কোনও পানীয়ের ভূমিকা রয়েছে কিনা, তা জানা যায়নি। তবে একটি সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে - এক লিটারের এক চতুর্থাংশ কফি অথবা চা কিডনি স্টোনের ঝুঁকি দশ শতাংশ কমাতে পারে। অথচ একই পরিমাণ ওয়াইন ও বিয়ার এই ঝুঁকি কমায় যথাক্রমে পঞ্চাশ ও চল্লিশ শতাংশ। একই পরিমান আঙুর রসের ক্ষেত্রে কিন্তু উলটো ব্যাপার ঘটে। সেখানে কিডনি স্টোনের ঝুঁকি বেড়ে যায় প্রায় চল্লিশ শতাংশ।
প্রশ্নঃ কিডনি স্টোন থেকে মুক্তি পেলেও, পরবর্তীতে কি তা আবার হতে পারে?
ডাঃ ঘোষ: যথোপযুক্ত সুরক্ষা না নিলে দশ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রথম স্টোন হওয়ার এক বছরের মধ্যে, তেত্রিশ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রথম স্টোন হওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে এবং পঞ্চাশ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রথম স্টোন হওয়ার দশ বছরের মধ্যে আবার স্টোন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
প্রশ্নঃ কোন ধরণের রোগীর ক্ষেত্রে লিথোট্রিপসির কার্যকারিতা অনেক বেশি?
ডাঃ ঘোষ: স্টোনের আয়তন চার মিলিমিটার থেকে এক সেন্টিমিটারর মধ্যে থাকলে এবং স্টোন কিডনিতে অবস্থান করলে লিথোট্রিপসি সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হয়।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিপ্লবকুমার ঘোষ