
বাঙালির মদ্যপান
শেষ আপডেট: 25 December 2024 16:58
এককালে রূপচাঁদ পক্ষীর দল গান বেঁধেছিল—
‘কী মজা আছে রে লাল জলে
জানে ঠাকুর কোম্পানি,
মদের গুণগান আমরা কি জানি?
জানে ঠাকুর কোম্পানি।’
বই-পত্তর ঘেঁটে দেখলে জানতে পারা যায় একটা সময় কলকাত্তাইয়া বাঙালির অন্যতম কৌতূহলী প্রশ্ন ছিল, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার এত ফর্সা হল কোত্থেকে? যার উত্তরে কেউ কেউ টিপ্পনী কেটে বলতেন ‘ওই তো দুধে আর মদে’। গুজব ছিল, ও বাড়িতে শিশু জন্মালেই মদের পিপেতে ডুবিয়ে রাখা হত, যাতে রং হয় জেল্লাদার।
ভুরু উঁচিয়ে গলায় ‘হুহ্ হু’ সূচক বড়াই আওয়াজ তোলা বাঙালি আর যাই হোক, যিশু ঠাকুরকে পেন্নাম করে এ বড়দিনে লাল জলে শরীর এলিয়ে ‘ভেসে যায় আদরের নৌকো’ গাইতে ছাড়ে না (Drinking in festive season)। আর একথা কে না জানে, সিনেমাপ্রেমী বাঙালি সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিক নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হলেও মদের আসরে সবাই ‘ভাবুক’।

এই ঋত্বিক ঘটকই নাকি দেশি মদের মধ্যে কাপ ভর্তি চা উপুড় করে ঢেলে খেতেন। কতদূর সত্যি তা জানা নেই। তাঁর ঘনিষ্ঠদের থেকে সে সব গল্প শুনে অনেক জায়গায় লেখালিখি হয়েছে। এখনও তো মদের অনুপাতে এক কোয়া কমলালেবু, ডাবের জল, কিংবা এলাচ মিশিয়ে খাওয়ার প্রবণতা আছে অনেকের মধ্যেই। সে সব আবার ঋত্বিক ঘটকীয় ঘরোয়া অভ্যেসে বন্দি নেই, রেস্তোরাঁয় চড়া দামে বিকোনো দুর্ধর্ষ ককটেলের তালিকায় বুক ফুলিয়ে বসে আছে।
আর রেস্তোরাঁর নামীদামি ককটেল হোক বা সস্তার দেশি, চাট ছাড় মদ্যপান মণিহারা ফণীর মতোই ম্যাড়ম্যাড়ে। তার আবার বিষ আছে, গৌরব নেই।
পিনাকী বিশ্বাসের লেখা, ‘কলিকাতার মদ্যপান, সেকাল ও একাল’ বইতে বলা হয়েছে ‘টেকচাঁদ ঠাকুর ধেনো চাট হিসেবে লিস্টে রাখতেন বেগুনি, ফুলুরি, চালভাজা’।

আরও এক কাঠি ওপরে উঠে চাটের নিদর্শন এসেছে বনোয়ারীলাল গোস্বামীর ‘কার মরণে কে বা মরে মলো মাগী কলু’ প্রহসনে। যেখানে বলা হচ্ছে শবানুরাগী বাঙালিবাবুরা মদ সহযোগে ঝলসানো শবদেহ কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে। তারপর এক পথচলতি কলুবউ হত্যা করে, পুড়িয়ে তাই দিয়ে চাট বানাচ্ছে।
এ ‘চাটের’ লেখা এমনই সাড়া ফেলেছিল যে কলকাতা গেজেটে এ প্রসঙ্গে লেখা বেরিয়েছিল, ‘A revolting story related with the view of condemning and showing the evils of drunkenness among educated Bengalis.’
মাতালদের নিয়ে এসব অনেক রকম রসালো, বীভৎস গপ্পো যেমন আছে, তেমনই তারাপদ রায়ের লেখায় হিমানীশ গোস্বামীর বলা একটি দুঃখের গল্পও এই প্রতিবেদনে ঠাঁই পাওয়া দরকার। সেখানে হিমানীশ লিখছেন, ‘অযোধ্যা সিং বলে একটি লোক এক রাতে তিন বোতল রাম খেয়ে মারা যায়। তার বন্ধুরা সৎকারের সময় সেই রামের বোতলগুলো চিতায় তুলে দেয়।’
যা পড়ে হিমানীশবাবুর এক পাঠক প্রশ্ন করেন, ‘কী যা তা লিখেছেন, এমন লোক আছে যারা বহুদিন ধরে মদ খেয়ে মারা যায় শুনেছি, কিন্তু একদিনে বেশি মদ খেয়ে লোকে বেহুঁশ হতে পারে, মারা যেতে পারে না। হিমানীশবাবু তখন মুচকি হেসে জবাব দেন, 'কী বলি বলুন তো, সে রামও নেই, আর অযোধ্যাও নেই!'
তবে বাঙালি আছে, বাঙালির উৎসব আছে। উৎসব মানেই উপলক্ষ আছে। সে উপলক্ষে মদ খাওয়া আছে। বিনা উপলক্ষে মদ খাওয়ার দুর্নিবার ইচ্ছেও আছে। তবে মাথায় রাখতে হবে যেন টেকচাঁদ ঠাকুরের লেখা সেই কথাগুলো ‘পেগে’ ‘পেগে’ মিলে না যায়।
‘বাঙালিরা মদ খাইতে আরম্ভ করলে, প্রায় মদে তাহাদেরকে খায়।’