
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত বাচ্চা - প্রতিকী ছবি
শেষ আপডেট: 21 March 2024 17:13
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলায় পরিবার ভেবেছিল বাচ্চা বোধহয় অ্যাবনর্মাল। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মেধা তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সকলকে। হাবভাব, আচরণ, কথাবার্তায় আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো না হলেও, তাঁর হাতে বশ মেনেছে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত বাদ্যযন্ত্র। বেহালা, স্যাক্সোফোন, ট্রাম্পেট, ড্রাম, পিয়ানো ঝঙ্কার তোলে তাঁর হাতে। অ্যাওয়ার্ডে ভরে গিয়েছে ঘর। অপরা উইনফ্রে শো থেকে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, তাঁকে নিয়েই চর্চা। তিনি সুজিত দেশাই। ভারতে প্রথম ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত সঙ্গীত শিল্পী যাঁর খ্যাতি বিশ্বজোড়া।
ডাউন সিনড্রোম (Down syndrome) এমন এক জেনেটিক রোগ যা জন্মগত। ভ্রূণ অবস্থাতেই বাসা বাঁধে। জন্মানোর পরে লক্ষণ প্রকাশ পেতে থাকে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অক্ষম হয় শিশু। বুদ্ধির বিকাশ থমকে যায় অনেকের। শরীরিক গঠনেও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। হরমোনের সমস্যা দেখা দেয়। দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি দুইই ক্ষীণ হতে থাকে। এমনও দেখা গেছে, শৈশবে বাচ্চার এমন সব লক্ষণ দেখে পাগল ভেবে বসেন বাবা-মা। বাচ্চার যত্নআত্তিও সেভাবে হয় না। কিন্তু ডাক্তরাবাবুরা বলছেন, এই সিনড্রোম আছে মানেই বাচ্চা পাগল নয়। একধরনের জিনগত রোগ যে কারণে বাচ্চার শারীরিক ও মানসিক গঠন সম্পূর্ণ হয় না অনেক সময়ে। তবে এতে আক্রান্ত বাচ্চাকে জিনিয়াস হতেও দেখা গেছে। যেমন সুজিত দেশাই, মডেল মেডেলিন স্টুয়ার্ট, অলিম্পিক জিমন্যান্ট ও মডেল চেলসিয়া ওয়ার্নার ইত্যাদি।
মূলত জিনগত ত্রুটির কারণেই এই সিনড্রোম হয়। ২৩ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে ২১তম ক্রোমোজমে দু’টির বদলে তিনটি ক্রোমোজোম থাকে। তাই অসুখটি ‘ট্রাইজোমি-২১’ নামেও পরিচিত। এই রোগ হলে শিশু শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধিজনিত কিছু সমস্যা নিয়েই জন্ম নেয়। এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের করোটি এবং মুখের গঠন কেমন হবে, তাও নাকি নির্ভর করে জিনের উপরেই। ১৮৬৬ সালে ইংরেজ চিকিৎসক জন ল্যাংডন ডাউন অসুখটিকে প্রথম চিহ্নিত করেন বলে তাঁর নামেই অসুখটির নাম রাখা হয় ডাউন সিনড্রোম।
ডাউন সিনড্রোম নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। এই রোগে আক্রান্ত শিশু কিন্তু মানসিক রোগী নয়, বরং বলা চলে ব্যতিক্রমী। যারা সমাজের আর পাঁচজনের মতো নয়, যারা একটু ছকভাঙা। চিকিৎসাবিজ্ঞান যেভাবে উন্নত হচ্ছে তাতে এখন এই রোগ যথেষ্ট প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজনীয় সচেতনতা এবং কিঞ্চিত সামর্থ থাকলে বেশির ভাগ গর্ভবতীই আজকাল এই টেস্ট করিয়ে নেন। তবু এখনও প্রতি আটশো শিশুর মধ্যে একজন এই রোগ নিয়ে জন্মায়। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ত্রিশ হাজার বাচ্চার জন্ম হয় এই সিনড্রোম নিয়ে। এর জন্যে শিশুটি তো বটেই তার মা বাবাও বিন্দুমাত্র দায়ী নন। এ ঘটনা ঘটে প্রাকৃতিক কারণেই।
ডাক্তারবাবুরা বলছেন, ভালবাসা আর যত্নই আক্রান্ত বাচ্চাদের অন্যতম চিকিৎসা। তাদের বাইরে আনতে হবে, ভালবাসতে হবে, সমাজের সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। তবু সমাজে রয়েছে তাদের নিয়ে নানা ধরনের দুর্ভাগ্যজনক এবং অবৈজ্ঞানিক মিথ। ওরা খেলতে পারে, গাইতে পারে, হাসতে পারে, হাসাতে পারে। কোমল স্বভাবের হলেও ওদেরও রাগ, দুঃখ, অভিমান হয়। অনেকেই লেখাপড়া শিখে নিজের কেরিয়ার গড়ে।
গর্ভবতী হওয়ার ১০ সপ্তাহ পরে 'কোরিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিং' (chorionic villus sampling) কিংবা ১৫ সপ্তাহ পর 'অ্যামনিওসেন্টেসিস' (Amniocentesis) পরীক্ষায় ধরা পড়ে ভ্রূণ সিনড্রোমে আক্রান্ত কিনা।
গর্ভাবস্থার ১০ থেকে ১৩ সপ্তাহের মধ্যে আলট্রাসোনোগ্রাফিতেও ধরা পড়তে পারে এই রোগ।
'সেল-ফ্রি ফিটাল ডিএনএ' রক্তপরীক্ষা করলেও এই রোগ ধরা পড়ে ।
জন্মের ৬ ও ১২ মাসের মাথায় এবং পরে বছরে একবার করে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির পরীক্ষা করানো দরকার।
জন্মের ৬ মাসের মাথায় থাইরয়েড টেস্ট করানোও দরকার।
২ বছর বয়স থেকে প্রতি ৬ মাসে একবার দাঁত পরীক্ষা করা জরুরি।
হার্ট, অন্ত্র, কিডনির টেস্ট করানোও জরুরি। এই লক্ষণ থাকলে চট করে নানা সংক্রমণজনিত রোগ হতে পারে। নানারকম কোমর্বিডিটি থাকতে পারে বাচ্চার।
শিশুর অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে কিনা সেটা জেনেও থেরাপি শুরু করা দরকার। ঘাড়ের এক্স-রে করতেই হবে।
আক্রান্ত বাচ্চার স্পিচ থেরাপি, ফিজিও থেরাপি, স্পেশাল এডুকেশন, স্পেশাল ডায়েটের ব্যবস্থা করতে হবে। মাঝেমধ্যেই মনোবিদের থেকে কাউন্সেলিং করিয়ে নেওয়া ভাল। এই ধরনের বাচ্চাদের অবহেলা করলে তাদের মানসিক অবস্থা আরও বিপর্যস্ত হয়ে যায়। তাই আর পাঁচজন সাধারণের মতোই দেখতে হবে তাদের। যত্নও করতে হবে সেইভাবে। কে বলতে পারে এই বাচ্চাদের মধ্যে থেকেই ভবিষ্যতে একজন জিনিয়াসের জন্ম হবে না!