বসন্তে ভরা বর্ষার জল কাদা পেরোচ্ছেন। রাস্তাঘাট পুকুর নদীর চেহারা নিয়েছে। ঘরে ঘরে এখন জ্বর, সর্দি-কাশি সঙ্গে বমি। একে কী বলব আমরা? নিছকই ভাইরাল ইনফেকশন….. আসলে কী এবং কেন তা জানতেই পৌঁছে গেছিলাম ডাক্তারবাবুর কাছে। ডঃ সৌরেন পাঁজা দ্য ওয়ালকে কী বলছেন শুনে নিন...
দ্য ওয়াল: জ্বর এখন ঘরে ঘরে, কেন? শুধুই কী ভাইরাল অ্যাটাক না অন্য কারণ?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: অধিকাংশ জ্বরই এখন ভাইরাল। আমরা সাধারণত একে common cold, flue infection বলে থাকি। ভাইরাস ইনফেকশনের পর যখন শরীর দু্র্বল থাকে তখনই ব্যাকটেরিয়াল অ্যাটাকও হয়। ফলে এ সময়ে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, টাইফয়েডও হতে পারে। আবার অ্যালার্জি থেকেও অনেক সময়ে হতে পারে জ্বর। আজকাল সিজ়ন চেঞ্জের যে সমস্যা বলা হচ্ছে, যেমন বসন্তে বৃষ্টি বা শীতকাল ক্যালেন্ডারে অথচ সোয়েটার তোলা থাকছে আলমারিতে-- এর ফলে এই জ্বর আরও বেশি হচ্ছে। কারণ ব্যাকটিরিয়া আর ভাইরাসের বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। এমনকী এ বছরে সোয়াইন ফ্লু ও হচ্ছে খুব বেশি। এই ফ্লু প্রতি একবছর ছেড়ে ছেড়ে বেশি হয়। আর এই ফ্লু খুব ছোঁয়াচেও। হাঁচি-কাশিতে এই ইনফেকশন ছড়ায়।
দ্য ওয়াল: জ্বরের সঙ্গে কী কী থাকছে? তাতে সমস্যা বাড়ছে কতটা?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: হাঁচি, কাশি, নাকবন্ধ, শ্বাসকষ্ট, বমি, বমির সঙ্গে রক্তও বেরোতে পারে, খিদে না পাওয়া, অরুচি থাকা, ডায়েরিয়া, সারা গা হাত পায়ে ব্যথা, গাঁটে গাঁটে ব্যথা ইত্যাদি থাকছে। সঙ্গে থাকছে চোখ জ্বালা, মাথা ব্যথাও। ফলে এগুলো যখনই হচ্ছে তখনই এটা ভাইরাল এফেক্ট সেটা বুঝে নিতে হবে। আর এই অনুষঙ্গ নিয়ে সমস্যা বাড়ছে কারণ এগুলো নিয়ে যখন কেউ অফিসে যাচ্ছেন বা স্কুল কলেজে যাচ্ছেন, তখন তা বাকিদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দ্য ওয়াল: এমনিতেই আমরা প্যারাসিটামল খেয়ে বা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে কাজে বেরিয়ে পড়ি, সেটা কতটা ঠিক?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: একেবারেই ঠিক নয়। প্যারাসিটামল আসলে ১০০ এর উপরে জ্বর না উঠলে একেবারেই খাওয়া উচিত নয়। কোনো সুনির্দিষ্ট রোগ ডায়াগনোসিসে পৌঁছানোর আগেই অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দিলে প্রকৃত রোগ অনেক সময় ধরা পড়ে না। সুচিকিৎ সা পাওয়া অসম্ভব হয়ে যায়। জ্বর শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যান্টিবায়োটিক দিলে বাচ্চাদের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয় না। তাই অন্তত দুই দিন না গেলে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করা উচিত নয়। মেনিনজাইটিস বা সেপটিসেমিয়া ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দেরি করে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করলে কোনো অসুবিধা নেই।
কী বলছেন ডাক্তারবাবু? দেখে নিন
https://www.youtube.com/watch?v=Tt96vElY0MQ&t=15s
দ্য ওয়াল: উপসর্গ কী কী দেখলেই ডাক্তারের কাছে দৌড়ে যেতে হবে?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: হঠাৎ জ্বর যা ৭-৮ দিন ধরে চলতে থাকতে পারে, শরীরের তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে যায় এক্ষেত্রে। ১০২-১০৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর হয়, জ্বরের সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথা, গা ম্যাজম্যাজ করা থাকবেই। বেশির ভাগ সময়ে জ্বরের সঙ্গে সর্দি-কাশি থাকে। বিশেষ ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে পেট ব্যথা, বমি, ডায়েরিয়া দেখা দিতে পারে। গায়ে, হাত-পায়ে অসহ্য ব্যথা হয়, মুখে স্বাদ থাকবে না, বমি বমি ভাব, খেতে ইচ্ছে না করা, গলায় ব্যথা ইত্যাদি দেখলে অবশ্যই জাক্তারের কাছে যাবেন।
দ্য ওয়াল: এই জ্বরের উপসর্গ শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য আলাদা?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: বড়দের ভাইরাল জ্বরের প্রধান লক্ষণ হলো শরীরের পেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, চোখ লাল হওয়া, রানিং নোজ় ইত্যাদি। বড়দের ক্ষেত্রে এই জ্বর থেকে সংক্রমণ হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মুখ লাল হয়ে যায়, গা প্রচণ্ড গরম থাকে, মাথা ব্যথা করে, সঙ্গে থাকে সর্দি ও কাশি। সব সময় মাথা ভারী মনে হয়। এতে বাচ্চারা দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময়ে বাচ্চাদের তড়কাও হতে পারে। তাই খুব কেয়ারফুল থাকা উচিত।
দ্য ওয়াল: রক্তপরীক্ষা ছাড়া আর কোনো পদ্ধতিতে বোঝা সম্ভব যে সেটা সাধারণ জ্বর না ম্যালেরিয়া না ডেঙ্গু না টাইফয়েড?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: না, আর সেভাবে বোঝার উপায় নেই। তবে বুকের এক্সরে থেকে কিছুটা আন্দাজ পাওয়া যায়।
দ্য ওয়াল: প্রতিটি জ্বরের আলাদা উপসর্গ থাকে, সেগুলো কী কী? চিকিৎসা আলাদা আলাদা, কতটা সময় লাগে সেরে উঠতে?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: কমন ফ্লু অর্থাৎ এখন যা হচ্ছে তাতে হাঁচি কাশি শ্বাসকষ্ট দিয়েই শুরু। এছাড়া খেতে ইচ্ছে না করা, পেটে ইনফেকশন ইত্যাদি হলে টাইফয়েডের দিকে যেতে পারে। পেটব্যথা থেকে ডায়েরিয়া হলে, অজ্ঞান হয়ে গেলে সেটা ম্যালেরিয়ার সম্ভাবনার কথা বলে। জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, পেটের উপরদিকে ব্যথা, গাঁটে গাঁটে ব্যথা, চোখের পিছনদিকে ব্যথা হলে সেটা অবশ্যই ডেঙ্গু। সাধারণ জ্বরের ক্ষেত্রে ৩-৭ দিন রেস্ট নিতেই পারেন। বাকি ক্ষেত্রে অনেক সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হতেও হতে পারে। তবে দুর্বলতা থাকবে, তাই সাধারণ জীবনে ফিরছেন যখন তখনও নিজের প্রতি যথেষ্ট কেয়ারফুল থাকতেই হবে।
দ্য ওয়াল: এখন যে জ্বরে কাবু হচ্ছেন লোকজন তাতে কতদিনে মুক্তি পাওয়া যায়? কাজ ফেলে বাড়িতে রেস্টে থাকাটাও মুশকিল, তাহলে উপায় কী?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: ৫-৭ দিন অবশ্যই লাগবে। তার বেশিও লাগতে পারে। তবে অবশ্যই রেস্ট নিতে হবে নইলে সেরে ওঠা সম্ভব না। থাকতে না চাইলেও থাকতে হবেই। কারণ আপনি অসুস্থ হয়ে বাড়িতে না থাকলে বাকিরা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন। অন্তত ৫-৭ দিন আপনাকে রেস্টে থাকতেই হবে। এ সময়ে শারীরিকভাবে আপনার দুর্বলতা এমন জায়গায় পৌঁছতেই পারে যে আপনার মাঝরাস্তায় মাথা ঘুরে যেতে পারে। চোখ মুখে অন্ধকার দেখতে পারেন। ফলে আপনার রেস্ট নেওয়াই ভালো।
দ্য ওয়াল: খাওয়া দাওয়া কী ভাবে রেস্ট্রিকটেড রাখতে হবে?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: বাইরের খাবার খাবেন না একেবারেই। বাড়িতে বানানো হাল্কা খাবার খান। যা ভালো লাগে তাই খান। রুচি থাকলে সবই খেতে পারেন। প্রোটিন, মিনারেল জাতীয় খাবার খান। কারণ শরীর এসময়ে খুব দুর্বল থাকে। তাই যতটা পারবেন হাল্কা খেয়ে সুস্থ থাকুন। পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। কারণ শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ঠিক রাখে পুষ্টিকর খাবার। প্রচুর ফলমূল খেতে হবে। সর্দি-কাশি, গলাব্যথা হলে সকাল-বিকেল চা বা কফি খাওয়া যেতে পারে।
দ্য ওয়াল: জলপট্টি দেওয়া বা স্নান না করা, ভাত না খাওয়া ইত্যাদি আগে শোনা যেত, এখনও কী এই প্রেসক্রিপশন চলে?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: আগে এই প্রেসক্রিপশন মেনে চলতে হত। তবে ভাত খাওয়া আর স্নান করার সঙ্গে জ্বর কমার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু জলপট্টির সঙ্গে আছে। জলপট্টি দিলে শরীরের তাপমাত্রা কমে। কিন্তু বাকি কিছুতে বিশেষ কোনও উপকার হয় না। জ্বর খুব বেড়ে গেলে ঠাণ্ডা জলে মাথা ধুইয়ে দেওয়া, গা-হাত-পা স্পঞ্জ করাও কাজে দেয় খুব। আর খাওয়া দাওয়া অবশ্যই হাল্কা করতে হবে। জ্বর থাকলে জ্বর কমানোর ও শরীরের ব্যথা কমার ওষুধ দেওয়া হয়। জ্বর কখনোই বাড়তে দেওয়া যাবে না।
দ্য ওয়াল: কী কী সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত?
ডঃ সৌরেন পাঁজা: ভাইরাসের কারণে জ্বর থেকে শরীরে দেখা দিতে পারে নানা সমস্যা। যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন না করলে ভাইরাল জ্বর রূপ নেয় নিউমোনিয়া, ব্রঙ্কাইটিস, ডায়েরিয়া, সাইনোসাইটিস ইত্যাদি নানা জটিল রোগের। এমনকী মস্তিষ্কেরও ক্ষতি করতে পারে। মাম্পস, চিকেন পক্স, পোলিও, হেপাটাইটিস, স্মল পক্সের টিকা শিশুদের ঠিক সময়ে দিতে হবে। বাড়িতে পোষা কুকুরকে নিয়মিত ভ্যাকসিন দিতে হবে। ভাইরাল জ্বর হলে রোগীকে একটু আলাদা রাখতে হবে। জ্বর হওয়া মাত্র ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
অতএব দেরি না করে জ্বরের সমস্যায় চেষ্টা করুন ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে। নিজের খেয়াল রাখতে, কারণ সিজন চেঞ্জের এই ভাইরাল আপনাকে হাসপাতাল পর্যন্তও পৌঁছে দিতে পারে। তাই সুস্থ থাকুন এই বসন্তের বর্ষায়।
সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়