ডক্টর অরিত্র কোনার
(কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট)
গোটা রাজ্য তথা দেশের একটা বড় অংশের মানুষের কাছেই এখন আলোচনার বিষয়, দেশের প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের আচমকা হার্ট অ্যাটাক। মাত্র ৪৮ বছর বয়স, শারীরিক ভাবে বেশ ফিট, নিয়মিত শরীরচর্চা করেন-- তাঁর কেন হবে এত কম বয়সে হার্টের অসুখ! এ প্রশ্ন ভাবাচ্ছে সাধারণ মানুষকে। কোথাও একটা আশঙ্কাও বাড়াচ্ছে। তদুপরি, চিকিৎসা করতে গিয়ে জানা গেছে, সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিবারে আগেই হাইপার কোলেস্টেরলের ইতিহাস রয়েছে। তাহলে কি কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকাটা হার্টের পক্ষে অশনি সংকেত? এই নিয়েই দ্য ওয়ালের প্রতিনিধি তিয়াষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় ডক্টর অরিত্র কোনার।
মাত্রাতিরিক্ত কোলেস্টেরল হার্টের শত্রু
কোলেস্টেরলের সঙ্গে হার্টের অসুখের সম্পর্ক আছে শুধু নয়, একেবারে প্রত্যক্ষ ভাবেই আছে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়লে তা হৃদরোগের ঝুঁকি নিশ্চিত ভাবেই বাড়ায়। এই কোলেস্টেরল বাড়ার বিষয়টিও আবার অনেক ক্ষেত্রেই বংশানুক্রমিক হয়। দাদু-ঠাকুমা বা বাবা-মায়ের থেকে ছেলেমেয়েদেরও হাইপার কোলেস্টেরল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে কম বয়স থেকেই। তবে সেটা পরীক্ষা ছাড়া চট করে বোঝা সম্ভব হয় না। সেই না-বোঝা থেকেই অনেক সময়ে বিপদ ঘটে যায়। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রেও সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের যা বয়স, ৪৮, তা সাধারণত সবল হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে ফেলার পক্ষে যথেষ্ট নয়। পাশাপাশি, অত বড় মাপের একজন প্রাক্তন ক্রিকেটার যে শরীরচর্চার মধ্যেই থাকবেন, সেটা হওয়াই স্বাভাবিক। বস্তুত শরীরচর্চা করতে করতেই অসুস্থ হয়েছেন তিনি। তার উপর এটাও আশা করা যায়, তাঁর খাদ্যাভ্যাসও নিশ্চয়ই মাত্রাছাড়া নয়। এই পরিস্থিতিতে আচমকা হার্ট অ্যাটাকের কারণগুলির মধ্যে একটা বড় কারণ হতেই পারে পারিবারিক হাইপার কোলেস্টেরলের ইতিহাস। সে সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার জায়গাই নেই।
যত দ্রুত স্ক্রিনিং, ঝুঁকি তত কম
আমি সাধারণের উদ্দেশে বলব, পরিবারে যদি হাইপার কোলেস্টেরলের ইতিহাস থেকে থাকে, তাহলে কম বয়স থেকেই, মোটামুটি ২০-২৫ বছর থেকেই রক্তপরীক্ষার মাধ্যমে কোলেস্টেরলের পরিমাণ মনিটর করা উচিত। লিপিড প্রোফাইল টেস্ট করে খুব সহজেই দেখা যেতে পারে কোলেস্টেরল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কিনা।

এখন যদি টেস্ট করে দেখা যায় কোলেস্টেরল হাই, তখন কিন্তু কম বয়স থেকেই হার্টের অসুখ শরীরে বাসা বাঁধার ঝুঁকি বেড়ে যায়। কারণ কোলেস্টেরল হাই থাকা মানে, সেগুলি হার্টের রক্তনালীর দেওয়ালগুলিতে অশুদ্ধি বা প্ল্যাক জমাতে থাকে। এর ফলে নালী সরু হতে থাকে। নালী সরু হওয়া মানে, হার্টে রক্ত-চলাচল বাধা পায়। যার ফল অবশ্যম্ভাবী হৃদরোগ। এছাড়াও, পরিবারে কোলেস্টেরলের ইতিহাস না থাকলেও, ৩০-৩৫ বছর বয়স থেকে লিপিড প্রোফাইল স্ক্রিনিং করাতে হবে।
রক্তনালীতে জমছে অশুদ্ধি, মানছে না বয়স
সাধারণ জনমানসে যে ধারণা রয়েছে, হার্টের এমন সমস্যা কেবল বয়সকালেই হয়ে থাকে, সে ধারণা কিন্তু ইতিমধ্যেই নস্যাৎকরে দিয়েছে একাধিক গবেষণা। বরং এখন জানা যাচ্ছে, কোনও নবজাতকও রক্তনালীতে অশুদ্ধি নিয়ে জন্ম নিতে পারে! ফলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে, পরিবারে যদি কোলেস্টেরল বেশি থাকার ইতিহাস থাকে, তবে তা অনেক কম বয়স থেকেই মানুষকে বিপদে ফেলতে পারে। আচমকা বুকে ব্যথা বা ছোটখাটো হার্ট অ্যাটাকও আশ্চর্যের কিছুই নয়। হার্টের কোনও রক্তনালীতে প্ল্যাকগুলি রাপচার করার ফলে যদি নালীটি পুরো বন্ধ হয়ে যায়, তখনই হার্টে রক্ত পৌঁছতে পারে না, যার ফলে হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন রোগী।

ফলে এটা স্পষ্ট করে নেওয়া খুব জরুরি, যে পারিবারিক হাইপার কোলেস্টেরল থাকলে কম বয়স থেকে নিয়মিত কোলেস্টেরলের মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা ও সচেতন হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক বাড়ছে
বর্তমান সময়ে আমরা যা দেখছি, তাতে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সি প্রচুর রোগী পাচ্ছি হার্ট অ্যাটাক নিয়ে। তাঁদের মধ্যে একটা বড় অংশের কিন্তু পারিবারিক হাইপার কোলেস্টেরলের ইতিহাস আছে। এবং তাঁরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এই নিয়ে সচেতন নন। ফলে না হয়েছে পরীক্ষা, না ধরা পড়েছে সমস্যা। একেবারে সরাসরি হার্ট অ্যাটাকের মুখে পড়েছেন তাঁরা। এটার প্রবণতা দিনকেদিন বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, সারা বিশ্বের নিরিখে ভারতে অনেক বেশি সংখ্যক অল্পবয়সি মানুষ হার্টের এই সমস্যায় পড়ছেন। যার বড় কারণ পারিবারিক হাইপার কোলেস্টেরল।
তবে কোলেস্টেরলকে হার্টের অসুখের জন্য একটা বড় কারণ বলে চিহ্নিত করা হলেও, একথা মনে রাখতে হবে, কোলেস্টেরল আমাদের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় একটি লিপিড কম্পাউন্ড। এটি শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে ডেভেলপ করে, শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও এর ভূমিকা আছে। কিন্তু সব কোলেস্টেরলই যে ভাল ও প্রয়োজনীয়, তা নয়। এবং সেই সঙ্গে জরুরি তার মাত্রা। যেমন খারাপ কোলেস্টেরল এলডিএল। এটি ১০০-র নীচে রাখা জরুরি। সেটা বাড়লেই তা বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জমা হতে থাকে। এই জমা হওয়ার ফলেই সবচেয়ে বিপদে পড়ে হার্ট, কারণ তার রক্তনালী বদ্ধ করে দেয় এই অতিরিক্ত এলডিএল।

এই অবস্থায় আমাদের সবচেয়ে বেশি চিন্তার কারণ যে অসুখ, তা হল হার্টের ধমনী অর্থাৎ করোনারি আর্টারি ব্লক হয়ে যাওয়ার সমস্যা। এটাই হয়েছে সৌরভেরও। এ জন্য বেশ কিছু লক্ষ্মণ দেখা যায় শরীরে। করোনারি আর্টারির মধ্যে ধীরে ধীরে লিপিড জমা হওয়ার কারণে যদি ধমনী সরু হতে থাকে, তাহলে হার্টের পেশিতে রক্ত চলাচল ভাল ভাবে হয় না। এর ফলে বুকে ব্যথা হয়। এই বুকে ব্যথাকে আমরা মেডিক্যাল পরিভাষায় বলে থাকি ‘অ্যানজাইনা’।
লাইফস্টাইল নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি
আমি আর একটা কথা উল্লেখ করব, ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণা কয়েক বছর আগে বলেছিল, এলডিএল-এর সঙ্গে হার্টের অসুখের সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই গবেষণা নিয়ে অনেক বিতর্কও রয়েছে। বরং বছরের পর বছর ধরে চলে আসা গবেষণা ও রোগের গতিপ্রবাহ আমাদের এটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, যে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে হার্টের অসুখের একটা বিরাট সম্পর্ক আছে। ফলে শরীরচর্চা করে, খাদ্যাভ্যাসে নিয়ন্ত্রণ রেখে, প্রয়োজনে ওষুধ খেয়ে কোলেস্টেরলের মাত্রা কম রাখা জরুরি। সেটাই হার্টের অসুখের ঝুঁকিও কমাবে।

এখন প্রশ্ন হল, যাদের কম বয়সেই কোলেস্টেরল বেশি, তাঁরা কী করবেন। আমি সর্বপ্রথম বলব, ডায়েটের দিকে নজর দিতে। অনেকেরই ধারণা নেই, কী ধরনের খাবারে কোন কোলেস্টেরল আছে। খুব সহজ কথায় বলতে গেলে, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাট কম খেতে হবে, না খেলেই ভাল। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল যে কোনও ধরনের রেড মিট, যাতে প্রাণিজ চর্বি বেশি থাকে। আবার ট্রান্সফ্যাট থাকে রাস্তার ধারের ভাজাভুজি, জাঙ্ক খাবারে। সহজে বললে, একই তেলকে যখনই বারবার ব্যবহার করা হয় কোনও কিছু ভাজার কারণে, তখন তা ট্রান্সফ্যাটে পরিণত হয়।
উল্টোদিকে, অলিভ অয়েল, সানফ্লাওয়ার অয়েল-- এই ধরনের ভেজিটেবিল অয়েলে খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা তুলনামূলক ভাবে কম। ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডও হার্টের জন্য উপকারী। এটি থাকে বিভিন্ন রকম বাদামে, সামুদ্রিক মাছের তেলে। তবে শুধু ভাল কোলেস্টেরল খেলাম আর খারাপটা এড়িয়ে গেলাম, সেটা করলেই হবে না। সুস্থ হার্টের জন্য কিন্তু নিয়মিত শরীরচর্চা প্রতিটি মানুষের অভ্যাস হওয়া উচিত। যে কোনও বয়সের মানুষেরই দিনের অল্প একটু সময় বার করে ঘাম ঝরানোর কোনও বিকল্প নেই।
