সচেতনতা নেই তেমন, নেই এ অসুখের প্রকট উপসর্গও। তার উপরে হু হু করে বদলে যাচ্ছে লাইফস্টাইল, বাড়ছে ওবেসিটি-সহ নানা সমস্যা। আর সেই সুযোগেই কঠিন অসুখ থাবা বসিয়েছে নারীশরীরের অত্যন্ত জরুরি ও সংবেদনশীল অঙ্গ ডিম্বাশয় বা ওভারিতে। ওভারিয়ান ক্যানসার বাড়ছে দ্রুত। এই সেপ্টেম্বর মাস ওভারিয়ান ক্যানসার সচেতনতার মাস, ওভারিয়ান ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার মাস। এ মাসেই তাই এ নিয়ে দ্য ওয়ালে বিস্তারিত আলোচনায় ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তী, কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট।
দ্য ওয়াল: ওভারির কাজ কী? এত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কেন এই অঙ্গ?
ডক্টর: মহিলাদের রিপ্রোডাক্টিভ সিস্টেমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দুটি ডিম্বাশয় বা ওভারি। কারণ এখানেই ডিম্বাণু উৎপাদিত হয়, যা নিষিক্ত হওয়ার ফলে নতুন প্রাণ সৃষ্টি হয়। এই ডিম্বাণু উৎপাদনের কারণেই মেনস্ট্রুয়েশন সাইকেল নিয়মিত হয় মেয়েদের। অনেকেরই ধারণা আছে, মেনোপজ় হয়ে গেলে অর্থাৎ ডিম্বাণু তৈরি বন্ধ হয়ে গেলে, মেনস্ট্রুয়েশন সাইকেল ক্লোজ় হয়ে গেলে বুঝি নারীশরীরে ওভারির আর কোনও কাজ নেই। তা কিন্তু নয়। সন্তান উৎপাদনই একমাত্র কাজ নয় ওভারির। এটা আদতে হরমোনের একটা ডিপো। সেই হরমোন হাড়ের ক্ষয় রোধ করে, শরীরের ক্যালসিয়াম ব্যালেন্স ঠিক রাখে। ফলে সুস্থ ওভারির গুরুত্ব আজীবন এবং অপরিসীম।
দ্য ওয়াল: ওভারির সমস্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। কেন?
ডক্টর: আগে সচেতনতাই অনেক কম ছিল, সমস্যা ধরাই পড়ত না। এখনও ধরা পড়র সংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়, কারণ ওভারির অসুবিধা এমনকি ক্যানসারেরও তেমন প্রকট কোনও লক্ষ্ণণ থাকে না। এখন আমাদের লাইফস্টাইল অনেকটাই বদলে গেছে। ওবেসিটির সমস্যা বেড়েছে। ফিজিক্যাল অ্যাকটিভিটি কমেছে। তার উপর দেরি করে বিয়ে করা ও দেরি করে সন্তানধারণ করা মহিলাদের সংখ্যা বাড়ছে। এর ফলে ওভারির সমস্যাও বাড়ছে, তা থেকে ক্যানসারও হচ্ছে।

দ্য ওয়াল: ওভারিয়ান ক্যানসারে ভারত বিশ্বের নিরিখে কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে?
ডক্টর: পুরো পৃথিবীতে মোট ওভারিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত মহিলাদের মধ্যে ভারত আছে সাত নম্বরে। আর ভারতে মহিলা যত ধরনের ক্যানসার হয়, তাতে তিন নম্বরে আছেন ওভারিয়ান ক্যানসারে আক্রান্ত মহিলারা। এই তিন নম্বরে মানে কিন্তু সংখ্যাটা অনেকটা। আমাদের জনসংখ্যা এত বেশি, তার নিরিখে ওভারিয়ান ক্যানসারে ভোগা মহিলার সংখ্যা বিশাল। আর তেমন লক্ষ্ণণ নেই বলে, সচেতনতা কম বলে, সামাজিক লোকলজ্জা এ দেশে অনেক বেশি বলে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রোগীরা এসে পৌঁছচ্ছেন ক্যানসারের অ্যাডভান্সড স্টেজ নিয়ে।

দ্য ওয়াল: ওভারির ক্যানসারের লক্ষ্মণগুলো কী কী?
ডক্টর: সবচেয়ে মুশকিল হল, নির্দিষ্ট কোনও লক্ষ্ণণ নেই এই ক্যানসারের। আমরা সেই জন্য বলি, BEAT শব্দটা মনে রাখতে। এই শব্দের অক্ষরগুলি ধরে খেয়াল রাখতে হবে। B মানে ব্লোটিং সেনসেশন। মানে সামান্য একটু খেয়েই পেটটা ভরে যাচ্ছে। ভার লাগছে। E মানে ইটিং লেস। খিদে অনেকটা কমে যাওয়া ওভারিয়ান ক্যানসারের সিনড্রোম হতে পারে। A মানে অ্যাবনর্মাল পেইন। কোনও বিশেষ জায়গায় বা কারণে নয়, কিন্তু পেটে অস্বস্তি, সারাক্ষণ চিনচিনে ব্যথা— এটা একটা লক্ষ্মণ হতে পারে ওভারিয়ান ক্যানসারের। সবশেষে T অর্থাৎ ট্রাবেল উইথ ব্লাডার। ঘনঘন প্রস্রাব পাওয়া, একটু জল খেলেই চাপ পড়া— এই সব লক্ষ্মণ এর ওভারিয়ান ক্যানসারের সূচক হতে পারে।

তবে আমি এই সব ক’টার সঙ্গে আর একটা T যোগ করব। টক টু ইয়োর ডক্টর। কারণ এই লক্ষ্ণণগুলোর কোনওটা হওয়া মানেই যে ক্যানসার তা নয়, আবার সব ক’টা কমবেশি হলে তা অগ্রাহ্য করাও অনুচিত। তাই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন যে কোনও সমস্যা হলেই। গায়নোকোলজিস্টকে দেখান। সমস্যা হলে আমাদের কাছে আসুন।
দ্য ওয়াল: ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি কী কারণে বাড়ে?
ডক্টর: সন্তানধারণ করা ওভারির একটা প্রাকৃতিক নিয়ম। সন্তানধারণ না করা ওভারিয়ান ক্যানসারের একটা বড় ঝুঁকি। কারণ নারী শরীরে যে ইস্ট্রোজেন হরমোন তৈরি হয়, তা সন্তানধারণের ফলে ব্রেক হয়, যেটা সুস্থ ওভারির জন্য জরুরি। সন্তানধারণ না করলে তা হচ্ছে না। ফলে সেটা অতিরিক্ত ইস্ট্রোজেন ওভারির সেলগুলোকে কার্সিনোজেনিক করে তুলতে পারে।

দ্য ওয়াল: আগেকার দিনে এ ধরনের সমস্যায় দিদিমা-ঠাকুমারা বলতেন, ‘তাড়াতাড়ি বাচ্চা নিয়ে নিলে ঠিক হয়ে যাবে।‘ সত্যিই কি তাই?
ডক্টর: আমাদের জীবনযাত্রা এখন একটা ইঁদুর দৌড়ের মধ্যে দিয়ে চলছে। এখন আমরা আগে সেটল হতে চাই, তার পরে বিয়ের কথা ভাবি। সেটা করতে করতে অনেক মহিলার ৩০ বছর বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, বাচ্চা হতে হতে হয়তো ৩৫। ফলে তাঁদের শরীরে দীর্ঘ সময় ইস্ট্রোজেন হরমোন কাজ করে চলেছে। এটা ওভারির ক্যানসারের ঝুঁকি অবশ্যই বাড়াচ্ছে।
তাড়াতাড়ি বিয়ে করে তাড়াতাড়ি সন্তানধারণ করার নিদান কোনও চিকিৎসকই দিতে পারেন না, আমিও দিচ্ছি না, কিন্তু মা-ঠাকুমাদের সেই কথাটা একেবারে অবৈজ্ঞানিক বা ভিত্তিহীন ছিল একথা বলা যায় না। তার উপর এখনকার লাইফস্টাইলের সমস্যাও বেশ বাড়ছে। হরমোনের ব্যালেন্স নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, যা ওভারিয়ান ক্যানসারের সূচক হয়ে উঠছে।

দ্য ওয়াল: ওভারির ক্যানসার কি বংশপরম্পরায় ঝুঁকি বাড়ায়?
ডক্টর: ওভারিয়ান ক্যানসারের যত কেস আসে, তার ৫ থেকে ১০ শতাংশ মহিলার আগের প্রজন্মে ওভারিয়ান ক্যানসারের ইতিহাস পাওয়া যায়। এর কারণটা হল নারীশরীরের বিআরসিএ জিন। এর দুরকম প্রকারভেদ আছে, বিআরসিএ ১ এবং বিআরসিএ ২। কারও শরীরে যদি বিআরসিএ ১ জিন পজিটিভ থাকে, তাহলে তাদের ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি ৬০-৭০ শতাংশ বাড়ে। ব্রেস্ট ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে ৫০ শতাংশ। এই জিন ছিল বলেই হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি ম্যাস্টেক্টোমি করিয়ে সারা বিশ্বকে ভাবিয়ে তুলেছিলেন। আর বিআরসিএ ২ জিন থাকলে ঝুঁকি বাড়ে বয়সকালে গিয়ে।

দ্য ওয়াল: তথ্য বলছে, ওভারি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায় ট্যালকম পাউডার। সত্যি?
ডক্টর: একটি বহুজাতিক সংস্থা নির্মিত শিশুদের ব্যবহারের ট্যালকম পাউডারের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উঠেছে। কারণ দেখা গেছে, তাতে অ্যাসবেস্টাস গুঁড়োর পরিমাণ বেশি রয়েছে। ফলে প্রাইভেট পার্টসে ওই পাউডার কেউ ব্যবহার করলে সেটা জরায়ু, ফ্যালপিয়ান টিউব হয়ে ওভারিতে গিয়ে জমতে পারে। এটা ওভারিয়ান ক্যানসারের বড় কারণ। তাই আমি সাজেস্ট করব প্রাইভেট পার্টসে পাউডার ব্যবহারই না করতে। আর অবশ্যই ট্যালকম পাউডার কেনার সময়ে তার উপাদানগুলি পরীক্ষা করে দেখে নিন, অ্যাসবেস্টস আছে কিনা। থাকলে কিনবেন না।
দেখুন, কী বলছেন ডাক্তারবাবু।
https://www.facebook.com/242319389675391/videos/701939237200505
দ্য ওয়াল: ওভারিয়ান ক্যানসারের স্টেজিং কীভাবে হয়?
ডক্টর: ওভারিয়ান ক্যানসারের চারটে স্টেজ হয়। প্রথম স্টেজের অর্থ হল, কার্সিনোজেনিক কোষগুলো ওভারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। দ্বিতীয় স্টেজের অর্থ, ওভারির বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে সংক্রমণ, তবে তা পেলভিক অংশের মধ্যেই রয়েছে। তৃতীয় স্টেজ মানে লিম্ভনোডগুলি আক্রান্ত। সর্বশেষ অর্থাৎ চতুর্থ স্টেজে পৌঁছে যাওয়ার অর্থ হল, ক্যানসারের সংক্রমণ অন্য কোনও জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। লিভার বা ফুসফুস আক্রান্ত হয়েছে ওভারি থেকে। এখন যত আগে ওভারিয়ান ক্যানসার ধরা পড়বে, তা সারার সম্ভাবনা ততই বেশি। আমরা এখন স্টেজ থ্রি-তেও আশা ছাড়ছি না।

দ্য ওয়াল: ওভারিয়ান ক্যানসার কি নিরাময়যোগ্য?
ডক্টর: ক্যানসারের ট্রিটমেন্ট অনেকগুলি স্তরে চলে। অস্ত্রোপচার ও কেমো— এই দুইই একসঙ্গে নিয়ম মেনে চালানো গেলে ওভারিয়ান ক্যানসার পুরো না সারলেও, রোগী সুস্থ থাকতে পারেন নিয়মিত চিকিৎসায়। অবশ্যই সময়ান্তরে ফলোআপ করাতে হবে।
দ্য ওয়াল: ওভারিয়ান ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার কতটা কার্যকর? পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কতটা?
ডক্টর: অস্ত্রোপচার করে বিশেষ অঙ্গ বা প্রত্যঙ্গ বা দেওয়া ওভারিয়ান ক্যানসারের অন্যতম চিকিৎসা। তার পাশাপাশি বিশেষ মেশিনের মাধ্যমে শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে কেমোথেরাপি চালানো হচ্ছে। ড্রাগ দেওয়া হচ্ছে নিয়ম মেনে, রোগীর শরীরের পজিশন বদলে। যার ফলে কার্যকারিতা বেড়ে যাচ্ছে অনেক। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অবশ্যই আছে। সব রোগীর উপর সব থেরাপি প্রয়োগ করাও যায় না। প্রশিক্ষিত অঙ্কো সার্জেন ছাড়া এই অস্ত্রোপচার কেউ করতেও পারেন না। ৭০ বছর পেরিয়ে গেলে আমরা এই সার্জারি বা থেরাপি করাতে বারণ করি।
:max_bytes(150000):strip_icc()/125785141-56a0e5f43df78cafdaa62f54.jpg)
দ্য ওয়াল: পলিসিস্টিক ওভারিয়ান ডিজিজ অর্থাৎ পিসিওডি এখন প্রায় ঘরে ঘরে। অনেক কম বয়স থেকেই হচ্ছে। কেন?
ডক্টর: কম বয়সের মেয়েদের মধ্যে পিসিওডি বাড়ছে একথা সত্যি। কিন্তু এটাও ঠিক, পিসিওডি হওয়া মানেই ক্যানসার নয়। যারা পিসিওডি-তে ভোগে তাদের মধ্যে ১৫ শতাংশ মহিলার ঝুঁকি থাকে ওভারিয়ান ক্যানসার হওয়ার। এই পিসিওডির একটা অন্যতম বড় কারণ লাইফস্টাইল ডিজঅর্ডার। বাচ্চরা খেলছে না, বেশি সময় মোবাইলে আসক্ত থাকছে। জাঙ্ক ফুড খাচ্ছে। এগুলির দিকে একটু নজর দিয়ে প্রপার ডায়েট, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম— এই সমস্ত মেনে চললে পিসিওডি এড়ানো যেতে পারে।

দ্য ওয়াল: ওভারির ক্যানসার রোখা যেতে পারে কীভাবে?
ডক্টর: হেলদি লাইফস্টাইলের কথা বারবারই বলব সবার আগে। তার পাশাপাশি, খুব বেশি দেরি না করে সন্তানধারণ করা নারীশরীরের পক্ষে কার্যকর। বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ালে ওভারিয়ান ক্যানসারের সম্ভাবনা কমে। সে কারণেই বেশি করে স্তন্যপান করাতে বলি আমরা। উন্নত মানের থার্ড জেনারেশন ওরাল কনট্রাসেপ্টিভ পিল ব্যবহার করা ভাল। যৌনাঙ্গের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে হবে। আর সবচেয়ে জরুরি, সচেতনতা। কোনও অসুবিধা বা সমস্যা বুঝলেই ডাক্তার দেখান। কোনও দ্বিধা রাখবেন না।
দ্য ওয়াল: ওভারিয়ান ক্যানসার সচেতনতার মাস সেপ্টেম্বর। কোনও বিশেষ বার্তা দিতে চান?
ডক্টর: কোনও রকম স্ত্রীরোগ লুকোবেন না। লজ্জা পাবেন না। ওভারির চিকিৎসা এখন খুবই উন্নত। অনেক বেশি সাফল্য মিলছে। কোনও রকম অসুবিধাতে ডাক্তারের কাছে যান, তিনি বললে অঙ্কোলজিস্ট দেখান। প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন, ভরসা রাখুন। ওভারিয়ান ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইটা একা নয়, সবাই মিলে করতে হবে। রোগী, রোগীর পরিবার, সমাজ—সবাই একসঙ্গে লড়তে হবে। এক কথায় আমি বলি, “Let us all rise above cancer.”
