
শেষ আপডেট: 10 June 2020 18:30
পুরুষ হোক বা নারী, বয়স যাই হোক না কেন, কোভিড সংক্রমণের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না কেউই। এই মারণ ভাইরাস তার চরিত্র এমনভাবে বদলাচ্ছে যে রোগের ধরনে যেমন বদল আসছে তেমনি রোগের উপসর্গেও দেখা যাচ্ছে নানা রকমের পরিবর্তন। একসময় গবেষকরা বলেছিলেন, ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তিদের ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। বিশেষত যদি হাইপারটেনশন, কার্ডিওভাস্কুলার রোগ, কিডনি বা ফুসফুসের ক্রনিক রোগ থাকে, তাহলে সংক্রমণ ধরতে বেশি সময় লাগবে না। তবে যত দিন যাচ্ছে গবেষণার তথ্যেও নতুন নতুন সংযোজন হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণও পাল্টাচ্ছে। সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, প্রবীণরা শুধু নয় কমবয়সী এমনকি শিশুদেরও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কোনও অংশেই কম নয়। এখন শিশুদের শরীরে ভাইরাস সংক্রমণের প্রভাব কেমন এবং কতটা হবে সেটাই গবেষণার বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতে দেখা যাচ্ছিল বাচ্চাদের শরীরে ভাইরাস পজিটিভ হলেও সংক্রমণ মৃদু। তবে ইদানীং শিশুদের শরীরেও এমন কিছু উপসর্গ দেখা যাচ্ছে যা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ভাইরাসের সংক্রমণ থেকেই জন্ম নিচ্ছে অন্যান্য রোগ, তার নানা লক্ষণ।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বেশ কিছু কোভিড পজিটিভ শিশুর শারীরিক অবস্থা এমন সঙ্কটজনক পর্যায়ে পৌঁছয় যে তাদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করতে হয়। গবেষকদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ভাইরাস সংক্রামিত হওয়ার পরে মাল্টি-সিস্টেম ইনফ্ল্যামেটরি সিন্ড্রোমে (Multi-System Inflammatory Syndrome)আক্রান্ত হয়েছে শিশুরা।
বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষের দেহকোষের বাহক বা রিসেপটর প্রোটিনের (Receptor Protein) সঙ্গে জোট বেঁধে সার্স-কভ-২ ভাইরাল স্ট্রেনের স্পাইক প্রোটিন দেহকোষে ঢুকে পড়ছে। এই ভাইরাল প্রোটিনই শরীরে সংক্রমণ ছড়ানোর জন্য দায়ী। যে বাহক প্রোটিনকে তারা কোষে ঢোকার রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করছে সেই ACE-2 প্রোটিন নানা অঙ্গের কোষেই থাকতে পারে। সুতরাং শরীরে যেসব অঙ্গের কোষে এই বাহক প্রোটিনকে চিহ্নিত করতে পারবে ভাইরাস, সেখানেই পৌঁছে গিয়ে কোষে ঢুকে সংখ্যায় বাড়তে থাকবে। বিজ্ঞানীদের অনুমান হার্ট, লিভার, কিডনি, খাদ্যনালীর কোষেও এই বাহক প্রোটিনকে খুঁজে পেয়েছে সার্স-কভ-২। তাই শুধু ফুসফুস নয়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ আক্রান্ত হচ্ছে ভাইরাসের সংক্রমণে।
সংক্রমণ গভীরে ছড়িয়ে পড়লে শ্বাসের সমস্যা বেড়েছে। সেই সঙ্গে বুকে চাপ, ব্যথা দেখা দিয়েছে শিশুদের। অনেকের ঠোঁটে নীলচে ছোপ পড়তেও দেখা গেছে, সেই সঙ্গে অসহ্য পেটে যন্ত্রণা। আইসিইউতে ভর্তি করে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয়েছ অনেককেই।
শিশুদের উপর করোনার প্রভাব কতটা এবং কেমন হতে পারে সেই সংক্রান্ত গবেষণার রিপোর্ট প্রকাশিত হয় আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের জার্নালে। চিন ও সিঙ্গাপুরের বিজ্ঞানীরা ১০৬৫ জন শিশুর উপর সমীক্ষা চালিয়ে মোট ১৮টি গবেষণার রিপোর্ট সামনে আনেন। সেইসব রিপোর্টে বলা হয়, বেশিরভাগ শিশুদের ক্ষেত্রেই দেখা গেছে সংক্রমণ মৃদু। হাল্কা জ্বর বা সর্দি-কাশির মতো উপসর্গ রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে আবার মাথা ব্যথা, পেটের সমস্যা, ঝিমুনিভাবও দেখা গেছে। এমন উপসর্গ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গেই ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে শিশু বা কম বয়সীরা কোভিড সংক্রমণের কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। চিন ও ইতালিতে অনেক শিশুর মধ্যেই এমন সংক্রমণ দেখা গেছে। আবার অনেক বাচ্চার কোভিড সংক্রমণ ধরা পড়ার আগে পায়ের ত্বকে ঘা, লালচে-বাদামি র্যাশ দেখা গেছে। ডার্মাটোলজিস্টরা বলেছেন, এমন উপসর্গ দেখলেই সতর্ক হতে হবে, কারণ এটাই হল বিপদসঙ্কেত। কারণ এর পরের পর্যায়তেই সংক্রমণ আরও মারাত্মক হয়ে ছড়িয়ে পড়বে শরীরে।