তিয়াষ মুখোপাধ্যায়
বাড়িতে ছোট বাচ্চা আছে অথচ পেটে ব্যথার সমস্যা নেই তার, এমনটা বলতে গেলে হয়ই না। সমস্ত বয়সের বাচ্চাই নানা ধরনের পেটে ব্যথার সমস্যায় ভুগে থাকে। কখনও সে বলতে পারে, কখনও বলতেই পারে না। কখনও আবার আন্দাজ করা যায় ব্যথার কারণ, কখনও তাও যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘরোয়া উপায়েই বাচ্চার ব্যথা কমে গেলেও, অনেক সময়েই সমস্যার শিকড় থাকে গভীরে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে বোঝা যায় সমস্যা। তবে বাচ্চা যে ডাক্তারকে সবসময় বোঝাতে পারে নিজের কষ্টটা, তেমন আশা না করাই ভাল। অনেক সময় বাবা-মাও বুঝে উঠতে পারেন না, কোন ব্যথাকে কতটা গুরুত্ব দেবেন। তখন কী করণীয়?
এই সমস্ত বিষয় নিয়েই আলোচনা করলেন কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট ডক্টর সঞ্জয় ব্যানার্জী।
ব্যথা যখন যেমন-তেমন
বাচ্চাদের কিছু কমন পেটে ব্যথার কারণ রয়েছে। হঠাৎ করে একটু বেশি খেয়ে নিলে, অনেকক্ষণ টয়লেট চেপে রাখলে, কোনও বিষয় নিয়ে টেনশন হলে, হয়তো পরীক্ষার আগে বা স্টেজে ওঠার আগে-- এসব সময়ে ব্যথা একটা সাধারণ কারণ। এসব ক্ষেত্রে বাচ্চা একটু জল খেলে, টয়লেট করলে বা রেস্ট নিলে বেশির ভাগ সময় ব্যথা কমে যায়।
আবার যেসব বাচ্চা আরও ছোট, কথা বলতে পারে না, তারাও প্রায়ই ব্যথায় কাঁদে। সে সময়েও ব্যথার কারণ বোঝা যায় না বেশির ভাগ সময়ে, কিন্তু সে সমস্ত ব্যথাও খুব চিন্তার নয়। হয়তো নতুন কোনও প্রোটিন খাওয়ার কারণে বা অন্য কোনও কারণে ব্যথা হয়। একে কলিক ব্যথা বলে। এ ব্যথাও সাধারণ কিছু ওষুধে বা অনেক সময়ে ওষুধ ছাড়াই সেরে যায়। বছর খানেক এমন সমস্যা থাকে বেশির ভাগ বাচ্চারই।

জল, দুধ বা বাইরের কোনও খাবার খেলে এই ব্যথা হতে পারে। অনেক বাচ্চা কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগে, তিন-চার দিন ছাড়া পটি করে। তাদেরও ব্যথা হয়। তবে বাচ্চা যদি প্রায়ই ব্যথার কথা বলে, সে ব্যথা যদি তাকে কষ্ট দেয়, বাবা-মায়ের মনও খুঁতখুঁত করে, তখন সময় নষ্ট না করে ডাক্তার দেখানোই ভাল।
ব্যথা যখন খুব বেশি
ডাক্তারবাবু বললেন, "তীব্র পেটে ব্যথার কারণ বলতে আমরা যা যা দেখি বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সেগুলি হল, অ্যাপেনডিসাইটিস, প্যাংক্রিয়াটাইটিস, ওভারি সিস্ট বা কিডনি স্টোন-- ইত্যাদি। কোনও বাচ্চা পেটে ব্যথা নিয়ে এলে আমরা আগে সিম্পটমগুলো বোঝার চেষ্টা করি। ডায়রিয়া হচ্ছে কিনা, পেট ফুলে আছে কিনা, বমি হচ্ছে কিনা, কোনও ক্র্যাম্পস হচ্ছে কিনা--এই সব। সেই সঙ্গে জরুরি হল, বাচ্চার পেটের ঠিক কোনখানটায় ব্যথা হচ্ছে, তা জানা। কারণ এই লোকেশনটা জানতে পারলে ব্যথার কারণ অনুসন্ধানও সহজ হয়।"

তাঁর কথায়, "আমাদের সাধারণ অভিজ্ঞতা বলছে, বাচ্চারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নাভির চারপাশে ব্যথার কথা বলে। এই ধরনের ব্যথার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কোনও খারাপ কারণ দেখা যায় না। এগুলো 'ফাংশনাল পেন' হয়ে থাকে প্রায়ই। অর্থাৎ যার কোনও অর্গানিক বা স্ট্রাকচারাল কারণ নেই, শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা নেই। তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্রিয়াকর্ম সবই স্বাভাবিক, অথচ তার ব্যথা হচ্ছে। এ নিয়ে বাবা-মারা চিন্তা করেন ঠিকই, তবে আমরা ডাক্তাররা বুঝি, হয় স্ট্রেস থেকে নয় কোনও খাবার গন্ডগোল থেকে হয়েছে। আমরা বলি, এসময়ে বাচ্চার মনটা একটু অন্যমনস্ক করতে, তাকে জল খাওয়াতে, বিশ্রাম দিতে, গল্প করতে-- এই সব।"
পেটের নীচে ডানদিকের ব্যথা
এই ব্যথা কিন্তু সিরিয়াস হতে পারে বলেই জানালেন ডাক্তারবাবু। খুব বেশি ব্যথা, সেই সঙ্গে অল্পস্বল্প বমি বা জ্বর থাকলে, তা অ্যাপেনডিক্সের সমস্যা হতে পারে। নাভি থেকে পেটের ডানদিকে ব্যথা বাড়ে, অনেক সময় কুঁচকি পর্যন্ত ছড়ায়। এ ব্যথার ধরন অনেকটা খিঁচ ধরে থাকা। সাধারণত ১০ বছরের নীচের বাচ্চাদের অ্যাপেনডিসাইটিস হওয়ার কথা নয়, এটা মূলত টিনএজের পরেই হয়। এই ব্যথা যদি বাড়ে এবং পরীক্ষায় ধরা পড়ে সমস্যা, তাহলে কিন্তু ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে অপারেশন করিয়ে ফেলতে হবে। কারণ এ ব্যথা ফেলে রাখা উচিত নয়।

ছোট মেয়েদের ব্যথা
মেনস্ট্রুয়াল সাইকেল চলাকালীন একটা ব্যথা হয় অনেক কিশোরী মেয়ের। এই ব্যথা অল্পবিস্তর স্বাভাবিক হলেও, অনেক সময়ে ওভারি সিস্টের কারণে ব্যথার তীব্রতা বেশি হয়। অনেক সময়ে পেট থেকে পিঠের দিকেও এই ব্যথা ছড়িয়ে পড়ে। একটা আড়ষ্ট ভাব থাকে তলপেটে। পরীক্ষায় সিস্ট ধরা পড়লে, তার তীব্রতা বুঝে চিকিৎসা দরকার। অনেক সময়ে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যথা কমেও যায়।

পেটের বাঁ দিকের ব্যথা
সাধারণত কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে এই ব্যথায় ভোগে বাচ্চারা। খবর নিলে দেখা যায়, এরা হয়তো কয়েক দিন ছাড়া ছাড়া পটি করে, জল কম খায়, খেলাধুলো বিশেষ করে না। এদের সহজপাচ্য খাবার খাওয়ানো এবং রোজ মলত্যাগ করানোর ব্যবস্থা করা বেশি জরুরি। তবে কিছু ক্ষেত্রে এই ব্যথার কারণ হয় প্যাংক্রিয়াটাইটিস। এই অসুখ কিন্তু খুবই মারাত্মক। ভয়ের বিষয় হল, ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এই অসুখ খুবই কমন। বড়দের ক্ষেত্রে সাধারণত অ্যালকোহলের কারণে এই অসুখ হলেও, বহু বাচ্চার জন্মগত জেনেটিক ডিফেক্ট থেকে এই অসুখ হয়। এবং তা বারবার ফিরেও আসে। এটা হলে কিন্তু ভয়ংকর ব্যথা হবে। সে ব্যথা পেট থেকে পিঠের দিকে যাবে। সঙ্গে বমি হতে পারে, পেট টাইট হয়ে থাকবে। খুব দ্রুত শরীরের অবনতি হবে বাচ্চার প্যাংক্রিয়াটাইটিস হলে হাসপাতালে ভর্তি হতেই হয় সাধারণত।

পেটের ওপর দিকে ব্যথা
সাধারণত দেখা যায়, উল্টোপাল্টা খাওয়াদাওয়ার জন্য বদহজম হলেই এই ব্যথাটা হয়। এমন হলে বাচ্চার পেটকে রেস্ট দিতে হবে, হাল্কা স্যুপ, বিস্কুট জাতীয় খাবার খাওয়াতে হবে। আবার পেটের ডান দিক ঘেঁষে ব্যথা হলে গলব্লাডারে স্টোন হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। সাধারণত বাচ্চাদের জন্য এ অসুখ খুব পরিচিত না হলেও, এখনকার দিনে নানা কারণে বাচ্চাদের গলব্লাডারে স্টোন হতে পারে। আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করে এই ব্যথার কারণ নিশ্চিত হয়ে নেওয়া ভাল।

নীচের দিকে ব্যথা
এখনকার দিনে কিডনি স্টোনের সম্ভাবনাও বাড়ছে বাচ্চাদের। এই ব্যথাও অতি তীব্র হয়। পিঠের দিক থেকে নীচের দিকে ব্যথাটা আসে। এমন সমস্যা হলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে সময় নষ্ট না করে।
ভয় পাবেন না, বাচ্চার ব্যথাকে চিনুন
বড় উপসর্গ থাকলে আলাদা ব্যাপার, তবে বাচ্চাদের পেটের সাধারণ ব্যথাগুলো চিনে রাখলে দুশ্চিন্তা কমবে। মাঝেমাঝেই যদি ব্যথা হয়, তাহলে বাচ্চার ডায়েটে, রুটিনে নজর দিন। বাচ্চার স্বাস্থ্যকর খাবার ও খেলাধুলোর সঙ্গে আপস করবেন না। বাচ্চার নিয়মিত পেট পরিষ্কার করার অভ্যেস জরুরি। খেয়াল রাখবেন তার কোনও রকম মানসিক চাপ পড়ছে কিনা। এসবই কিন্তু ছোটখাটো পেটে ব্যথার কারণ হতে পারে।

তবে হ্যাঁ, সাধারণ ব্যথা ভেবে বড় অসুখকে অগ্রাহ্য করে যাওয়াও কাজের কথা নয়। ঘনঘন তীব্র ব্যথা হলে তাকে 'রেড ফ্ল্যাগ' সাইন বলেই ধরতে হবে। যদি ব্যথার জন্য ঘুম ভেঙে যায় বাচ্চার, তাহলে তা বড় কোনও অসুখের ইঙ্গিত হতে পারে।