
শেষ আপডেট: 27 March 2024 15:57
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোটবেলায় শেখানো হত রোজ রাতে শুয়ে যাওয়ার আগে ব্রাশ করা ভাল। এই অভ্যাসের যে উপকারিতা কত, তা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। এখনকার সময় আমাদের খাওয়াদাওয়ার অভ্যাস যেমন, তাতে মুখের স্বাস্থ্য (Oral Health) ভাল রাখাটা খুবই জরুরি হয়ে গেছে। না হলেই জিভে ঘা, দাঁতের ফাঁকে ঢুকে থাকা খাবার থেকে ক্যাভিটি, মাড়িতে সংক্রমণ—নানা কিছুই হতে পারে।
অনেক সময় দেখবেন, মুখের ভেতরটা কেমন যেন খটখটে শুকনো। লালা তৈরিই হচ্ছে না।জিভে জ্বালা, কিছু খেতে গেলে যেন জ্বালাপোড়া করছে। ঠোঁটের কোণ শুকিয়ে যাচ্ছে, সেখানেও চিড়বিড়ে জ্বালা। এমনসব উপসর্গ দেখা দিলে বিন্দুমাত্র দেরি করা ঠিক হবে না। কোনও বড় অসুখের পরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এমন রোগ হতে পারে, ওষুধের সাইড এফেক্টস বা মাউথ ওয়াশ থেকেও হতে পারে। আর এখন তো দাঁতের সমস্যা ঘরে ঘরে। বয়স্করা শুধু নয়, দাঁতের সমস্যায় এখন জেরবার ছোটরাও। কখনও দাঁতের গোড়ায় খাবার জমে ব্যথা হচ্ছে, আবার কখনও রাতবিরেতে টনটনিয়ে উঠছে মাড়ি। ঠিকমতো ব্রাশ না করলে বা মুখের ভেতর পরিষ্কার না করলে দাঁতের কোণায় খাবার জমতে জমতে তা শক্ত পাথরের মতো হয়ে যায়। তখন সেখানে জীবাণুরা বাসা বাঁধে।
চিকিৎসকেরা মুখের ভিতরের অংশের পিএইচের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য বেশি করে জল খেতে পরামর্শ দেন। এই জল মুখের ভিতর লালারস ক্ষরণের পরিমাণও নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি, খাবার খাওয়ার পর যদি কোনও সূক্ষ্ম কণা দাঁতের ফাঁকে আটকে গিয়ে থাকে, তা-ও পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। আমরা যত বেশি ত্বক, চুল, নখের পরিচর্চা করি, ততটা সময় মুখের স্বাস্থ্য ভাল রাখার জন্য সময় দিই না। ফলে যা হওয়ার তাই নয়। মুখে গুচ্ছের ব্যাকটেরিয়া, জীবাণু জমতে জমতে নানা অসুখবিসুখের কারণ হয়ে ওঠে। মুখের স্বাস্থ্য কীভাবে ভাল রাখা যায়, কী কী করতে হবে বা কী কী নয়, সে নিয়ে আলোচনা করেছেন হাওড়া আইএলএস হাসপাতালের সহকারী ওরাল ও ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জন ডা. অক্ষয় লাধানিয়া।
কী কী করবেন?
১) দাঁত ভাল আছে কিনা, ক্যাভিটি হচ্ছে কিনা, মাড়ির স্বাস্থ্য কেমন, আক্কেল দাঁত গজাচ্ছে কিনা, সবকিছুই চেকআপ করিয়ে নেওয়া জরুরি। ডাক্তারবাবু বলছেন, প্রতি ৬ মাসে অন্তত একবার ওরাল হেলথের চেকআপ করিয়ে নেওয়া জরুরি।
২) দিনে দু’বার ব্রাশ করতেই হবে। বিশেষ করে রাতে শুতে যাওয়ার আগে ব্রাশ করা মাস্ট।
৩) মুখের ভেতর জ্বালা, দাঁতে ব্যথা, জিভে ফুসকুড়ি হলে ফেলে রাখা ঠিক নয়। মুখের ভেতর যে কোনও সমস্যাতেই তাড়াতাড়ি চেকআপ করিয়ে নেওয়া জরুরি।
৪) কেমন ব্রাশ ব্যবহার করবেন সেটাও জরুরি। সাধারণত নরম ব্রাশ ব্যবহার করাই উচিত। ভাল ব্র্যান্ডের ব্রাশ কিনুন, দরকার হলে দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
৫) দাঁত মাজার জন্য আমরা নানারকম টুথপেস্টই কিনি। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে যেটা ভাল মনে হয় কিনে নিই। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, দাঁতের ধরন অনুযায়ী মাজন (toothpastes) বা টুথপেস্ট কেনা দরকার। কোন ধরনের টুথপেস্ট আপনার দাঁতের জন্য ভাল সেটা বুঝে কিনলে দাঁত ও মাড়ি ভাল থাকে।
মাড়িতে সমস্যা, ব্যথা থাকলে অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল টুথপেস্ট কিনতে হবে। গাম কেয়ার বা অ্যান্টি-জিনজিভাইটিস লেখা দাঁতের মাজন বেছে কিনবেন। দাঁতে ব্যথা, মুখে দুর্গন্ধ থাকলে সোডিয়াম লরেল সালফেট যুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে।
৬) হুড়োহুড়ি করে দাঁত মাজলে হবে না। উপরের ও নীচের পাটির দাঁত এবং মাড়িতে ভাল করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্রাশ করতে হবে। ‘সার্কুলার মোশন’-এ ব্রাশ করা উচিত। অন্তত ২-৫ মিনিট টানা ব্রাশ করুন।
৭) আমরা যখন খাই তখন খাবারের ছোট ছোট কণা দাঁতের ফাঁকে ঢুকে থাকে। কুলকুচি করলেও সেগুলো বেরোয় না। তাই দিনে একবার অন্তত ‘ডেন্টাল ফ্লস’ ব্যবহার করা চেষ্টা করতে হবে। ডেন্টাল ফ্লস যে কোনও ওষুধের দোকানেই কিনতে পাওয়া যায়। ভাল ব্র্যান্ডের ফ্লস কিনতে হবে।
৮) ভাল মানের মাউথওয়াশ ব্যবহার করতে হবে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মাউথওয়াশ যাতে ক্লোরোহেক্সাডাইন (chlorhexidine) আছে এমন দেখে কিনুন। দিনে একবার খাবার জলের সঙ্গে মিশিয়ে (1:1 অনুপাতে) মুখ কুলি করে নিন। এতে মুখে খারাপ ব্যাকটেরিয়া জমতে পারবে না, দাঁত ও মাড়ি ভাল থাকবে।
৯) বাচ্চাদের ভাল করে ব্রাশ করানো দরকার। বাচ্চাদের মুখের মাড়ি, জিভ, ঠোঁট এমনকী গালের ভিতরে এক ধরনের ফাঙ্গাস জন্মায়, যার নাম ‘ক্যানডিডা অ্যালবিক্যাপ’। এই ছত্রাকের সংক্রমণ হলে তা খুবই যন্ত্রণাদায়ক। তাই বাচ্চাদের মুখের স্বাস্থ্য ভাল রাখতেই হবে।
১০) বাজারে এখন ইলকট্রিক ব্রাশ পাওয়া যায়। পক্ষাঘাতে পঙ্গু রোগীদের বা যাদের হাত দিয়ে ব্রাশ করার সমস্যা আছে, তারা ইলেকট্রিক ব্রাশ ব্যবহার করতে পারেন।
কী কী করবেন না?
১) ভারী খাবার খেয়েই ঘুমোতে যাবেন না। বিশেষ করে চকোলেট, কেক, আইসক্রিম ইত্যাদি মিষ্টিজাতীয় খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমোবেন না।
২) তিন মাসের বেশি একটি ব্রাশ ব্যবহার না করাই ভাল। বিশেষ করে যদি কোভিড সারিয়ে ওঠেন বা আগে কোনওরকম ভাইরাল ইনফেকশন হয়ে থাকে, তাহলে তিনমাস অন্তর ব্রাশ বদল করা উচিত।
৩) দাঁত কনকন, মাড়িতে ব্যথা বা দাঁতের যে কোনও সমস্যা হলে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়াই ভাল। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস না করে বাজারচলতি কোনও ডেন্টাল মেডিসিন বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করবেন না।
৪) কোল্ড ড্রিঙ্কস, সোডা, প্যাকেটজাত ফ্রুট জুস না খাওয়াই ভাল। এতে দাঁতের এনামেল নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
৫) জর্দা, পানমশালা, পান, সুপারি ইত্যাদি তামাকজাতীয় জিনিস থেকে মুখে ঘা হয়। এইসব জিনিস এড়িয়ে চলাই ভাল। অতিরিক্ত ধূমপানও ক্ষতিকারক।
৬) খুব বেশি চিনিজাতীয় খাবার, চিজ বা প্যাকেটজাত বেকারির খাবার বেশি না খাওয়া ভাল।
৭) জিলাটিন দেওয়া খাবার বা চটচটে জেলি জাতীয় খাবার বেশি খেলেই ক্যাভিটির ঝুঁকি বাড়বে।
৮) খুব জোরে জোরে ব্রাশ করবেন না। নরম ব্রাশ দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ধীরে ধীরে ব্রাশ করা উচিত। না হলে মাড়িতে খোঁচা লেগে পরে ইনফেকশন হয়ে যেতে পারে।
মুখে ঘা-এর সমস্যাতেও ভোগেন অনেকে। সাধারণত পেটের অসুখ, ভিটামিনের অভাব ইত্যাদি কারণে মুখে ঘা হতে পারে (mouth ulcer) । ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি-এর অভাবে মুখে জ্বালাপোড়া ঘা হতে পারে। হরমোনের ভারসাম্যের অভাবের কারণেও মুখে ঘা হতে পারে। এ রকম কোনও সমস্যা দেখা দিলে ক’দিনের জন্য ঝাল, টক জাতীয় খাবার এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। মুখ সবসময় পরিষ্কার রাখতে হবে। পর্যাপ্ত জল খেতে হবে। যদি কখনও মাড়িতে সংক্রমণ হয়ে থাকে তাহলে জিঙ্ক সাইট্রেট, ট্রাইক্লোসান এবং ফাইরোফসফেট যুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহার করলে ভাল। এই ধরনের টুথপেস্ট ব্যাকটেরিয়া নষ্ট করে দেয়। তবে ডাক্তারের থেকে জেনে নিয়ে সবকিছু করা ভাল।