দ্য ওয়াল ব্যুরো: ওবোসিটি। এটি কোনও অসুখের নাম না হলেও, শরীরের একটি বিশেষ পরিবর্তিত অবস্থা বলা যেতে পারে। কিন্তু এই ওবেসিটি এমন একটা অবস্থা, যা আরও বহু রকম রোগকে খুব সহজে ডেকে আনে শরীরে। তাই এই ওবেসিটিই এখন চিন্তার বড় কারণ হয়ে উঠেছে চিকিৎসকদের কাছে। শুধু এ শহরে বা এ দেশে নয়, সারা বিশ্বেই এই ওবেসিটির সমস্যা যেন মহামারীর মতো আকার ধারণ করেছে।
তাই শারীরিক ভাবে সুস্থ ও সক্ষম থাকার এবং অন্যান্য কঠিন রোগ থেকে দূরে থাকার প্রথম ধাপ হল নিজের শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, এমনটাই বলছেন চিকিৎসকরা। নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ভাল খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা-- এসব মেনে চললে সাধারণত ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব কঠিন হয় না। কিন্তু এমনটা যদি সম্ভব না হয়, বা শরীরে যদি এমন কোনও হরমোন ইমব্যালেন্স হয় যা ওজন বাড়ায়, তখন তা ঝরিয়ে ফেলা জরুরি। আর ওজন কমানোর যা যা পদ্ধতি রয়েছে, তারই মধ্যে অন্যতম হল বেরিয়াট্রিক সার্জারি। ডায়েট-এক্সারসাইজের মাধ্যমে যখন সম্ভব হয় না ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, তখন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত বেরিয়াট্রিক সার্জেনের কাছে মিলতে পারে সুরাহা। এই নিয়েই আলোচনা করলেন অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশ্যালিটি হসপিটালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট বেরিয়াট্রিক সার্জেন, ডক্টর সুমন্ত দত্ত।
:max_bytes(150000):strip_icc()/gastric_bypass_surgery-f45766f8acc64393bd5f8371dc00b99c.jpg)
ওবেসিটি আদতে বিশ্বের কত বড় সমস্যা
১৯৭৫ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে স্থূল লোকের সংখ্যা প্রায় ৩ গুণ হয়েছে। ভারতবর্ষে এই মুহূর্তে স্থূল লোকের সংখ্যা কমপক্ষে ১৩-১৪ কোটি। আগের প্রজন্মে এত বেশি মোটা লোক দেখা যেত না। এটা বর্তমানে বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই জন্য ওয়ার্ল্ড হেলথ অরগানাইজেশন বা হু একটা স্টেটমেন্ট দিয়েছে, যে বর্তমানে খাদ্যাভাবে মানুষ যত না ভোগে, তার চেয়ে বেশি ভোগে ক্যালোরি বেড়ে যাওয়ার রোগে।
তার ওপরে এখন দীর্ঘ সময় লকডাউন চলেছে। এই সময়ে ওবেসিটির সমস্যা অনেকগুণ বেড়ে গিয়েছে। বাড়িতে প্রতিদিন শারীরিক কসরত ও পরিমিত খাবার খাওয়া ছাড়া এর হাত থেকে বাঁচা সম্ভব নয়।

ওবেসিটি কখন বোঝা যাবে
ওবেসিটি মাপতে দুটো প্যারামিটার লাগে। প্রথম হল ওজন, দ্বিতীয় উচ্চতা। ওজন মাপা হয় কিলোগ্রামে এবং উচ্চতা মাপা হয় সেন্টিমিটার বা মিটারে। এই দুইয়ের অঙ্কে বার করা হয় মানুষের শরীরের বেসাল মেটাবলিক ইনডেক্স বা বিএমআই। এখন সাধারণ মানুষের বিএমআই ১৮.৫-২৫ পর্যন্ত হওয়ার কথা। ২৫ থেকে ৩০ পর্যন্ত বিএমআই হলে, সেটাকে বলা হয় ওভারওয়েট। আর ৩০-এর উপর উঠলে তাকে বলা হয় স্থূলতা বা ওবেসিটি। এর বিভিন্ন ক্যাটেগরি আছে, যেমন লেভেল ১, লেভেল ২ ইত্যাদি। সেই অনুযায়ী মানুষের শরীরের স্থূলতা পরিমাপ করা হয়।
ক্রমবর্ধমান ওবেসিটি সমস্যার কারণ কী
প্রাথমিক কারণ হল, মানুষের রোজকার জীবনযাপন অনেক বদলে গেছে। শারীরিক কার্যক্রম কমে গেছে। দু-তিন জেনারেশন আগে সকলে সাইকেলে চেপে অথবা হেঁটে কাজের জায়গায় যেতে। কিন্তু এখন গাড়ি চড়েই যান বেশির ভাগ মানুষ। এমনকি গ্রামের দিকে টোটো বা অটো প্রচুর পরিমাণে চালু হয়ে গিয়েছে। এর ফলে শারীরিক পরিশ্রম কমে গেছে।

দ্বিতীয় কারণ হল, মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলেছে। আগে সাধারণ মানুষ এত প্যাকেটজাত খাবার খেত না। কিন্তু এখন বেশিরভাগই প্রসেসড ফুড।
এছাড়াও মোটা হওয়ার পেছনে জেনেটিক কারণ, কিংবা কোনও অসুখ থাকতে পারে। মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত মেদ জমা হয়, যা পরবর্তী কালে আর তাঁরা ঝরাতে পারেন না। সেটাও মোটা হওয়ার অন্যতম কারণ।
ওবেসিটি কমাতে অপারেশন কখন প্রয়োজন হয়?
ওবেসিটির জন্য বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। যেমন: হার্ট অ্যাটাক, হাই ব্লাড প্রেশার, শ্বাসকষ্ট, মহিলাদের অনিয়মিত পিরিয়ড। আর সবথেকে বড় বিষয়, ওবেসিটি ক্যানসারেরও অন্যতম কারণ। ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ু ক্যান্সার, কোলন ক্যানসার এগুলির পেছনে সরাসরিভাবেই ওবেসিটি দায়ী। সুতরাং, এই ওবেসিটির কারণে কোনও রকম অসুস্থতা থাকলেই অপারেশন প্রয়োজন।

অপারেশনের ক্ষেত্রে কি কোনও বয়সের সীমা রয়েছে?
১৮ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই অপারেশন অনায়াসে করা যেতে পারে। শারীরিকভাবে অপারেশনের প্রতিটা ক্রাইটেরিয়া যদি রোগী পূরণ করতে পারেন, তবেই কোনও সমস্যা থাকে না। তবে সার্জারির প্রয়োজন আছে কিনা সেটা দেখে নেওয়া খুব জরুরি। সেটা চিকিৎসক বলে দিলেও, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার রোগীর ওপরেই থাকে।
কোন কোন জিনিস মাথায় রাখলে ওবেসিটি এড়ানো যেতে পারে
প্যাকেটজাত খাবার খাওয়া সবার আগে বন্ধ করতে হবে। এছাড়া খাবারের পরিমাণ কমাতে হবে এবং নিজের সারাদিনের খাবারকে সাত-আট ভাগে ভাগ করে নিতে হবে। এর পাশাপাশি অতিরিক্ত মিষ্টি, ফ্রুট জ্যুস একেবারেই খাওয়া চলবে না। সবুজ শাকসবজি খাওয়া বাড়াতে হবে। প্রোটিন বাড়াতে হবে ও কার্বোহাইড্রেট কমাতে হবে।

সেইসঙ্গে শারীরিক কসরত করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত ৫ দিন ব্যায়াম করা প্রয়োজন। তাহলে ওবেসিটির থেকে দূরে তো থাকা যাবেই, তার পাশাপাশি শরীরও ফিট থাকবে।