
শেষ আপডেট: 27 November 2020 07:47
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের শিকড়ের টান। প্রকৃতি থেকে রূপ, রস, গন্ধ নিয়ে সমৃদ্ধ হয় মানব শরীর। বিকশিত হয় মন। আনুমানিক পাঁচ থেকে ছ’হাজার বছর আগের কথা। যখন প্রকৃতিই ছিল মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান মাধ্যম। প্রাকৃতিক উপাদানেই হত সৌন্দর্যচর্চা, চিকিৎসা, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। সংস্কার ও রেওয়াজের সূত্রও গাঁথা ছিল প্রকৃতিরই নির্যাসেই। মানুষ তখন ভেষজ উপাদানকে বিজ্ঞানের গণ্ডিতে বাঁধেনি। প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক উপাদান চেনার উপায় ছিল গন্ধ বা সুবাস। যে উদ্ভিজ্জ উপাদানের রস ও গন্ধ শরীরের ইন্দ্রিয়গুলোকে সতেজ রাখতে পারে তারই কদর বেশি। সুগন্ধির জন্মও এইভাবেই। শোনা যায়, মিশরের রানি ক্লিওপেট্রা যখন মার্ক অ্যান্টনির সঙ্গে দেখা করতে যেতেন, তখন জাহাজ বোঝাই করে সুগন্ধি ভরে নিয়ে যেতেন। ক্লিওপেট্রার সৌন্দর্যের রহস্যও ছিল প্রাকৃতিক উপাদানই।

মানুষ যবে থেকে বুনো জীবন ছেড়ে ঘর বেঁধে সমাজ বানাতে শিখল, তবে থেকেই প্রকৃতির উপাদানের প্রতি তার একটা অমোঘ আকর্ষণ জন্মায়। কিছুটা সচেতনভাবে, এবং কিছুটা অজান্তেই। ফুল, পাতা, শিকড়-বাকড়, ছাল সবকিছুরই একটা সুবাস আছে। এই গন্ধই মিশে যেতে থাকে মানুষের অস্থি-মজ্জায়। প্রকৃতি যে রসদ সাজিয়ে রেখেছে তার থেকেই সুগন্ধ নিংড়ে বের করে নেওয়াই লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। প্রাচীন, গ্রিস, মিশর, পারস্য, এমনকি প্রাচীন ভারতের ইতিহাসেও প্রাকৃতিক উপাদানের সঙ্গে মানুষের এই আত্মিক বন্ধনের কথা লেখা আছে। ওই যে বললাম, তখনও বিজ্ঞানের নিয়মে মানুষ প্রকৃতিকে বাঁধতে শেখেনি। মুক্ত প্রকৃতি তার সর্বস্ব নিয়ে মানুষের জীবনের নানা অধ্যায়ের সঙ্গে মিশে ছিল। প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের এই অভ্যাসই পরে সুসংহত ও সুর্নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে আবদ্ধ হয়। সে কথায় আসছি।
১৯৩৭ সাল। উদ্ভিজ্জ উপাদান তখন চিকিৎসাশাস্ত্রে বেশ জনপ্রিয়। মিশর, গ্রিসে ততদিনে বৈজ্ঞানিক উপায় উদ্ভিজ্জ উপাদানের ব্যবহার শুরু হয়েছে। ফরাসি রসায়নবিদ রেনে-মরিস গেটফসেও উদ্ভিজ্জ উপাদান নিয়ে চর্চায় ব্যস্ত। ঘটনাটা ঘটল আচমকাই।গবেষণাগারে হাতে অ্যাসিড পড়ে জ্বালাপোড়া যন্ত্রণা বিজ্ঞানীর। অ্যাসিড-ক্ষত মারাত্মক। চামড়া গলতে শুরু করবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তাড়াহুড়োতে সামনের টেবিলে রাখা জল দেখে তাই ঢেলে দিলেন হাতে। বেশি সময় লাগল না। জ্বালা যন্ত্রণা কমতে শুরু করল রেনের। ব্যথা গায়েব হল ধীরে ধীরে। চামড়ার ক্ষত জুড়োতে থাকল। রেনে অবাক। জলের এত গুণ। ভাল করে ঠাওর করে দেখলেন, জল নয়। তাড়াতাড়িতে পাত্রে রাখা ল্যাভেন্ডার অয়েল ঢেলে দিয়েছিলেন হাতে। ল্যাভেন্ডার তেলের অ্যান্টিসেপটিক গুণ হাতের ঘা শুকিয়ে দিয়েছে দ্রুত।

সেই শুরু। মাথায় চিন্তার ঢেউ খেলে যায় রসায়নবিদের। এতদিন যে গবেষণায় নতুন কিছু আবিষ্কারে বুঁদ ছিলেন, তাই যেন ধরা দিয়েছে আচমকাই। এই তো খুঁজছিলেন তিনি। প্রাকৃতিক উপাদানই হবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অন্যতম ভিত। তাঁরই হাত ধরে এক নতুন ঘরানার জন্ম হল। বিজ্ঞানী বললেন ‘অ্যারোমাথেরাপি’ । ‘অ্যারোমা’ (Aroma) গ্রিক শব্দ, এর মানে হল সুগন্ধ বা সুবাস। আর ‘থেরাপি’ হল চিকিৎসা। অ্যারোমাথেরাপির বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় ‘গন্ধ –চিকিৎসা’ । অ্যারোমাথেরাপি নিয়ে একটি বইও ছাপান রেনে, যার ইংরাজি অনুবাদ হয় ১৯৯৩ সালে। শোনা যায়, ফরাসি রসায়নবিদের অ্যারোমাথেরাপিতে মুগ্ধ হয়ে ফরাসি শল্য চিকিৎসক জেন ভ্যালনেট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনাদের ক্ষত নিরাময় করেছিলেন উদ্ভিজ্জ উপাদান থেকে নিষ্কৃত তেল দিয়ে। পরে তাঁর ধরেই এসেনশিয়াল অয়েল ভেষজ চিকিৎসার অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে ফরাসি জীবরসায়নবিদ মার্গারেট মারে চিকিৎসার পাশাপাশি সৌন্দর্যচর্চা, শরীর বিদ্যার নানা অধ্যায়ের সঙ্গে অ্যারোমাথেরাপির যোগসূত্র তৈরি করেন। ওষুধের বদলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, জীবাণুনাশক হিসেবেও অ্যারোমার ব্যবহার শুরু হয়।
অ্যারোমাথেরাপির গোড়ার কথা হল এটাই। একে পরিপূরক চিকিৎসাও বলা হয়। প্রকৃতিতে লক্ষ–কোটি গাছ গাছড়া আছে। তার মধ্যে এমন কিছু উদ্ভিদ আছে যাদের শিকড়ে, পাতায়, কাণ্ডে, ফুলে বা নানান গ্রন্থিতে এমন উপাদান জমা হয়ে রয়েছে যা মানুষের শরীরে নানাভাবে উপকারি। অ্যারোমাথেরাপি সেইসব উপাদান নিংড়ে বের করে এমন ওষুধ বানায় যা প্রয়োগ করলে দৈহিক সৌন্দর্য তো বাড়েই, পাশাপাশি নানা রোগের চিকিৎসাও হয়। প্রাকৃতিক উপাদানের এই নির্যাসকে বলে এসেনশিয়াল অয়েল যা স্নান, ম্যাসাজ বা প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে রোগ নিরাময় করে। নানা ভেতর থেকে অঙ্গের শক্তি ও সতেজতা বাড়ায়।
মানুষের শরীর পাঁচটি উপাদানে তৈরি ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ ও ব্যোম। এর সঙ্গেই সংযোগ রয়েছে অ্যারোমাথেরাপির। এই পাঁচ উপদানের একটি বিগড়ে গেলেই নানা রোগ বাঁধে শরীরে। ভাল করে বুঝিয়ে বলি, ক্ষিতি হল কঠিন অবস্থা, এসেছে মাটি থেকে অর্থাৎ মাড থেরাপি, অপ থেকে জল চিকিৎসা, মরুৎ থেকে অক্সিজেন-এর সমতা রক্ষা সংক্রান্ত চিকিৎসা, তেজ থেকে ক্রোমোথেরাপি, ইলেকট্রোফিজিয়োথেরাপি এবং ব্যোম থেকে উপবাসের মাধ্যমে চিকিৎসা। একে বলে নেচারোপ্যাথি অর্থাৎ প্রাকৃতিক উপাদানে চিকিৎসা। অ্যারোমাথেরাপির উৎস এর থেকেই। সঠিকভাবে অ্যারোমার প্রয়োগ করলে হাঁপানি, সাইনাস, হাইপারটেনশন, আর্থ্রাইটিস, অ্যালার্জি, নার্ভাস ডিসঅর্ডার, ওবেসিটি, মাইগ্রেন থেকে চর্মরোগ সারানো সম্ভব। এমনকি উন্নত অ্যারোমাথেরাপির প্রয়োগে প্রসবকালীন যন্ত্রণাও উপশম করা যায়।

অ্যারোমাথেরাপির বিকাশ হয়েছে কালের বিবর্তনে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এই ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র কিন্তু এক আধদিনে তৈরি হয়নি। একটা লম্বা ইতিহাস আছে। যদিও অ্যারোমাথেরাপির গোড়ার কথা নিয়ে সাজানো গোছানো কোনও ইতিহাস কালের পাতায় লেখা হয়নি। অনেক ছোট ছোট ঘটনা, মানুষের রেওয়াজ-অভ্যাসের কথা শোনা যায়, যার থেকেই অনুমান করা হয় অ্যারোমার ব্যবহার সেই প্রাচীনকাল থেকেই শুরু হয়েছিল। মহাকাব্যের পাতাতেও এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ আছে যা অ্যারোমাথেরাপির অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। প্রাচীন মিশন থেকেই শুরু করি।
১৯২২ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার মিশরীয় অষ্টাদশ রাজবংশের ফারাও (খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩৩-১৩২৪) তুতেনখামেনের মমি আবিষ্কার করেছিলেন। শোনা যায়, পিরামিডের ভেতরে ফারাওয়ের মমি বের করার পরেই তার থেকে তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে আসে। প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো মমিতেও সেই সুবাস ছিল টাটকা। পরে জানা যায়, সেই সুগন্ধি ছিল লোবানের। মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করত মিশরীয়রা। এমনকি মিশরীয় রমনীরা এই লোবান পুড়িয়ে, গুঁড়ো করে ত্বকের সৌন্দর্যের জন্যও ব্যবহার করত, কাজল হিসেবেও চল ছিল লোবানের।

রানি ক্লিওপেট্রার সুগন্ধি ব্যবহারের ইতিহাস অজানা নয়। মিশরীয়রা প্রাকৃতিক উপাদান থেকে সুগন্ধ বের করত স্টিম বা ধোঁয়ার মাধ্যমে। এই ধোঁয়া সারা শরীরে মেখে নেওয়া হত। সুগন্ধি শব্দটাও এসেছে ল্যাটিন প্রতিশব্দ ‘পার্ফিউম’ থেকে, এর অর্থও ধোঁয়া। প্রাচীন মিশরে উদ্ভিজ্জ উপাদান আর তার সুবাস ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরও অঙ্গ ছিল। মৃতদেহ সংরক্ষণ বা মমি করে রাখার যে রেওয়াজ ছিল, তার জন্যও অ্যারোমাই ব্যবহার করত মিশরীয়রা। দারুচিনি, সিডার কাঠ, গ্যালব্যানিয়াম, জুনিপার বেরি, স্পাইকেনার্ড এই উপাদানগুলো মৃতদেহ সংরক্ষণের কাজে লাগানো হত।
![]()
মিশরীয়রা উদ্ভিজ্জ উপাদানের নির্যাস আর সুগন্ধি ব্যবহারের অভ্যাসকে তাদের রীতি-রেওয়াজ হিসেবে ধরে নিয়েছিল। মিশরীয়দের এই চর্চাকেই আরও সংগঠিত করে গ্রিকরা। সুগন্ধিকে ঈশ্বরের উপাসনার উপাচার হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে গ্রিক মাইথোলজিতে। বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদ ও গাছড়া থেকে তেল নিষ্কাশনের পদ্ধতির উল্লেখ আছে প্রাচীন গ্রিক চিকিৎসাশাস্ত্রে। গ্রিক চিকিৎসাবিজ্ঞান যাঁর হাত ধরে সমৃদ্ধ হয়েছিল সেই হিপোক্রেটিসও ভেষজ উদ্ধিদ নিয়েই গবেষণা করতেন। হিপোক্রেটীয় যুগের চিকিৎসা পদ্ধতিতে অ্যারোমাটিক বাথ অর্থাৎ সুগন্ধি দিয়ে স্নান ও ভেষজ উদ্ভিদ থেকে নিষ্কাশিত তেল দিয়ে থেরাপির উল্লেখ আছে।

গ্রিকরা মনে করত সুরভি ও সুগন্ধি তেলের ব্যবহারে আত্মিক শুদ্ধি হয়। রোগ সারে এবং ধ্যানের গভীরতা তৈরি হয়। ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মার বন্ধন তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গেই বলি, খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ শতক নাগাদ মিশরে প্যাপিরাসের উপর খোদাই করা লিপিতে বিভিন্ন ভেষজ উদ্ভিদের বর্ণনার পাশাপাশি নানা জাদুমন্ত্রেও উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। এই সব রীতিতে সুগন্ধি তেল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। মিশরীয় পুরোহতিরাই ভেষজ উপাদান থেকে সুগন্ধি বের করার কাজ করতেন। সমাজের উচ্চবিত্তরাই মূলত এই জাতীয় সুগন্ধির ব্যবহার করতেন। ![]()
গ্রিক ও মিশরীয়দের দেখেই সুগন্ধি ব্যবহারের চল শুরু হয় প্রাচীন রোম ও পারস্য সভ্যতাতেও। বিখ্যাত গ্রিক চিকিৎসক ক্লডিয়াস গ্যালেন ভেষজ উদ্ধিদের তেল নিয়ে চর্চা করে হাজারের বেশি আহত সৈনিকের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। সেই সময় রোমান সম্রাট মার্কাস অরেলিয়াসের খাস চিকিৎসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল তাঁকে। পারস্যে সুগন্ধি বা অ্যারোমার ব্যবহার শুরু হয় চিকিৎসক ইবনে সিনার হাত ধরে। মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম সেরা চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, দার্শনিক আবু আলি হোসাইন ইবনে সিনা ইউরোপে পরিচিত ছিলেন অ্যাভিসিনা নামে। তিনি গাছের নির্যাস থেকে আতর তৈরি করেন। তাঁর সুগন্ধি নিয়ে গবেষণা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বে।

ঋগবেদেই উল্লেখ আছে, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতায় ভেষদ উদ্ভিদের ব্যবহারের সঙ্গে সুগন্ধি ও উদ্ভিদ নিঃসৃত তেলেরও প্রয়োগ হত নানাভাবে। অতএব, ধরে নেওয়াই যায় আয়ুর্বেদের সঙ্গেই অ্যারোমার সংমিশ্রণ হয়েছিল নানাভাবে। চরক ও সুশ্রুত সংহিতাতেও অ্যারোমা বা সুরভি ও সুগন্ধির উল্লেখ পাওয়া যায়। রোগ নিরাময়ে যার ব্যবহার হত।

প্রাচীন ভারতে অ্যারোমাথেরাপি ব্যবহারের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল রামায়ণ। রাবণপুত্র ইন্দ্রজিতের শক্তিশেলে আহত লক্ষণকে সুস্থ করতে চার রকমের ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে আসার কথা বলেছিলেন সুসেনা-- মৃতসঞ্জীবনী, বিশল্যকরণী, সন্ধনাকরণী ও সবর্ণাকরণী(বাল্মিকী রামায়ণের যুদ্ধকাণ্ড)। হনুমান এই ভেষজ উদ্ভিদ আলাদা করে চিনতে না পেরে গোটা পাহাড়টাই তুলে এনেছিলেন। এইসব ভেষজ উদ্ভিদের গুণেই প্রাণ বেঁচেছিল লক্ষণের।

বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ ‘ত্রিপিটক’-এ গৌতম বুদ্ধের চিকিৎসায় একাধিকবার ফুলের সুগন্ধ ও ভেষজ উদ্ভিদের নির্যাসের কথা বলা হয়েছে। একটা গল্প তো সকলেরই জানা। শত্রুপক্ষের ছোড়া পাথরের আঘাতে গৌতম বুদ্ধের পায়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেখানে পচন ধরার উপক্রম হয়। সেই সময় বুদ্ধের শিষ্য মহারাজ বিম্বিসারের পৌত্র চিকিৎসক জীবক ভেষজ উদ্ভিদের থেকে তেল বের করে তাঁর চিকিৎসা করেছিলেন। মনে করা হয় সেইসব উদ্ভিদের তেল ছিল অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল গুণযুক্ত, যা বর্তমান সময়ে এসেনশিয়াল অয়েল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রাচীন ভারতে অ্যারোমাথেরাপির উদাহরণ অজস্র। মুঘল যুগেও অ্যারোমাথেরাপির প্রচল হয়েছিল ভারতে। পার্সিয়ান সংস্কৃতি থেকে ফুল ও গাছগাছড়ার নির্যাস দিয়ে সৌন্দর্যচর্চা ও চিকিৎসার রেওয়াজ ভারতে এনেছিলেন মুঘলরা। সেই সময় রানিরা সুগন্ধি ফুলের নির্যাস মেশানো জলে স্নান করতেন। মোঘল যুগের বিখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর নথিতে বলেছেন, সম্রাট আকবরের সুগন্ধি দ্রব্যে আগ্রহ ছিল। ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ও প্রাসাদের অন্দরমহলকে সুরভিত করার জন্য বিভিন্ন ফুলের নির্যাস ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

চিনে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার ও অ্যারোমাথেরাপির গবেষণা বহু পুরনো। আনুমানিক ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ‘দ্য ইয়েলো এম্পেরর’স ক্লাসিক অব ইন্টারনাল মেডিসিন’ বইতে চিনের বিভিন্ন ধর্মীয় রীতি ও আচারে সুগন্ধি ব্যবহারের উল্লেখ মেলে। সৌন্দর্য ধরে রাখতে ও স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও ভেষজ চিকিৎসার রেওয়াজ ছিল চিনে।

পশ্চিম ইউরোপে ১২২১ সালে ইতালিকে সুগন্ধি দ্রব্যের ব্যবহার জনপ্রিয় হয়। শোনা যায়, রসায়নবিদ তাপ্পুতি ফুল ও গাছ গাছড়ার নির্যাস থেকে সুগন্ধি তৈরি করতেন। সাইপ্রাস অঞ্চলে পৃথিবীর প্রাচীনতম সুগন্ধির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। ষোলো শতকের মাঝামাঝি ইউরোপে সুগন্ধির জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছয়। ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি, সেজ তেলের পাতন করে তার ব্যবহার শুরু হয়। ইংল্যান্ডের ভেষজবিদ নিকোলাস কালপেপার তাঁর বই ‘দ্য ইংলিশ ফিজিশিয়ান’-এ ভেষজ বিদ্যার চর্চাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়াতেও অ্যারোমাথেরাপির বিকাশ হয়েছে বহু আগেই। আশি সালের শেষের দিকে এসেনশিয়াল অয়েলের ব্যবহার বাড়ে আমেরিকায়। রূপচর্চার কাজে অ্যারোমা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। বিভিন্ন পার্লার, সাঁলো, স্পা-তে ভেষজ তেল দিয়ে ম্যাসাজ, অ্যারোমা বাথ শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়াতে অ্যারোমাথেরাপিকে বলা হয় কমপ্লিমেন্টারি থেরাপি। সৌন্দর্যচর্চার পাশাপাশি হার্বাল ট্রিটমেন্টেও জনপ্রিয় অ্যারোথেরাপি। বয়স্কদের চিকিৎসায় বা যে কোনও রোগ-ব্যধি সারাতে ট্রাডিশনাল থেরাপির থেকে অ্যারোমার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে অনেকটাই।

ইতালিতে ১৯২২ সালে ডাক্তার রিনাটো ক্যাওলা ও জিওভানি গ্যারি স্নায়ুতন্ত্রের রোগ সারাতে অ্যারোমাথেরাপি প্রয়োগের প্রস্তাব দেন। শুধু স্নায়বিক রোগ নয়, শ্বাসযন্ত্র, রক্ত সংবহন তন্ত্রের যে কোনও রোগের চিকিৎসাতে অ্যারোমা ব্যবহারের কথা বলেন। মানসিক রোগ সারাতেও আজ অ্যারোমাথেরাপির প্রয়োগ হচ্ছে সারা বিশ্বেই। রোভেস্টি, হিস্টিরায়া, ডিপ্রেশন কাটাতে সুগন্ধির কোনও তুলনাই নেই।

আমি বলব, ভারতে অ্যারোমাথেরাপির চর্চা সেভাবে হয়নি। অথচ সারা বিশ্বেই এই থেরাপির কদর বেড়েছে। গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রযোগও চলছে। অনেকেই হয়তো জানেন না, সমুদ্রের তলায় একরকমের শ্যাওলা পাওয়া যায় যার নির্যাস ত্বকের জন্য খুবই ভাল। আবার ধরুন, শামুক যখন চলে তার শরীরে থেকে যে নির্যাস বের হয় তার গুণাগুণ দারুণ। ত্বকের চিকিৎসা হোক বা বিউটি ট্রিটমেন্ট এই নির্যাসকে কাজে লাগানো যেতেই পারে।
অ্যারোমাথেরাপির এটাও উৎকৃষ্ট উদাহরণ। খারাপ লাগে, যখন এই ধরনের নতুন গবেষণা বা চর্চার খামতি দেখি চারদিকে। প্রকৃতি থরে থরে তার রসদ সাজিয়েই রেখেছে। সেই গন্ধমাদন খুঁজে আমাদের সঠিক জিনিসটা বেছে নিতে হবে। আমার লক্ষ্য অ্যারোমাথেরাপিকে সেই জায়গায় নিয়ে যাওয়া। কৃত্রিমতার ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধেই নতুন করে শ্বাস নেবে মানুষ। প্রকৃতির সঙ্গে জুড়বে মন। তৈরি হবে আত্মার বাঁধন।