
শেষ আপডেট: 26 October 2021 11:14
প্রত্যেক ইন্টেরিয়র ডিজাইনারেরই একটা 'স্টাইল অফ ওয়ার্ক' থাকে। আপনার ক্ষেত্রে তা কীরকম?
অমলিন- আমি আর্টিস্টিক্যালি ঘরের অন্দরসজ্জাকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। ইন্টেরিয়র অ্যারেঞ্জমেন্ট, কনসেপ্ট এবং ডিজাইনিং- এই তিনটি জিনিসকে প্রথমত মাথায় রাখতে হয়। সেইসঙ্গে ক্লায়েন্টের লাইফস্টাইল, ক্ষমতা দেখে নিতে হয়। ক্ষমতার ক্ষেত্র বলতে শুধু অর্থনৈতিক দিক কিন্তু নয়, মানসিক দিকও অবশ্যই দেখতে হয়। মানুষটিকে সম্পূর্ণ অ্যানালাইসিস করে তাঁর মেজাজ, ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী কীভাবে ঘরে কমফোর্ট জোন ক্রিয়েট করা যায় তারই পরামর্শ দিয়ে থাকি। ইন্টেরিয়র একটা লং টার্ম ব্যপার। যদি প্রথমেই ঘরের বেসিক তৈরি করা যায়, তবে চার পাঁচ বছর পর সেই বাড়ির অন্দরসজ্জায় একটা নিজস্ব ঘরানা তৈরি হয়। ঘরকে সুন্দর করে প্রেজেন্ট করতে হলে প্রতিদিন ঘরের গ্রুমিং-এর প্রয়োজন। যা দু থেকে পাঁচ বছর পর বোঝা যায়। ঘরের অদ্ভুত একটা ক্যারেক্টারিস্টিক তৈরি হয়। ঘরের প্রতিটি স্পেস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও ক্লায়েন্টের সঙ্গে বাড়ির জায়গাটা প্রথমে দেখে নিয়ে তাঁর পছন্দ-অপছন্দ এবং সৌন্দর্যবোধের মান বিচার করে আলোচনার মাধ্যমে তবেই অন্দরসজ্জা করি। তা সে যতই ক্ষুদ্র পরিসরে বাড়ির অন্দরমহল হোক না কেন। শুধু তাই নয় ক্যারেক্টারিস্টিক স্পেস কীরকম সেটি দেখার পাশাপাশি, সেই মানুষটি বিবাহিত নাকি অবিবাহিত, বাড়িতে কে বা কারা থাকেন, প্রত্যেকের জন্য আলাদা ঘর আছে কিনা, পারিবারিক পরিকাঠামো, মানুষটির জীবনের গতিপ্রকৃতি ইত্যাদি বুঝে ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং করি আমরা। বাড়ির কিছু জোন থাকে যেখানে সাজাবার মতো কিছুই থাকে না। যেমন কিচেন, বাথরুম, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ঘর, শ্বশুর-শাশুড়ির ঘর ইত্যাদি বেশ কিছু জায়গা আছে যেগুলো খুবই পার্সোনাল। যেখানে সাজাবার কিছু নেই। একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনারের পছন্দ অনুযায়ী কখনও অন্দরসজ্জা করা উচিত নয়। বাড়ির ক্লায়েন্টের পছন্দ, রুচিকে মাথায় রেখেই একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ঘরের অন্দরসজ্জা করেন। বাইরের মানুষ আমার অন্দরসজ্জা দেখে প্রশংসা করলেই হবেনা। আমার ঘরের অন্দরসজ্জায় আমি নিজে কতটা খুশি বা তার সঙ্গে আমি কতটা সম্পৃক্ত হতে পারছি সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। ঘরের অন্দরসজ্জা এমনভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কিছু বেসিক পদ্ধতি আছে। বাড়িতে বাইরের লোকের আনাগোনা, কথাবার্তা যেখানে বেশি হয় সেই জায়গাটা হল ড্রইংরুম। যাকে আমরা মিলনক্ষেত্র বলি। সেই জায়গাটাকেই বেশি ফোকাস করা উচিত।
দেওয়ালিতে ড্রয়িং রুমকে কীভাবে উৎসবের রূপ দেওয়া যায়?
অমলিন- কোনও উৎসবের ক্ষেত্রে রাতারাতি ঘরের ইন্টেরিয়রের পুরো ভোল বদল করা সম্ভব নয়। তবে সামর্থ্য অনুযায়ী ঘরের বাড়তি সৌন্দর্য সেদিনের জন্য আনা যেতেই পারে। ঘরের প্রতিটি স্পেস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি ঘরের রং বিবর্ণ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে রঙের পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে তা দুর্গা পুজোর আগেই পরিকল্পনা করা উচিত। সেক্ষেত্রে দেওয়ালির অনেক আগেই প্রয়োজনে রং করানো উচিত। সাধারণত আইভরি হোয়াইট কালার দেখতে ভালো লাগে। সিটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট আপনার পার্সোনালিটির সঙ্গে মানানসই হবে কিনা সেটা খেয়াল রাখতে হবে। ঘরের পর্দা যদি খুব পুরনো হয়ে যায় তবে সেটি বদলানোর প্রয়োজন মনে হলে তা করা যেতে পারে। যা নিমেষে ঘরের মুড পাল্টে দিতে পারে। এছাড়াও প্রয়োজনে আপহোলহোসট্রি পরিবর্তন করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে ট্রাডিশনাল নাকি কনটেম্পোরারি, সেটা ক্লায়েন্টের বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী করা উচিত। অবশ্যই তা যেন ঘরের সঙ্গে মানানসই হয়। ঘরে যদি পুরনো বিসদৃশ লাইট থাকে তা পাল্টে নিজের রুচি অনুযায়ী নতুন লাইট লাগানো যেতে পারে। বাজারে এখন খুব সুন্দর লাইট পাওয়া যায়, যা আপনার সাধ্যের মধ্যে কিনে নিলেই হল। দেওয়ালে যদি কোনও ফাঁকা জায়গা থাকে সেখানে পেইন্টিং বা সুদৃশ্য পটচিত্র ব্যবহারে ঘরের জৌলুশ বাড়ে। সাইড টেবিলে আর্টিফ্যাক্টস কিংবা টেবিল টপে ছোট্ট স্কাল্পচার রাখলে ঘরে একটা অন্যরকম মেজাজ ক্রিয়েট হয়।
অনেক সময় বাড়িতে পুরনো সিলিং পাখা ঘরের সৌন্দর্যের হানি ঘটায়। অনেকেই হয়তো এই পুরোনো পাখার দিকে নজর করেন না। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে ঘরের অন্দরসজ্জায় সিলিং পাখার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বাজারে এখন নানা রকমারি ডিজাইনের সিলিং পাখা এসে গেছে। প্রয়োজনে ঘরের মুড ও বাজেট অনুযায়ী পুরনো পাখার বদলে নতুন সিলিং পাখা লাগানো যেতে পারে, যা ঘরের সৌন্দর্যে বাড়তি মাত্রা যোগ করে। এছাড়াও সতেজ টাটকা ফুলের ব্যবস্থা রাখলে ঘর অনেক বেশি সজীব ও প্রাণবন্ত দেখায়। প্রয়োজনে ফ্লোর পালিশ করানো যেতে পারে। আর যদি ফ্লোরে জায়গা থাকে সেক্ষেত্রে 'রাগ' ব্যবহার করা যেতে পারে। এখন বাজারে খুব সুন্দর কম বাজেটের ডিজাইনার 'রাগ' কিনতে পাওয়া যায়। ঘরে যদি কুশন থাকে তবে পুরনো কুশন কভার বদলে নতুন কুশন কভার ব্যবহার করলে ঘরের অন্দরসজ্জায় এক অনন্য মাত্রা যোগ করে। তবে ইন্টেরিয়রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হল মেনটেনেন্স। যদি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর না থাকে তবে তা নেগেটিভ ফিল দেয়।
এদিন ড্রইংরুমে কী ধরনের লাইটিং অ্যারেঞ্জমেন্ট করা যেতে পারে?
অমলিন- এদিন বাড়ির প্রবেশদ্বারে প্রদীপ জ্বালানো সবথেকে ভালো। একটা সুন্দর পুজোর অ্যাম্বিয়েন্স তৈরি হয়। মাটির কারুকাজ করা প্রদীপ গ্রামবাংলার একটা ক্রাফট। এই ধরনের প্রদীপ যত বেশি ব্যবহার হবে, তাতে গ্রামবাংলার বহু মানুষের কর্মসংস্থান হব। এই শিল্পের সঙ্গে এখনও অনেক মানুষ জড়িত।
এদিনের জন্য কী ধরনের রদবদল করলে বেডরুমের মুড বদলায়?
অমলিন- বাড়ির সবচেয়ে পার্সোনাল ঘর এটি, যেখানে সারা বছরের জন্য নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রোমান্টিক পরিবেশ থাকা বাঞ্ছনীয়। বেডকভার থেকে শুরু করে কুশন কভার, একটু নতুনত্বের ছোঁয়া এদিন আনা যেতেই পারে। এছাড়া ঘরের যে স্লিপার ব্যবহার করা হয় সেটি গুছিয়ে এক জায়গায় রাখা দরকার। যদি ঘরে জায়গা থাকে তবে ফ্লোরে 'রাগ' ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে অ্যারোমা-বেস সুগন্ধি ব্যবহার করলে বাড়তি মাদকতা সৃষ্টি করে।
এদিন ব্যালকনিতে বাড়তি জৌলুশ আনতে কী করণীয়?
অমলিন- সর্বপ্রথম খেয়াল রাখতে হবে ব্যালকনি অথবা বারান্দায় কোনও কাপড়জামা না থাকে। বাজারে রকমারি লাইট এখন পাওয়া যায়, যা নিজের পছন্দমতো ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে আমার মতে সর্ষের তেল, সলতে দিয়ে মাটির প্রদীপের আলো বাড়িতে একটা মায়াবী আবেশ সৃষ্টি করে। মাটির প্রদীপ ব্যবহারের আগে জলে ডুবিয়ে নিলে খুব ভালো হয়। এতে আগুন দীর্ঘ সময় জ্বলে। বারান্দার কোণে একটু গাছ ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া সেদিন সারা বাড়িতে যদি সন্ধের সময় একটু ধূপ, ধুনো জ্বালানো যায় তবে একটা পজিটিভ এনার্জি আসে। অদ্ভুত একটা পুজোর গন্ধ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। যার রেশ থেকে যায় বহুক্ষণ।