দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাকে ঘিরেই ছিল এদিনের অনুষ্ঠান। তার পুনর্জন্মের গল্প শুনতেই ভিড় করেছিলেন সকলে। কিন্তু তাকে যেন ধরে রাখা যাচ্ছে না। প্রাণশক্তি যেন উপচে পড়ছে। হবে নাই বা কেন। তার বয়স তো ১ বছর ৯ মাস। এই বয়সে তো ছটফটেই হওয়ার কথা একটি শিশুর।
কিন্তু এক বছর আগেও ছবিটা ছিল অন্য রকম। বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা ছিল না রিজওয়ানের। ‘বাইলারি আর্টেসিয়া’ অসুখ নিয়ে দিনের পর দিন ক্ষয়ে যাচ্ছিল জীবনী। জন্মের পর থেকেই জন্মগত এই অসুখ প্রকট হতে থাকে। চিকিৎসকরা রোগ শনাক্ত করে জানান, প্রতি আট হাজার শিশুর মধ্যে এক জন করে এই অসুখে আক্রান্ত।
রিজওয়ানের প্রস্রাবের রং স্বাভাবিকের তুলনায় অনেকটাই বেশি হলদে হয়ে যায়। মলের রং হয়ে যায় সাদা। তবে যত দিনে অসুখ ধরা পড়ে, তত দিনে মারণরোগে শয্যাশায়ী রিজওয়ান। লিভারের কার্যক্ষমতা প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছয়। লিভার প্রতিস্থাপন ছাড়া আর উপায় ছিল না। আর এইটুকু শিশুর লিভার সফল ট্রান্সপ্লান্ট কার্যত অসম্ভব।
সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করেছে অ্যাপোলো হাসপাতালের দক্ষ চিকিৎসকের দল। রিজওয়ানুরেরই মায়ের লিভার নিয়ে তা অস্ত্রোপচার করে প্রতিস্থাপিত করা হয় তাঁর ছোট্ট সন্তানের শরীরে। শুক্রবার অ্যাপোলো হাসপাতালের তরফে ওয়েবিনারের মাধ্যমে আয়োজিত এক সাংবাদিক বৈঠকে হাসপাতালের গ্যান্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক মহেশ গোয়েঙ্কা জানান, এক্ষেত্রে রিজওয়ানুরের মায়ের লিভার নেওয়া গেছে। কিন্তু আরও অনেক লিভার প্রয়োজন।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, রিজওয়ানের যে অসুখ করেছিল, সেই বাইলারি আর্টেসিয়ায় শরীরে বাইল ডাক্ট সিস্টেম থাকে না, ফলে লিভার আর গ্লুকোজ ও গ্লাইকোজেন মেটাবলিজম পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। সে জন্য অস্বাভাবিক পরিমাণে গ্লাইকোজেন তৈরি হয় শরীরে।
ডক্টর মহেশ গোয়েঙ্কার নেতৃত্বে ডক্টর রামদীপ রে এবং ডক্টর সুমিত গুলাটি এই লিভার ট্রান্সপ্লান্ট করেন রিজওয়ানের। হাসপাতাল জানিয়েছে, এই অস্ত্রোপচারের খরচ ছিল ২৩ লক্ষ। রিজওয়ানের বাবা পেশায় আনাজ বিক্রেতা। জমিজমা বিক্রি করে টাকপয়সা জোগাড় করেন ছেলের জন্য। তবে তা পর্যাপ্ত ছিল না। চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেন, প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়াই আসল লক্ষ। তাই খরচের সঙ্গে আপস করেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা।
রিজওয়ানের মা রিনাবিবি লিভার দেওয়ার পরে টানা ১৮ ঘণ্টা অস্ত্রোপচার চলে ৯ মাসের একরত্তি রিজওয়ানের। এর পরে টানা ২৫ দিন শিশুটিকে গভীর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। শেষমেশ সবরকম প্রতিকূলতা জয় করে সুস্থ হয়ে ওঠে সে। গতকাল, শুক্রবার ছিল সেই অস্ত্রোপচারের এক বছর পূর্তি।
এখন পুরোপুরি সুস্থ রিজওয়ান। আর পাঁচটা শিশুর মতোই স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে উঠছে সে। কোনও অসুস্থতা তো নেই-ই, উল্টো তার প্রাণশক্তি যেন ধরে রাখা যাচ্ছে না।
ডক্টর মহেশ গোয়েঙ্কার কথায়, “পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা দেশে বছরে প্রায় দু’লক্ষ মানুষ পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। যাঁদের মধ্যে এক লক্ষ মানুষের অঙ্গ অন্যের দেহে প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়। কিন্তু এই কাজে এগিয়ে আসেন মাত্র এক হাজার জনের পরিবার। সচেতনতার প্রসার ঘটিয়ে এই সংখ্যাটা বাড়ানোর প্রয়োজন।”
রিজওয়ানের বাবা বক্কার জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের বিপুল খরচ তো বটেই, তার পাশাপাশি প্রতি মাসে ওষুধের খরচ ৯ হাজার টাকা করে। সাধারণ নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে সেটা বহন করা খুবই মুশকিল। সেই দিকটিও সকলের চিন্তা করা দরকার বলে আবেদন করেন তিনি।