Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
IPL 2026: টানা চতুর্থ হারে কোণঠাসা কেকেআর, ৩২ রানে ম্যাচ জিতল সিএসকে‘ভূত বাংলো’য় সেন্সর বোর্ডের কাঁচি! বাদ গেল ৬৩টি দৃশ্য, ছবির দৈর্ঘ্য কমতেই চিন্তায় অক্ষয়ভোটের ডিউটিতে কড়া নিয়ম! প্রিসাইডিং ও সেক্টর অফিসারদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা কমিশনের'বন্ধু' মোদীকে ফোন ট্রাম্পের! ৪০ মিনিট ধরে হরমুজ প্রণালী নিয়ে কী আলোচনা হল?লোকাল ট্রেনের টিকিটে বিরাট ছাড়! ৫ টাকার টিকিট এখন কত পড়বে? জেনে নিন বিস্তারিতTB Vaccine: যক্ষ্মা প্রতিরোধে কতটা সফল নতুন টিকা? ট্রায়ালের রিপোর্টে আশার আলোর পাশাপাশি উদ্বেগের সুর বিজ্ঞানীদের'বাঙালি ব্রিটিশদের সামনে মাথা নত করেনি, আর এই বহিরাগতরা আমাদের কী করবে?' বিজেপিকে তোপ অভিষেকেরসাইলেন্ট লাং ডিজিজ: কাশি মানেই কি ক্যানসার? দূষণে ফুঁসছে ফুসফুস, কখন দরকার ট্রান্সপ্লান্ট?'ইগো সরিয়ে রাখুন', নিজেদের মধ্যে মতভেদ সরিয়ে এক হয়ে লড়ার নির্দেশ অভিষেকেরভাইরাল ভিডিও হাতিয়ার করে শাহের তোপ! হুমায়ুনকে ‘দিদির এজেন্ট’ বলে কটাক্ষ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

রেল, রাস্তা, সেতু, পাহাড়, নদীর তলদেশে রাস্তা বানিয়ে ‘এক দেশ-এক সুবিধা’ তৈরি করছে শি’র চিন

চিনে দু'টি পাহাড় চূড়াকে যুক্ত করা আইজাই ব্রিজটি দেখে আমাদের দ্বিতীয় হুগলি সেতু, হাওড়া ব্রিজের কথা মনে পড়েছিল।

রেল, রাস্তা, সেতু, পাহাড়, নদীর তলদেশে রাস্তা বানিয়ে ‘এক দেশ-এক সুবিধা’ তৈরি করছে শি’র চিন

শেষ আপডেট: 1 May 2025 20:20

অমল সরকার

চিন (China) সফরে একদিন আমাদের গন্তব্য ছিল শিয়ামেন বিশ্ববিদ্যালয় (Xiamen Univerisity) । সেটি চিনের ফুচিয়েন (Fujian Province) প্রদেশের শিয়ামেন শহরের অন্তর্গত একটি দ্বীপ সিমিংয়ে অবস্থিত। চিনা প্রশাসনিক মানদণ্ডে সেটি মফস্বল শহর। যদিও ভারতে আমরা মফস্বল শহরের যে ছবি বয়ে বেড়াই সিমিং মোটেও তেমন নয়। পূর্ব চিন সমুদ্রের (East Chaina Sea) উপকূলে অবস্থিত এই দ্বীপ জেলার পুরোটাই বলতে গেলে অত্যাধুনিক শহর। অবশ্য সমুদ্রে তীরে অবস্থিত শহর, বন্দর শহরগুলি তেমনই হয়ে থাকে।

মূল ভূখণ্ড শিয়ামেন (Xiamen) থেকে আমরা বাসে সিমিং দ্বীপে পৌঁছালাম যে পথ ধরে সেটি সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে গিয়েছে। মাথার উপর দিয়ে বয়ে গেছে পূর্ব চিন সমুদ্র। সমুদ্রের তলদেশে (under sea) তৈরি এই রাস্তা তথা এক্সপ্রেসওয়ের বিষয়ে বিস্তারিত পড়ে জানাচ্ছি। শুধু জানিয়ে রাখি মাত্র ৭৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা বিশিষ্ট এই দ্বীপ শহরকে বিপুল অর্থ খরচ করে সমুদ্রের নীচ দিয়ে রাস্তা বানিয়ে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে চিন যুক্ত করেছে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে। যে কারণে স্থানীয় বিমানবন্দরটি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (Xiamen Gaoqi international airport)। বিমানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় দুই রানওয়ে বিশিষ্ট আরও একটি বিমানবন্দর তৈরি হচ্ছে।

আর এক প্রদেশ হুনানের (Hunan) জিসহাউ শহরের অদূরে তৈরি আইজাই সেতুও চিনের পরিকাঠামো বিস্তারের আর এক অভিনব সংযোজন। আগের লেখায় উল্লেখ করেছি পাহাড়, টিলা, নদী, সমুদ্র ভেদ করে কীভাবে এক্সপ্রেসওয়ে, হাইস্পিড ট্রেন পথ নির্মাণ করেছে চিন। আইজাই হল তেমন একটি সেতু যা দুটি সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়াকে সংযুক্ত করেছে। চিনে এই ধরনের নতুন পরিকাঠামোগুলি পর্যটন সার্কিটের অংশ। চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, সমুদ্র, শৈল শহর কিংবা চোখ ধাঁধানো বিনোদন পার্কে বেড়াতে যাওয়ার মতো প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এমন সব আকাশচুম্বি সেতু, উড়ালপথ দেখতে আসেন।

ফিরে যাই শিয়ামেন প্রসঙ্গে। গত শতকের আটের দশকে ‘চিনা অর্থনীতির মুক্তির দূত’ দেং জিওয়াপিং (Deng Xiaoping) দেশের যে সব উপকূলীয় এলাকায় মুক্ত বাণিজ্যের দুয়ার খুলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করেছিলেন তার একটি হল শিয়ামেন, যার অংশ সিমিং দ্বীপ-শহর। একটা সময় পর্যন্ত শিয়ামেনের ইংরিজি নাম ‘অ্যাময়’ বেশ প্রচলিত ছিল। অর্থনৈতিকভাবে শহর যত উন্নতির শিখরে উঠেছে, তত ইংরিজি নাম হারিয়ে গিয়েছে। ভাষার অস্তিত্ব রক্ষায় অর্থনৈতিক বিকাশের সম্পর্ক খোঁজা যেতে পারে এই ধরনের দৃষ্টান্ত থেকে।

এই এলাকার অগ্রগতির কাহিনি রূপকথার মতো। দক্ষিণ ফুচিয়েনের এই অংশের বাসিন্দাদের একটা সময় দলে দলে দেশ ছাড়তে হয়েছিল জীবিকার সন্ধানে। এখানকার হক্কিয়ানভাষী মানুষের গন্তব্য ছিল ভারত (India), ফিলিপিন (Philipines), সিঙ্গাপুর (Singapore), মালয়েশিয়া (Malaysia)। অদূরে তাইওয়ানের (Taiwan) মানুষও এই চিনা উপভাষায় কথা বলেন। তাদের পোশাক, খাবার, সংস্কৃতিও অভিন্ন।

দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া শিয়ামেন প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর পর সিমিং-সহ শিয়ামেনের বাকি অংশের উন্নয়নে অর্থ জোগাতে শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয় দেং জিওয়াপিংয়ের অর্থনীতির সুফল।

ফিরে আসি সমুদ্রের তলদেশের রাস্তার প্রসঙ্গে। ফুচিয়েন প্রদেশের শিয়ামেনের পূর্ব চিন সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে সিমিংকে যুক্ত করার এই টানেলটি তৈরি হয় ২০১০-এ। আট কিলোমিটারের সামান্য লম্বা করিডরটির ৭০ মিটার তৈরি হয়েছে সমূদের অনেকটা গভীরে। ব্যস্ত সময়ে উপরের সেতু দিয়ে দিয়ে এই অংশটুকু পেরতে লাগত এক থেকে দেড় ঘণ্টা। আমরা পথটা পৌঁছলাম মাত্র দশ মিনিটে। ছয় লেনের রাস্তা। অফিস টাইমেও যানজটে পড়তে হয়নি।

বলে রাখা ভাল আমরা যখন যেখানে গাড়িতে গিয়েছি, যাত্রা বাধাহীন করতে কোনও বিশেষ ব্যবস্থা ছিল না। না ছিল বাসের সামনে পুলিশের পাইলট কার, না ছিল গ্রিন লাইনের সুবিধা। আসলে, রাস্তাঘাট এতটাই প্রশস্ত আর মানুষজন এমন শৃঙ্খলাপরায়ণ যে আলাদা করে বিশেষ সুবিধার প্রয়োজন তেমন একটা পড়ে বলে মনে হল না।

প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি, নদীর তলদেশে টানেল তৈরিতে চিনের থেকেও ভারতকে এগিয়ে রেখেছে কলকাতা (Kolkata/Calcutta)। সেই ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ ভারতে গঙ্গার তলদেশে (tunnel under Ganga in 1931)তৈরি হয়েছিল এশিয়ার প্রথম নদীর তলদেশে টানেল। সেটা অবশ্য তৈরি করা হয়েছিল কলকাতা থেকে হাওড়ায় (Kolkata-Howrah) বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার মোটা তার যুক্ত করার উদ্দেশে। সিইএসসি (CESC) এখনও সেই টানেল ব্যবহার করে। টানেল ধরে যাতায়াত করেন সংস্থার বিদ্যুৎ কর্মীরা। সেই টানেলের অদূরে ২০২১-এ হাওড়া-কলকাতা গঙ্গার তলদেশ দিয়ে  আরও একবার যুক্ত হয়েছে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর (East-West metro) সুবাদে। চিনে সমুদ্রের উপর তৈরি হয়েছে হংকং-ঝুহাই-ম্যাকাও সেতু। ভারতে তৈরি হয়েছে মুম্বইয়ে—মুম্বই ট্রান্স হারবার লিঙ্ক (Mumbai Trans harbour link) বা অটল বিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Bajpai) সেওরি নভাসেবা অটল সেতু (Atal bridge at Mumnai)।

চিনে দুটি পাহাড় চূড়াকে যুক্ত করা আইজাই ব্রিজটি দেখে আমাদের দ্বিতীয় হুগলি সেতু (Second Hooghly bridge), হাওড়া ব্রিজের (Howrah Bridge) কথা মনে পড়েছিল। কলকাতার ওই দুই ব্রিজের মতোই আইজাইয়ের (Aizhai bridge) দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী অংশে কোনও পিলার নেই। হাওড়া ব্রিজের তুলনায় দৈর্ঘে অনেক এগিয়ে চিনের সেতুটি—১১৭৬ মিটার (৩৮৫৮ ফুট)। চিনের দাবি বিশ্বের দীর্ঘতম ৪০টি সেতুর মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে আইজাই। মাটি থেকে প্রায় একশো তলা বাড়ির সমান উঁচু দিয়ে পাহাড়ের দুই প্রান্তকে যুক্ত করেছে সেতুটি। ফলে মাঝে পিলার তৈরির সুযোগ ছিল না। বলাইবাহুল্য সেতুটি চালু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দারা সহজে আর এক প্রান্তে পৌঁছে সমতলের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। দূরের শহরে ব্যবসা, পড়ালেখার জন্য যাতায়াত সহজ হয়ে গিয়েছে।

পার্বত্য শহর ঝিসাইকে অদূরে চাঙদং এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই সেতু।  দোতলা সেতুর উপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করে। নীচের অংশ মূলত সেতুর ভারবহনের পাশাপাশি পথচারীদের জন্য। পথচারীদের অংশে কিছুদূর পর পর কাঁচের পাটাতন বিছানো। সেখানে দাঁড়িয়ে নীচের প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করা যায়। দেখলাম বহু পর্যটক এসেছেন সেটি দেখতে। স্বভাবতই সেতু শুরুর মুখে দোকানপাটগুলিতে ভিড় ভালই।

চিন সরকার দাবি করছে, প্রত্যন্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা এলাকাগুলিতে তারা ২০২০-র মধ্যে প্রায় ১১ লাখ কিলোমিটার রাস্তা তারা পুননির্মাণ করে দিয়েছে। দেশের নানাপ্রান্তে সড়ক পরিকাঠামো উন্নয়নের এই অভিযান গতি পায় ২০১৪-তে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাঁর ‘বেল্ট অ্যান্ড রোডস ইনিশিয়েটিভ ঘোষণার পর। স্থল-নৌ-বিমান পরিষেবা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে প্রতিটি পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়েছে। ফলে পরিবহণ বাবদ খরচ কমে এসেছে, দাবি চিন সরকারের।

এই অভূতপূর্ণ অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোডস ইনিশিয়েটিভ (Belt and Road initiative) বা বিআরআই কর্মসূচির অংশ বটে। চিনকে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের সহযোগী এবং অংশীদার করে তুলতে ২০১৪-তে প্রেসিডেন্ট শি গৃহীত ওই কর্মসূচিকে সফল করে তুলতে অন্তর্দেশিয় পরিকাঠামোর উন্নয়ন জরুরি ছিল।

শি’র জমানায় ১০ কোটি মানুষকে দারিদ্রমুক্ত করে গোটা দেশকে গরিবির অভিশাপ মুক্ত করার কৃতিত্ব এখন চিনের এই প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট তথা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের মুকুটে উজ্জ্বল পালক। কমিউনিস্ট চিনে মাও জে দং, দেং জিয়াওপিংয়ের পরই যাঁর নাম উচ্চারিত হচ্ছে।

সমুদ্রের নীচ দিয়ে যান চলাচলের রাস্তা

এই সাফল্যকেই এখন পিছিয়ে থাকা বিশ্ব, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথ বা অনুন্নত দেশগুলির কাছে দারিদ্রমুক্তির উপায় হিসাবে তুলে ধরতে চাইছেন বেজিংয়ের কর্তারা। দেশে উৎপাদিত পণ্যের বিদেশের বাজারে বিক্রির পথ তৈরিতে দেশে দেশে নিজের টাকায় পরিবহণ পরিকাঠামো নির্মাণ করছে চিন। এটাকেই তারা উন্নয়ন সহযোগী বা বন্ধু হওয়া বলছে। সোভিয়েl ইউনিয়নের পতনের আগে পর্যম্ত ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ রাজনীতিতে বহুল প্রচলিত কথা ছিল। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের রাশিয়া ও চিনপন্থীরা একে অপরকে সামাজিক সাম্রাদ্যবাদীদের দোসর বলে গাল পারত। লেনিনের কথায়, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীরা কথায় সমাজতান্ত্রিক, কাজে সাম্রাজ্যবাদী। সেই লেনিনের দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে চিন এই বলে গালমন্দ করত, দেশটি নিজেদের সাম্যবাদী ও প্রগতিশীল হিসেবে তুলে ধরে বটে, আসলে কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী।

দেং জিওয়াপিং যেমন মনে করতেন বিড়াল সাদা না কালো সেটি বিচার্য নয়, দেখতে হবে সেটি ইঁদুর মারতে পারে কিনা। সোজা কথায় চিনা অর্থনীতির দুয়ার খুলে দিয়ে বার্তা দিয়েছিলেন ধনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র নিয়ে বিতর্কের আফিমে বুঁদ হয়ে থাকার পক্ষপাতী নন তিনি। পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের অভিযানে নেমে ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট নিধনকারী সুহার্তোর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সালিম গোষ্ঠীর হাত ধরে পার্টি এবং বাম মহলের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। জবাবে বলেছিলেন, টাকার কোনও রং হয় না। শি জিনপিং তাঁর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে বাণিজ্য জালে আবদ্ধ করতে চান। দেশগুলি সোশ্যালিস্ট, নাকি ক্যাপিটালিস্ট তা নিয়ে মাথার চুল ছিঁড়তে নারাজ তিনি।

এভাবেই আসলে প্রাচীন ‘সিল্ক রুট’ ফেরাতে চাইছেন বেজিংয়ের বর্তমান কর্ণধারেরা। যে পথ ধরে এক সময় কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তানের মতো মধ্য এশিয়া, পূর্ব এশিয়ার দেশ চিন, জাপান, মঙ্গোলিয়া এবং দুই কোরিয়া, ভারতীয় উপমহাদেশ এবং পশ্চিম এশিয়া অর্থাৎ আরব দুনিয়া হয়ে পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ ইউরোপ পর্যন্ত বাণিজ্য চলত।  

দেশের বাণিজ্য সহযোগী ব্যাঙ্কগুলিকে এজন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে দু-হাতে অর্থ সহায়তা দিয়ে আসছে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। তার কল্যাণে বিআরআই সঙ্গী, সহযোগী দেশগুলিকে স্বল্প সুদে ঢালাও ঋণ দিচ্ছে চিনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাঙ্ক-সহ বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি। শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মলদ্বীপ, মঙ্গোলিয়ার মতো বহু দেশ চিনের এই ঋণজালের অংশ। তালিকায় আছে আফ্রিকার বেশ কিছু দেশও।

যে দেড়শোটির বেশি দেশের সঙ্গে চিন বিআরআই-বোঝাপড়া গড়ে তুলেছে ভারত তার অংশী নয়। নয়াদিল্লির কূটনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিআরআই-কে হাতিয়ার করে বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে চিন তাদের পণ্য বিক্রির পথ সুনিশ্চত করতে চাইছে। নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য এটিকে ভূ–কৌশলগতসহ বৈদেশিক নীতির হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করতে চান বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। চিনের এই উন্নয়ন সহযোগিতামূলক বিদেশ নীতিকে ভারতের কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ ‘বাজার সাম্রাজ্যবাদ’-এর মডেল বলছেন।

কিন্তু চিনের কাছে বিআরআই এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ২০১৭ সালে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) এটি তাদের কর্মসূচি এবং দেশের ১৪তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। বলাইবাহুল্য কোভিড মহামারীর জেরে বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যের এই মহাসড়ক তৈরির উদ্যোগ অনেকটা ধাক্কা খেয়েছে। গতি হারিয়েছে চিনের ‘ঋণ-কূটনীতি’ বা ‘ডেট ডিপ্লোম্যাসি’।

কী এই কূটনীতি? এটা অনেকটা ব্যাঙ্ক থেকে ফোন করে লোন নেওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করার মতো। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বাধীন চিনের এই কৌশলের বিপরীতে ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জি-৭ ভুক্ত দেশগুলি দেশের সীমানা ছাপিয়ে বাণিজ্য পরিকাঠামো তৈরির মাধ্যমে সহযোগিতার জাল বিস্তারের কর্মসূচি নিয়েছে। যে কারণে বেজিংকে বিআরআই নিয়ে নতুন করে ভাবাচ্ছে।

যেমন ইরানের চাবাহার বন্দর। এই বন্দর নিয়ে গত বছর ভারত ও ইরান দশ বছর মেয়াদি চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী আগামী দশ বছর চাবাহার শাহিদ বেহেস্তি বন্দর পরিচালনা করবে ভারত। এজন্য ‘ইন্ডিয়া পোর্টস গ্লোবাল লিমিটেড’ এবং ইরানের ‘পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের’ মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ইরান-পাকিস্তান সীমান্তে অবস্থিত এই বন্দর ভারতের ভূ-কৌশলগত কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্দর ব্যবহার করেই করোনার সময় ভারত পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তানে খাদ্যসামগ্রী পাঠিয়েছিল।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইতিমধ্যে ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ জাহাজ এবং রেল সংযোগ করিডোর চালু করার কথা ঘোষণা করেছেন। অন্যদিকে, চাবাহার বন্দর হয়ে ভারত, ইরান, আফগানিস্তান, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, রাশিয়া, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের জন্য ৭,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ জাহাজ, রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।  রুটে ভারতের পক্ষে ইউরোপে পৌঁছানো সহজ হবে। আসন্ন প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতেই চিন দেশের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো বিস্তারকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। পরিকাঠামো, পরিষেবার সুবিধা প্রদানে এক দেশ অভিন্ন সুবিধা ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করেছে অনেকটাই।

চলবে।


```