
হায়াও মিয়াজাকি
শেষ আপডেট: 30 March 2025 19:41
তখনও গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়নি ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। সবে ষষ্ঠ সর্গ লেখা শেষ করেছেন মধুসূদন দত্ত। সেই সময় বন্ধু গৌরদাস বসাককে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন:
“I got a severe attack of fever and was laid up for six or seven days. It was a struggle whether Meghanad will finish me or I finish him. Thank Heaven. I have triumphed. He is dead, that is to say, I have finished the VI Books in about 750 lines. It cost me many a tear to kill him.”
মধুসূদন লিখেছিলেন স্বপ্নের নায়ক মেঘনাদের মৃত্যু নিয়ে৷ যাঁর বীরত্বব্যঞ্জক চরিত্র এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, তিনি পক্ষ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। সজ্ঞানে, সরবে। প্রশ্ন তুলেছিলেন রাম ও লক্ষ্মণের ক্ষাত্রজনোচিত আচরণ নিয়ে৷ এতদিন ধরে যাঁরা বীর হিসেবে বন্দিত হয়ে এসেছেন তাঁদের বীরত্বকে কাপুরুষতা বলে দেগে দেন মধুকবি। প্রকৃত নায়ক হিসেবে বরণ করে নেন মেঘনাদকেই। তাঁর অন্তিমশয়ানের দৃশ্যকল্প লিখতে বসে কান্না ধরে রাখতে পারেননি মধুসূদন। আক্রান্ত হয়েছিলেন জ্বরে। সপ্তাহকাল শয্যাশায়ী। তারপর চোখের জল মুছে লিখেছিলেন অমর পঙক্তিমালা: “লঙ্কার পঙ্কজ-রবি গেলা অস্তাচলে।/ নির্ব্বাণ পাবক যথা, কিম্বা ত্বিষাম্পতি/ শান্তরশ্মি, মহাবল রহিলা ভূতলে।”
আজ, ২০২৫ সালে, যে কোনও কিছুর, তা যতই ক্লাসিক কিংবা সমুন্নত হোক না কেন, রেপ্লিকা বা ক্লোন রচনা করা সম্ভব৷ কয়েক প্রজন্ম আগের চিত্রকর্ম থেকে উপন্যাস, মহাকাব্য থেকে ধ্রপদীসংগীত—চ্যাটজিপিটি মারফত সবই প্রায় একই ভঙ্গি, একই সুর, তাল, লয় সমেত নতুন অবতারে আমার, আপনার সামনে উপস্থিত হবে।
এই বিনির্মাণ বা পুনর্নিমাণ ঠিক না ভুল, ঠিক হলে কতটা ঠিক, ভুল হলে কতখানি ভুল—সেই বিতর্কে যাওয়ার আগে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ফেলা যাক: এআই কি পারে পুরনো সৃষ্টিকে অবিকল্পভাবে পুনরুজ্জীবিত করতে? তার সমগ্র আত্মাই কি নতুন রচনাটিতে নিখাদ রূপে উঠে আসে? আজ বাদে কাল ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র ধ্রুপদী রেপ্লিকা লিখতে বললে চ্যাটজিপিটি অমিত্রাক্ষর ছন্দের শৈলীকে অবিকৃত রেখে না হয় তার একখানি ক্লোন বানিয়ে দিল, কিন্তু তা মধুসূদনের হাহাকার, তাঁর বেদানাভারাতুর কণ্ঠের কতটুকু অনুকরণ করতে সক্ষম? ‘ক্লোনড মেঘনাদবধ’-ও কি একইভাবে চোখের জলে সিক্ত হবে? ‘মহাবল রহিলা ভূতলে’—উচ্চারণে যে অন্তরালশায়ী অনি:শেষ শূন্যতা রয়েছে, তার প্রতিরূপটিও কি এআইয়ের অ্যালগরিদম হুবহু তুলে ধরতে পারবে?
এই প্রশ্নটিই রাখা হয়েছিল হায়াও মিয়াজাকির সামনে। মিয়াজাকি একজন জাপানি চিত্রপরিচালক ও অ্যানিমেটার। ২০১৬ সালে তাঁকে নিয়ে বানানো হচ্ছিল একটি তথ্যচিত্র। সেখানে কথাচ্ছলেই উঠে আসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গ৷ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগে তাঁর এযাবৎকালের অ্যানিমেশনগুলি সম্ভাব্য কী কী চেহারা নিতে পারে, তারই ডেমনস্ট্রেশন পেশ করা হয় মিয়াজাকির সামনে। যা দেখামাত্র সাবেকি অঙ্ক ও উন্নততম প্রযুক্তির কারিকুরির এই খেলাটিকে নাকচ করে দেন মিয়াজাকি। বলেন, ‘এসমস্ত জিনিস দেখতে পারব না। আমায় এগুলো মোটেও আকৃষ্ট করেনি। যাঁরা বানিয়েছেন, তাঁরা যন্ত্রণা কী—সেটা মোটেও উপলব্ধি করেননি। আমি ভীষণ হতাশ৷ যদি তুমি সত্যি সস্তা কাজ করতে চাও, তাহলে এগিয়ে যাও, করে ফেল। কিন্তু আমি কোনওদিন নিজের কাজে এমন প্রযুক্তিকে কাজে লাগাব না।’
Since this utter garbage is trending, we should take a look at what Hayao Miyazaki, the founder of Studio Ghibli, said about machine created art. https://t.co/1TMPcFGIJE pic.twitter.com/IvaM9WZL3T
— Nuberodesign (@nuberodesign) March 26, 2025
মিয়াজাকির দীর্ঘ কয়েক দশক পরিশ্রমের ফসল স্টুডিও ঘিবলি। ‘মাই নেবর তোতোরো’ (১৯৮৮), 'স্পিরিটেড অ্যাওয়ে' (২০০১), 'দ্য বয় অ্যান্ড দ্য হেরনে'-র মতো অ্যানিমেশন ফিল্মের আঁতুড়ঘর৷ জিতেছেন অজস্র খেতাব, যার মধ্যে সর্বোচ্চ সম্মান অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস পর্যন্ত রয়েছে৷ হিসেব বলছে আজ পর্যন্ত সাকুল্যে ২৫ খানা ফিল্ম, টিভি শো, শর্ট ফিল্ম, বিজ্ঞাপন ও ভিডিয়ো গেম প্রকাশ করেছে স্টুডিওটি। দ্বিমাত্রিক (2D) অ্যানিমেশন। যার রং-রেখার বিন্যাস, পটভূমি, ডিটেলিং, চরিত্রদের অভিব্যক্তির বাস্তবতা সব দিক দিয়ে অনন্য, অ-ভূতপূর্ব। যন্ত্রের দাসত্ব না মেনে পেন-পেন্সিল-কাগজে হাতে-আঁকা অ্যানিমেশন পর্দায় চিত্ররূপ পেত। মগজের কসরত, অনুভূতির নির্যাস ছেঁকে আশিতাকা, কাওনাশির মতো চরিত্রদের গড়ে তোলেন মিয়াজাকি৷ ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’-র স্বপ্নমেদুর ব্যাকগ্রাউন্ড কোনও অঙ্ক কষে নয়, রঙের তুলিটি নিখাদ অনুভবে চুবিয়ে এঁকে ফেলেছিলেন জাপানি শিল্পী। আজ সেটাই এআইয়ের সর্বাধুনিক আপডেট হাতে হাতে, ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে৷ চ্যাটজিপিটিতে ছাপোষা, রং-ওঠা যে কোনও ছবি ফেলে ঘিবলি স্টুডিওর পছন্দসই ব্যাকগ্রাউন্ড ‘অর্ডার’ করলেই গরমাগরম ‘আইটেম’ ‘ডেলিভার’ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।
মিয়াজাকির শুরুর জার্নিটা কিন্তু এতখানি সহজ ছিল না। তার স্তরে স্তরান্তরে মিশে রয়েছে শৈশবের ঘ্রাণ, যুদ্ধবিরোধিতার জেহাদ ও একটি উড়োজাহাজের উড়ান দেওয়ার গল্প।
‘ঘিবলি' আদতে আরবি শব্দ। যদিও মিয়াজাকি নিজের স্টুডিওর নামটি রেখেছিলেন দুটি ভিন্ন অনুষঙ্গের কথা মাথায় রেখে। প্রথমত, ইতালীয় ভাষায় ‘ঘিবলি’র অর্থ হচ্ছে: সাহারা থেকে ভেসে আসা মরুবায়ু। দ্বিতীয়ত, বিশ্বযুদ্ধের সময় ইতালি এই নামে একটি যুদ্ধবিমান সামনে এনেছিল। ছেলেবেলা থেকেই উড়োজাহাজ নিয়ে মিয়াজাকির অদম্য আকর্ষণ। তাঁর বাবা ইওশিও ছিলেন ‘মিয়াজাকি এয়ারপ্লেনে'র ডিরেক্টর৷ বিখ্যাত মিৎসুবিশি এ৬এম ফাইটার প্লেনের র্যাডার তৈরি করত এই কোম্পানি।
যাই হোক, ‘ঘিবলি’ নামে স্টুডিও হাউজ বানিয়ে মিয়াজাকি জাপানের অ্যানিমেশন দুনিয়ায় একটা দমকা, তাজা, ফুরফুরে বাতাস সঞ্চার করতে চেয়েছিলেন। বানাতে চেয়েছিলেন এমন একগুচ্ছ ফিল্ম, যেটা শুধু দেশের নয়, গোটা দুনিয়ার অ্যানিমেশনপ্রেমীদের অনুভূতির জগৎ, রুচির মর্মমূলে নাড়া দিয়ে যাবে৷
১৯৮৫ সালের ১৫ জুন স্টুডিওর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। যদিও তার আগে চিত্রশিল্প নয়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করেন মিয়াজাকি। ১৯৬৩ সালে বিভিন্ন সংস্থার হয়ে অ্যানিমেটর হিসেবে কাজ শুরু। এরপর দুই বন্ধু ইসাও তাকাহাতা ও তোশিও সুজুকিকে সঙ্গে নিয়ে নিজস্ব স্টুডিওর গোড়াপত্তন। প্রথমজনের উপর নির্দেশ বর্তায় ছবি বানানোর, দ্বিতীয় জন তা প্রযোজনা করবে৷ আর সবকিছুর নেপথ্যে কারিকুরি চালাবেন মিয়াজাকি নিজে।
সাবেকি ধাঁচা অনুসরণ করতে চাননি তিন বন্ধু। কল্পনা, মানবতা ও গভীরভাবে গল্প বোনার দিকেই বিশেষভাবে জোর দেন মিয়াজাকি। ডিজিটাল মাধ্যমকে সজ্ঞানে পরিহার করতে চেয়েছিলেন। সাবেকি অ্যানিমেশনের হয়েই বরাবর সওয়াল করে এসেছেন৷ পর্দার গল্প শুধুই শিশুদের মন ভোলাবে না। তাদের মনে প্রশ্ন জাগাবে। কল্পনার বৃত্তকে আরও প্রসারিত করবে।
‘নাওসিকা অফ দ্য ভ্যালি অফ দ্য উইন্ড’ থেকেই ছায়াছবির অন্দরমহলে জাপানি লোককথা, ম্যাজিক রিয়ালিজম ও মানবরসের ধারা চারিয়ে দিয়েছেন মিয়াজাকি। পুনরাবৃত্ত হয়েছে বেশ কিছু থিম। যার মধ্যে প্রথম সারিতে থাকবে প্রকৃতি। এরপর মানবতা। সবশেষে বয়:সন্ধির নানান সুখ ও অসুখ। পরিবার ও বন্ধুত্বের গল্প বলেছেন মিয়াজাকি৷ আর তাতে কখনও ধাক্কা মেরেছে যুদ্ধবিরোধিতা, কখনও আত্মানুসন্ধানের আর্তি (হাউল'স মুভিং ক্যাসল)। শিল্পায়নের ধোঁয়া কীভাবে কেড়ে নিচ্ছে প্রকৃতি, বদলে দিচ্ছে মানুষের মন—এই বার্তা তুলে ধরেছে ‘প্রিন্সেস মুনোনকি’। আর এই সমস্তকিছুই—স্টাইলাসে নয়—একজন খুঁতখুঁতে, আত্মাভিমানী শিল্পীর মতো পেন-পেপারে এঁকেছেন। এক বছর, দু'বছর ধরে নয়৷ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে৷ সমস্ত চরিত্রের চোখের ইশারা, ঠোঁটের বক্রভঙ্গিমা, গালের টোল টান-টোনসমেত রীতিমতো হাতে বুনে গিয়েছেন এই নিমগ্ন জাপানি শিল্পী। হাল্কা হরিদ্রাভ কালার প্যালেট, স্বপ্নীল ব্যাকগ্রাউন্ড মিয়াজাকির ট্রেডমার্ক। যা ধারণ করে রেখেছে দিনবদলের বার্তা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ পোহাতে হয়েছিল মিয়াজাকির পরিবারকে৷ বারেবারে উৎখাত হয়েছেন তাঁরা। ‘দ্য উইন্ড রাইসেস’, ‘গ্রেভ অফ দ্য ফায়ারফ্লাইস’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা বুঝবেন স্রষ্টার কী সুগভীর যন্ত্রণা থেকে এই দুটি অ্যানিমেশন জন্ম নিয়েছে। ওপেনএআই সবকিছুর প্রতিচ্ছবি হাজির করতে পারে। কিন্তু শিল্পীর যাতনার বয়ান… তা নির্বিকল্প।
‘যন্ত্র যন্ত্রণা বোঝে না’—জানিয়েছিলেন মিয়াজাকি। যতই নিখুঁত হয়ে উঠুক চ্যাটজিপিটি, মধুসূদনের কান্নার, মিয়াজাকির যন্ত্রণার প্রতিকল্প তা কিছুতেই, কোনওদিন তুলে ধরতে পারবে না। একজন অন্তর্মুখী শিল্পীর সৃষ্টির রেপ্লিকা ঠিক এই কারণে অমর্যাদাকর, তার স্রষ্টার প্রতি অশ্লীল ব্যঙ্গ।