আকাশে একদিকে ব্যালিস্টিক মিসাইল, অন্যদিকে আক্রমণকারী ড্রোন - এই পরিস্থিতির মধ্যেই যাত্রীবাহী বিমান চালাতে হচ্ছে পাইলটদের। ফলে ক্রমশ আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে বিমানচালকদের মধ্যে।

বাড়ছে অসামরিক বিমান চলাচলের ঝুঁকি
শেষ আপডেট: 7 March 2026 20:44
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আরব দুনিয়ায় যুদ্ধ যতই তীব্র হচ্ছে, ততই বাড়ছে অসামরিক বিমান চলাচলের ঝুঁকি (Middle East War Aviation Risk)। আকাশে একদিকে ব্যালিস্টিক মিসাইল, অন্যদিকে আক্রমণকারী ড্রোন - এই পরিস্থিতির মধ্যেই যাত্রীবাহী বিমান চালাতে হচ্ছে পাইলটদের। ফলে ক্রমশ আতঙ্ক ও উদ্বেগ বাড়ছে বিমানচালকদের মধ্যে (Pilots Fear Missiles And Drones)।
আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তার জেরে ইরান পাল্টা হামলা চালাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে। এই সংঘাতের প্রভাব পড়ছে সরাসরি আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেও।
আকাশে মিসাইল ও ড্রোনের ভিড়
বর্তমান সংঘাতের জেরে বিশ্বের ব্যস্ততম কয়েকটি বিমানবন্দরের আকাশসীমা এখন কার্যত যুদ্ধক্ষেত্রের মতো (Drone Threat To Commercial Flights)। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আক্রমণকারী ড্রোন। ইরানের পাল্টা হামলার জেরে একাধিক বিমানবন্দরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর ফলে দুবাই থেকে আবু ধাবি পর্যন্ত বহু জায়গায় বিমান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। বর্তমানে কেবলমাত্র সীমিত সংখ্যক উদ্ধারকারী বিমান পরিষেবা চালু রাখা সম্ভব হয়েছে।
সীমিত এয়ারস্পেসে উড়ান, বাড়ছে চাপ
একাধিক পাইলট এবং বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউক্রেন, আফগানিস্তান এবং ইজরায়েলের মতো অঞ্চলে চলা সংঘাতের ফলে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের উপর চাপ অনেক বেড়ে গেছে।
অনেক আকাশপথ এখন বন্ধ বা ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে পাইলটদের বাধ্য হয়ে সীমিত আকাশসীমার মধ্যে দিয়ে উড়ান চালাতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরেও সামরিক ড্রোনের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে, যা ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
“আমরা সামরিক পাইলট নই”
আরব দুনিয়ায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন পাইলট তানজা হার্টার, যিনি ইউরোপিয়ান ককপিট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “আমরা সামরিক পাইলট নই। আকাশে এই ধরনের হুমকির মোকাবিলা করার জন্য আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।”
তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে বিমান চলাচল খাতকে একের পর এক নিরাপত্তা সঙ্কটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ফলে পাইলটদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই মানসিক চাপ ও উদ্বেগ বাড়ছে।
অনেক বিমান সংস্থা এখন পাইলটদের মানসিক চাপ সামলাতে ‘পিয়ার সাপোর্ট প্রোগ্রাম’ চালু করেছে বলেও জানান তিনি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মিসাইলের সঙ্গে একই আকাশ ভাগ করে উড়তে চাই না।”
মিসাইল এড়াতে আরও উঁচুতে উড়ান
লেবাননের সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের প্রধানের মতে, আরব দুনিয়ায় কাজ করা পাইলটরা জরুরি পরিস্থিতি সামলাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছেন।
আগে লেবাননে কাঁধে বহনযোগ্য অ্যান্টি-এয়ারক্রাফ্ট মিসাইলের পাল্লা সাধারণত ১৫ হাজার ফুট পর্যন্ত ছিল। তাই নিরাপদ থাকতে পাইলটরা সাধারণত তার চেয়েও বেশি উচ্চতায় উঠে যেতেন।
অনেক সময় বিমানগুলো অতিরিক্ত জ্বালানিও বহন করে, যাতে প্রয়োজনে অন্য বিমানবন্দরে ঘুরে যাওয়া যায়। তবে বেশিরভাগ মিসাইল হামলাই বিমান চলাচলের পথ থেকে অনেক দূরে ঘটে। ফলে সরাসরি ঝুঁকি তৈরি না হলেও আতঙ্ক থেকে যায়।
ইউরোপেও ড্রোন আতঙ্ক
শুধু আরব দুনিয়াই নয়, ইউরোপেও ড্রোন এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকেই ড্রোন দুই পক্ষের অন্যতম প্রধান অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ইউরোপের স্টকহোম ও মিউনিখের মতো শহরের বিমানবন্দরেও ড্রোনের কারণে বিঘ্ন ঘটার ঘটনা সামনে এসেছে। যদিও এগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের সম্পর্ক আছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ডেনিশ এয়ার লাইন পাইলটস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান এবং ১৫ বছরের অভিজ্ঞ বাণিজ্যিক পাইলট ক্রিশ্চিয়ান ফন ডি’আহে বলেন, ড্রোনের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি সত্যিই উদ্বেগজনক।
তাঁর কথায়, “ড্রোন সহজে ধরা পড়ে না। আকাশে ওগুলো খুব ছোট দেখায়। ফলে কখন না কখন বড় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে।” যদি কোনও ড্রোন বিমানের ইঞ্জিনে আঘাত করে, তাহলে সম্পূর্ণ শক্তি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। ডানায় আঘাত লাগলে বিমানের ভারসাম্যও নষ্ট হতে পারে।
রাডারেও ধরা পড়ে না অনেক সময়
বেশিরভাগ রেজিস্টার্ড বিমানে ট্রান্সপন্ডার থাকে, যা রাডারকে তার পরিচয় জানায়। কিন্তু ড্রোন সাধারণত এমন কোনও সংকেত পাঠায় না। ফলে পাইলটরা তাদের অবস্থান আগাম বুঝতে পারেন না। এমনকি অনেক সময় সাধারণ বিমানবন্দর রাডারেও ড্রোন ধরা পড়ে না।
যদিও ড্রোন শনাক্ত করার জন্য বিশেষ রাডার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে সেগুলি সাধারণত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে।
বিমানবন্দরের হাতে সীমিত বিকল্প
এই পরিস্থিতিতে বিমানবন্দরগুলির হাতে বিকল্পও খুব সীমিত। রাডার, ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সর বা ‘জ্যামিং’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ড্রোন প্রতিরোধের চেষ্টা করা যায়। কিছু প্রযুক্তি ড্রোনকে বিভ্রান্ত করে তার পথ বদলে দিতেও পারে। তবে নিরাপত্তা বিধির কারণে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ড্রোনকে গুলি করে নামাতে পারে না।
জার্মানির এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার টিম ফ্রাইবে বলেন, “ড্রোনের হুমকি ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে বিমানবন্দরগুলির হাতে তেমন কার্যকর ব্যবস্থা নেই।” তাঁর মতে, এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাইলট বা কন্ট্রোলাররা ড্রোন দেখলে রিপোর্ট করেন। কিন্তু অনেক সময় বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।