তদন্তে উঠে এসেছে, ট্রেকিং স্টাফরা চুপিসারে পর্যটকদের খাবার বা পানীয়তে বেকিং সোডা মিশিয়ে দিত। এর ফলে মারাত্মক বমি, বমিভাব, ডিহাইড্রেশন এবং পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিত। অসুস্থ হয়ে পড়লেই গাইডরা জরুরি উদ্ধার অভিযানের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। এরপর ব্যয়বহুল হেলিকপ্টার রেসকিউয়ের ব্যবস্থা করা হত।
.jpg.webp)
নেপাল ট্রেকিং
শেষ আপডেট: 2 April 2026 16:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নেপালের পর্যটন শিল্পে বড়সড় কেলেঙ্কারির (Everest rescue fraud) অভিযোগ সামনে এসেছে, যার ফলে রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছে উপরমহল। তদন্তকারীদের দাবি, বিদেশি পর্যটকদের ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থ করে কোটি কোটি ডলারের বীমা জালিয়াতি চলছিল (Nepal trekking insurance scam)। সেই চক্রে একযোগে হাত মিলিয়ে কাজ করছিল ট্রেকিং গাইড, হাসপাতাল এবং হেলিকপ্টার সংস্থাগুলি।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সুপরিকল্পিত এই চক্র নেপালের জনপ্রিয় হিমালয় ট্রেকিং রুটগুলিতে সক্রিয় ছিল। এর মধ্যে রয়েছে মাউন্ট এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, লাংটাং এবং মানাসলু অঞ্চল।
তদন্তে উঠে এসেছে, ট্রেকিং স্টাফরা চুপিসারে পর্যটকদের খাবার বা পানীয়তে বেকিং সোডা (সোডিয়াম বাইকার্বোনেট) মিশিয়ে দিত। এর ফলে মারাত্মক বমি, বমিভাব, ডিহাইড্রেশন এবং পেটব্যথার মতো উপসর্গ দেখা দিত। এই উপসর্গগুলি দেখতে অনেকটাই উচ্চতাজনিত অসুস্থতার (অ্যাকিউট অল্টিটিউড সিকনেস) মতো হওয়ায় পর্যটকেরা বুঝতেই পারতেন না যে, তাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে অসুস্থ করা হচ্ছে।
কীভাবে চলত এই প্রতারণা?
পর্যটক অসুস্থ হয়ে পড়লেই গাইডরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বাড়িয়ে দেখাতেন এবং জরুরি উদ্ধার অভিযানের জন্য চাপ সৃষ্টি করতেন। এরপর ব্যয়বহুল হেলিকপ্টার রেসকিউয়ের ব্যবস্থা করা হত।
এরপর হাসপাতাল ও হেলিকপ্টার সংস্থাগুলি বীমা সংস্থার কাছে ভুয়ো মেডিক্যাল রিপোর্ট, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো চিকিৎসার বিল এবং জাল উড়ানের নথি জমা দিত। অনেক ক্ষেত্রে একই হেলিকপ্টারে একাধিক রোগী থাকলেও প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে সম্পূর্ণ ভাড়া দাবি করা হতো, যার পরিমাণ প্রতিজনের ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছত।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, একসঙ্গে একাধিক পর্যটককে টার্গেট করা হত যাতে একবারে বেশি টাকা তোলা যায়।
কারা জড়িত?
এই চক্রে ট্রেকিং গাইড ও এজেন্সি, হেলিকপ্টার অপারেটর এবং বেসরকারি হাসপাতাল—সবাই জড়িত বলে অভিযোগ। তদন্তে উঠে এসেছে স্বাকন ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল, শ্রীধি ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতাল এবং এরা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের নাম।
এই জালিয়াতির মডেল ছিল কমিশনভিত্তিক। হাসপাতালগুলি ট্রেকিং এজেন্সি ও হেলিকপ্টার সংস্থাগুলিকে ২০-২৫ শতাংশ কমিশন দিত, আর গাইডরা পেতেন প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অংশ।
কর্তৃপক্ষের অনুমান, এই পুরো চক্রের মাধ্যমে অন্তত ১ কোটি ৯৬ লক্ষ ডলারেরও বেশি বীমা জালিয়াতি হয়েছে। এমনকি এক হেলিকপ্টার অপারেটর একাই ১ কোটি ডলারের বেশি দাবি করেছে বলে অভিযোগ।
কীভাবে ফাঁস হল এই চক্র?
২০২৫ সালের শেষ দিকে এক নাগরিকের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে নেপালের সেন্ট্রাল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো। কয়েক মাসের তদন্তের পর ২০২৬ সালের শুরুতে প্রথম দফায় গ্রেফতারি শুরু হয়।
এরপর ১২ মার্চ কাঠমাণ্ডু জেলা আদালতে ৩২ জনের বিরুদ্ধে সংগঠিত অপরাধ, প্রতারণা এবং রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়।
নতুন নয়, তবে সবচেয়ে ভয়াবহ
নেপালে এর আগেও ‘ভুয়ো’ বা অপ্রয়োজনীয় হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযানের অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে এভারেস্ট অভিযানের মরশুমে। তবে এই ঘটনাটি আলাদা, কারণ এখানে শুধু অতিরিক্ত টাকা নেওয়া নয়, ইচ্ছাকৃতভাবে পর্যটকদের অসুস্থ করে তোলার অভিযোগ উঠেছে।
ঠিক যখন নতুন এভারেস্ট মরসুম শুরু হচ্ছে, সেই সময় এই কেলেঙ্কারি সামনে আসায় পর্যটকদের নিরাপত্তা এবং ট্রেকিং শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এই মামলা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন এবং তদন্ত এগোলে আরও গ্রেফতার হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পর্যটন শিল্পকে স্বচ্ছ ও নিরাপদ করতে প্রশাসনের উপর চাপও বাড়ছে।