
ইজরায়েলের অতন্দ্র প্রহরী 'আয়রন ডোম'। দ্য ওয়াল ফাইল।
শেষ আপডেট: 14 April 2024 20:15
সৌরদীপ চট্টোপাধ্যায়
সত্যিই যাকে বলে লৌহকপাট। নামেও তাই, কাজেও তাই। হিব্রুতে বলে, 'কিপ্পৎ বার্জেল'। কিন্তু ইংরেজি নামটাই সারা পৃথিবীতে পরিচিত। 'আয়রন ডোম'। বিশ্বের অন্যতম সেরা, অন্যতম শক্তিশালী, নিখুঁত, নির্ভুল 'এয়ার ডিফেন্স' ব্যবস্থা। বা, যাকে বলে 'অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম'। শুধু প্রতিরক্ষা নয়, কার্যত ইজরায়েলের অস্তিত্বটাই যেন দাঁড়িয়ে আছে এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থার ওপর।
রবিবার গভীর রাতের ঘটনা যেমন। দিনদুয়েক ধরেই জল্পনা ছিল, দামাস্কাসে ইরানি দূতাবাসের ওপর হামলা চালানোর পাল্টা হিসেবে ইজরায়েলের ওপর আক্রমণ শানাতে পারে ইরান। কিন্তু কখন বা কীভাবে, খোলসা করেনি তেহরান। সাড়া পড়ে গিয়েছিল বিশ্বজুড়ে। প্রবল প্রস্তুতি শুরু হয় ইজরায়েলে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে কোমর বাঁধতে শুরু করেন আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানির কর্তারা। বন্ধ করে দেওয়া হয় অসামরিক বিমান চলাচল। আকাশে টহল দিতে শুরু করে মার্কিন ও ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান। ভারত-সহ একাধিক দেশ তাদের নাগরিকদের ইজরায়েলে যেতে বা গেলে বড় শহর থেকে বেরোতে নিষেধ করে দেয়।
শেষে, আশঙ্কা সত্যি করে, মধ্যরাতে শুরু হয় হামলা। বৃষ্টির মত ইজরায়েলের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করে 'শয়ে 'শয়ে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র।
কিন্তু সকাল হ'তেই ইজরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রক ও সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ড্যানিয়েল হাগারি জানিয়ে দিলেন, প্রায় সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোনকেই সফলভাবে আটকাতে পেরেছে ইজরায়েল। বেশিরভাগ নাকি ইজরায়েলের আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা নেহাত আকাশে কিছু আলোর ঝলকানি আর বিস্ফোরণের শব্দ ছাড়া তেমন কিছুই টের পাননি। তেল-আভিভের বাসিন্দা, প্রবাসী বাঙালি কথা ভট্টাচার্য যেমন দ্য ওয়ালকে বললেন, 'এখানে অবস্থা কিন্তু সবই স্বাভাবিক। কাল রাতে কিছু একটা হয়েছিল, যাতে আমরা ঘুমোতে পারিনি, ব্যাস। এটুকু বাদ দিলে আজ সকাল থেকেই সবই স্বাভাবিক!'
আর এই পুরোটাই সম্ভব হয়েছে কেবলমাত্র ইজরায়েলের অত্যাধুনিক, বহুমূল্য এই এয়ার-ডিফেন্স ব্যবস্থার জন্য।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ভাষায় একে বলে 'সি-র্যাম'। অর্থাৎ, 'কাউন্টার রকেট-আর্টিলারি-মর্টার'। আজকের দুনিয়ায় গায়েগতরে খেটে হামলা চালানো ক্রমশ অতীত। এখন কিছুই লাগে না, কম্পিউটারের সাহায্যে নিখুঁত অঙ্ক কষে শুধুমাত্র মিসাইল বা ড্রোনের মত মানুষ-বিহীন যানে বিধ্বংসী অস্ত্র ভরে আক্রমণ করা যায়। এতে ঝুঁকি কম, কিন্তু আচমকা, অতর্কিতে এরকম হামলা হয় বলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশি থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশে এখন যুদ্ধের অন্যতম 'জনপ্রিয়' হাতিয়ার এরকম রকেট, ড্রোন বা মর্টারের মত ক্ষেপণাস্ত্র। যাকে আটকাতে বিশেষভাবে দক্ষ এই 'আয়রন ডোম' ব্যবস্থা।
নব্বই দশকে লেবাননের সঙ্গে ইজরায়েলের সংঘাতের সময় থেকেই ইজরায়েলি সেনাকর্তারা এরকম একটা ব্যবস্থার কথা ভাবছিলেন। তখন ইজরায়েলের একাধিক শহরকে লেবাননের হেজবোল্লার মুহুর্মুহু রকেট হানার মুখে পড়তে হয়েছিল। বস্তুত, সামরিক শক্তিতে ইজরায়েলের সেনাবাহিনী বহু যোজন এগিয়ে থাকলেও, রকেট হামলার মুখে ইজরায়েলি কর্তাদের কপালের ভাঁজ চওড়া হয়। প্রভূত ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়ে হাইফার মত একাধিক ছোট-বড় শহর। সেই চিন্তার জায়গা থেকেই ২০০৬ সালে জন্ম নেয় 'আয়রন ডোম'। প্রথমে ইজরায়েলের এরোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি, পরে 'রাফায়েল অ্যাডভান্স ডিফেন্স সিস্টেমস' সংস্থার হাতে নকশা ও গবেষণার দায়িত্ব বর্তায়। বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে সাহায্য করে আমেরিকা।
এই ব্যবস্থায় মোট চারটি ধাপ থাকে। প্রথম ধাপে থাকে অত্যাধুনিক র্যাডার। শত্রুপক্ষের তরফে অতর্কিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলেই যত সেটা এগোতে থাকে, রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে দ্রুততার সঙ্গে তার অবস্থান ধরে ফেলে আয়রন ডোমের র্যাডার। সেই তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে যায় তার মূল কেন্দ্রীয় মাস্টার কন্ট্রোলে। সেখানে কম্পিউটার ব্যবস্থায় দ্রুত হিসেব করা হয় তার সম্ভাব্য যাত্রাপথ এবং শেষ অবধি কোথায় আছড়ে পড়তে পারে, তার অবস্থান।
পরের ধাপে আসল খেলা শুরু হয়। ইজরায়েলের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো রয়েছে আয়রন ডোমের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার 'ব্যাটারি'। যে কোনও পরিস্থিতিতে, যে কোনও আবহাওয়ায় যাকে সক্রিয় করা যায়। এক-একটি ব্যাটারিতে তিন থেকে চারটি 'লঞ্চার' থাকে, যা থেকে একেবারে ২০-টি 'ইন্টারসেপ্টর' বা পাল্টা আটকানোর ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেতে পারে। মোটামুটি কন্ট্রোল থেকে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য যাত্রাপথ এলেই সেই হিসেব কষে নিকটতম 'আয়রন ডোম' ব্যবস্থার অন্তর্গত ব্যাটারি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৪ থেকে ৭০ কিলোমিটার আকাশসীমার মধ্যে এলেই উল্কার বেগে তা উড়ে যায় ধেয়ে আসা ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে। মাটিতে আছড়ে পড়ার আগে মাঝ-আকাশেই ধ্বংস হয়ে যায় সেটা।
ইজরায়েলের সেনাকর্তাদের দাবি, আয়রন ডোমের সাফল্যের হার ৯০ শতাংশের বেশি। হামাস এবং হেজবোল্লাহ, ইজরায়েলের উত্তর ও দক্ষিণের দুই শত্রু প্রতিবেশী নিয়মিত রকেট হামলা চালিয়ে থাকে। কিন্তু ২০১১ সালে প্রথমবার গাজা থেকে ধেয়ে আসা একটি ক্ষেপণাস্ত্রকে আটকায় আয়রন ডোম। তারপর থেকে নাগাড়ে চলছে তার কাজ। গাজা ও লেবানন থেকে ধেয়ে আসা হাজার চারেকের বেশি ক্ষেপণাস্ত্রকে আজ অবধি সফলভাবে আটকেছে তারা। যদিও সবসময় তা নিখুঁত হয় না। বিশেষ করে হামাস আয়রন ডোমকে পাশ কাটাতে একসঙ্গে অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার কায়দা নিয়েছে। কিন্তু মোটের ওপর আয়রন ডোম ইজরায়েলের বড় বড় শহরগুলোকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে।
সংবাদসংস্থা এএফপির একটি সূত্র বলছে, 'আয়রন ডোম' ব্যবস্থার প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর বানাতে গড়ে প্রায় ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ মার্কিন ডলার খরচ পড়ে। মোটামুটিভাবে রাডার, কন্ট্রোল ও ব্যাটারি, সব মিলিয়ে খরচ হয় ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মত। মোট ১০-টি এরকম ব্যাটারি রয়েছে ইজরায়েল জুড়ে। যদিও এই ব্যবস্থাও যথেষ্ট নয়। ওয়াশিংটনের বিভিন্ন সূত্র বলছে, ঘাটতি মেটাতে ইজরায়েলের পাশে রয়েছে আমেরিকা। আরও শক্তিশালী 'প্যাট্রিয়ট' বা 'থাড' এয়ার-ডিফেন্স ব্যবস্থা দেওয়া হবে তেল আভিভকে।