দ্য ওয়াল ব্যুরো: সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতার পুরস্কার হিসেবে পুলিৎজার খেতাব জিতলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত সাংবাদিক মেঘা রাজাগোপালন। প্রতি বছর ২১টি বিভাগে শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি হিসেবে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। এ বছর সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য যা মেঘার হাতে এল।
অনলাইন প্লাটফর্ম 'বাজফিডে'র কর্মী মেঘা অনেক দিন থেকেই নজর রেখেছিলেন চিনের জিনজিয়াং প্রদেশে। ২০১৭ সালে হঠাৎ চাউর হয়, জিনজিয়াংয়ের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ডিটেনশন ক্যাম্প তৈরি করেছে জিনপিং সরকার। আর সেখানে কাতারে কাতারে সংখ্যালঘু মুসলিমদের নাকি ধরেবেঁধে কয়েদ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এই খবর প্রচারিত হলেও চিন সমস্ত অভিযোগ নাকচ করে। সত্যাসত্য বুঝে নিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই চিনে পাড়ি দিয়েছিলেন মেঘা। আসল গন্তব্য জিনজিয়াং। সেখানে পৌঁছে ক্যাম্পের আনাচে কানাচে ঘুরে দেখার চেষ্টা করেন। যদিও সেবার খুব একটা সফল হননি।
উল্টে সমস্ত বিষয়টি কানে যেতেই প্রশাসন ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। মেঘার ভিসা বাতিল করে দেওয়া হয়। তাঁর চিনে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে সরকার। কিন্তু ততদিনে কিছু তথ্য হাতে এসেছে। বাকি খামতিটুকু প্রযুক্তির সাহায্যে মিটিয়ে নেন মেঘা। পাশে পান দু'জনকে। তাঁদের একজন পেশায় স্থপতি। নাম— অ্যালিসন কিলিং। অন্যজন ক্রিস্টো বুসচেক। সফটওয়্যার ডেভেলপার। তাঁদের সাহায্যে ডিটেনশন ক্যাম্পের পর্দাফাঁস করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রস্তুত করেন মেঘা। তারই স্বীকৃতি শুক্রবারের পুলিৎজার।
কিন্তু টেবিল-চেয়ারে বসে এতবড় ষড়যন্ত্রের মুখোশ খোলা হল কী করে? বাজফিডের তরফে জানানো হয়েছে, তিনজনের টিম প্রথমেই জিনজিয়াং প্রদেশের স্যাটেলাইট ইমেজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। জানা যায়, গোটা এলাকা নাকি আয়তনে আলাস্কার চেয়েও বড়। আর এই প্রকাণ্ড অঞ্চলেই ক্যাম্প বানিয়ে প্রায় ১০ লক্ষ উইঘুর, কাজাখ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিমদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে— কোথায়?
তাই এরপরের ধাপ ছিল আসল এলাকা খুঁজে বের করা। তার জন্য ম্যাপিং সফটওয়্যারকে কাজে লাগানো হয়৷ সবশেষে তন্নতন্ন করে খানাতল্লাশি চালিয়ে ২৬০টি বিন্ডিংকে বেছে নেন তাঁরা। এসবের কোথাও ১০ হাজার বন্দিদের আটকে রাখা হত। কোথাও কারখানা বানিয়ে তাদের অমানুষিক পরিশ্রম করানো হত।
কিন্তু স্রেফ গোলটেবিল বৈঠক আর মিটিং-আলোচনায় তো খাঁটি সাংবাদিকের আগ্রহ মেটে না। এদিকে ততদিনে চিনে যাওয়াও মানা। বাধ্য হয়ে মেঘা হানা দেন কাজাখস্তান। কথা বলেন প্রায় ২৪ জন উদ্বাস্তু চিনা মুসলিমের সঙ্গে৷ যাঁরা কখনও না কখনও সেই ডিটেনশন ক্যাম্পের 'সাজা' ভুগেছেন।
মেঘা জানান, তাঁর আসল চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্বাস অর্জন। ঘরবাড়ি হারানো, দেশছাড়া মানুষেরা কেনই বা এক উটকো সাংবাদিককে ভরসা করবেন? কিন্তু ধৈর্য হারাননি মেঘা। দিনের পর দিন গেছে। কোনও সাফল্য আসেনি। কেউ টুঁ শব্দটি করেনি। তবু হাল ছাড়েননি তিনি। শেষে একদিন 'নিজেদের লোক' মনে করে অতীতের জ্বালাযন্ত্রণার সবকিছু উগড়ে দিয়েছেন বাস্তুহারা মানুষেরা। জানিয়েছেন ক্যাম্পের খুঁটিনাটি— যতটুকু নজরে এসেছে।
তাই শুক্রবার পুরস্কার জয়ের পর তাঁদের কথা ভোলেননি মেঘা। ধন্যবাদ জানিয়েছেন বাজফিডের আধিকারিক ও কর্মীদের। কুর্নিশ জানিয়েছেন 'মিশনে'র সহযোদ্ধাদের। আর সবশেষে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সেই সমস্ত স্বজনহারা মানুষদের, যাঁরা 'সংখ্যালঘু' হওয়ার অপরাধে ক্যাম্পের নির্যাতন মুখ বুজে সহ্য করেছিলেন। তারপর যাবতীয় ট্রমা আড়ালে রেখে একদিন তাঁর সঙ্গে কথা বলতে রাজি হন।