
ফাসানো শহরের এই হোটেলেই হবে জি৭ সম্মেলন। (ছবিঃ গেটি ইমেজেস)
শেষ আপডেট: 11 June 2024 18:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁদের দু'জনের সখ্যতাকে নেটদুনিয়ায় অনেকেই বলেন 'মেলোদী'। দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হোক বা আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে এক মঞ্চে থাকার সুযোগ হলেই ঠিক কুশল বিনিময় করে যান ইতালীয় প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। দুবাইতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনের ফাঁকে মেলোনির তোলা সেলফি রীতিমত নেটদুনিয়ায় তোলপাড় ফেলেছিল। মোদীকেও দেখা গিয়েছে, খোশমেজাজে মেলোনির সঙ্গে গল্প করছেন। এমনিতে রাজনৈতিক মেরুতেও মেলোনি ও মোদী প্রায় একই দিকে। ইতালির দক্ষিণপন্থী শাসক দল 'ফ্রাতেল্লি দে ইতালিয়া' বা 'ব্রাদার্স অফ ইতালি'-র প্রধান তিনি। লোকসভা নির্বাচনে মোদীর আশানুরূপ জয় না হলেও মেলোনিই প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান, যিনি মোদীকে এক্স হ্যান্ডলে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বলে জানে কূটনৈতিক মহল।
এবার ভোটে জিতেই মোদী তাঁর তৃতীয় দফায় প্রথম বিদেশ সফরেই ছুটবেন মেলোনির আমন্ত্রণে। তাও যে-সে ব্যাপার নয়। দস্তুরমত জি৭ সম্মেলনে ইতালির আমন্ত্রিত অতিথি ভারত।
বিশ্বের সবচেয়ে কুলীন, মহাশক্তিধর দেশগুলির সম্মেলন জি৭। যার সদস্যভুক্ত দেশ আমেরিকা, কানাডা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান, ইতালি ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এবারে জি৭ সম্মেলনের আয়োজক ইতালি। তবে প্রতিবারই পৃথিবীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দেশকে অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানায় জি৭। এবারে যেমন আর্জেন্তিনা, ব্রাজিল, মিশর, তুরস্ক, সৌদি আরব-সহ একাধিক দেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ইতালি। ভারতও তার মধ্যে রয়েছে। আগেরবার জাপানের হিরোশিমায় জি৭ সম্মেলনেও হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। এবারেও তিনি যাবেন বলে জানিয়েছে সাউথ ব্লক। মেলোনির সঙ্গে মোদীর আলাদা বৈঠক হবে কিনা সেদিকেও তাকিয়ে কূটনৈতিক মহল।
তবে জি৭ সম্মেলনের মত হাইভোল্টেজ সম্মেলন যেখানে হবে, এবার সেই শহরকে নিয়েই জোরদার প্রশ্ন উঠে গিয়েছে।
এমনিতেই ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে ইতালি মাফিয়া-রাজের জন্য অন্যতম কুখ্যাত। সিসিলি দ্বীপ মাফিয়াদের জন্য রীতিমত বিখ্যাত। মারিও পুজোর বিখ্যাত উপন্যাস 'দ্য গডফাদার'-এর প্রধান চরিত্র ডন ভিতো কোরলিওনির শিকড় সিসিলির কোরলিওনি শহরে। ফ্রান্সিস ফোর্ড কপোলার ছবিতে মার্লন ব্র্যান্ডো যার চরিত্রে অভিনয় করে সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। বস্তুত, 'মাফিয়া' শব্দটারই জন্ম সিসিলিতে। সিসিলি ছাড়াও দক্ষিণ ইতালির একাধিক উপকূলবর্তী শহর নেপলস, ক্যামব্রিয়া, কাম্পানিয়া ইত্যাদি একাধিক শহর মাফিয়াদের জন্য কুখ্যাত। ইতালির প্রশাসনকেও রীতিমত তটস্থ থাকতে হয়।
এবারের জি৭ সম্মেলনের আসর বসছে দক্ষিণ ইতালির আপুলিয়া বা পুলিয়া অঞ্চলের ফাসানো বলে একটি ছোট্ট শহরে। মাত্র হাজার চল্লিশেক লোকের বাস। একদিকে আদ্রিয়াটিক সাগর, অন্যদিকে আয়নীয় সাগর। ছবির মত সুন্দর এই উপকূল শহরের নামজাদা পাঁচতারা হোটেল 'বরহো এয়নাজিয়া'-তে বসবে সম্মেলনের আসর। এদিকে গত মাসেই আপুলিয়া অঞ্চলের একটি শহর নেভিয়ানোর প্রশাসনিক সভাকে বাতিল করে দেয় স্থানীয় এক আদালত। অভিযোগ, সভার প্রশাসনিক সদস্যরা মাফিয়ার দ্বারা প্রভাবিত।
সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস সূত্রে খবর, এরকম একটা খবর কিন্তু ইতালির জনমানসে আদৌ কোনও প্রভাব ফেলে না। তার একটা বড় কারণ, প্রায়ই এরকম খবর আসে সংবাদমাধ্যমে। প্রায়ই দেখা যায়, শহরের পৌরসভা বা অন্যান্য প্রশাসনিক সভাকে বাতিল করে দেওয়া হয়। অভিযোগ ওঠে, সদস্যদের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে মাফিয়া দলের কেউ। বড় বড় সরকারি কাজের বরাত যায় মাফিয়াদের মাধ্যমে। জমি দখল, নির্মাণ প্রকল্প, রিয়েল এস্টেট ইত্যাদি দখলদারিতে মাফিয়াদের প্রভাব মারাত্মক। যে অঞ্চলে এবার জি৭ সম্মেলন হবে, সেই আপুলিয়া বা পুলিয়া অঞ্চল এই ব্যাপারে সারা দেশে চতুর্থ। ১৯৯১ সাল থেকে ২৬ বার আপুলিয়ার বিভিন্ন পৌর সংস্থাকে মাফিয়া ঢুকে পড়ার অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে।
১৩ জুন থেকে ১৫ জুন অবধি হবে জি৭ সম্মেলন। নরেন্দ্র মোদী গিয়ে পৌঁছবেন ১৪ জুন। কিন্তু তার আগে থেকে আপুলিয়ার প্রাদেশিক রাজধানী বারি বা ব্রিন্দিসির মত অন্যান্য বড় শহরে দিনের আলোয় চলছে বিভিন্ন মাফিয়া গোষ্ঠীর সংঘর্ষ। চোখের সামনে গাড়ি দখল করে নেওয়া থেকে ছিনতাই, হামলা সবেতেই এই অঞ্চল কুখ্যাত। উদ্বেগজনক ভাবে বেড়েছে খুনোখুনির হার। সংবাদসংস্থা সিএনএন জানিয়েছে, মার্চে বারি শহরের কাছে একটি রেলস্টেশনে একটি ব্রিফকেসে এক বোতল তরল বিস্ফোরক একটি বিপজ্জনক সেলফোন মিলেছিল। তারপর থেকে বোমার হুমকি কার্যত প্রতিদিনই আসছে এই তল্লাটে। অবস্থা এতদূর গিয়েছে যে, ইতালির অভ্যন্তরীণ মন্ত্রক রীতিমত সেনা নামানোর কথাও ভাবছে। ৫০০০ বিশেষ নিরাপত্তাবাহিনীকে দিয়ে পাঁচতারা হোটেল সংলগ্ন পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছে।
এই অবস্থায় জি৭-এর মত সম্মেলন আয়োজন নিয়ে চিন্তা বাড়ছে স্থানীয় পুলিশের। তাবড় রাষ্ট্রপ্রধানরা আসবেন। প্রত্যেকের জন্য আলাদা নিরাপত্তা দেওয়া হবে। নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে আগে থেকে তাঁদের নিরাপত্তারক্ষীরা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে যাবেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের জন্য যেমন আগাগোড়া সবটা খতিয়ে দেখবে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস। তাঁর জন্য এলাহি বন্দোবস্ত করা হয়েছে। রীতিমত একটি বিমানবাহী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন থাকবে ইতালির উপকূলে। পোপ ফ্রান্সিস, সৌদি আরবের রাজা সলমন, তুর্কি প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইপ এর্দোগানের নিজস্ব নিরাপত্তা আধিকারিকরা অবস্থা খতিয়ে দেখছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জন্যও কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখবে এসপিজি। 'মেলোডি' সাক্ষাতের আগে অতএব যাতে কোনওভাবে মাফিয়া চোনা ফেলে দিতে না পারে, সেদিকেই নজর এখন ইতালির।