
মার্কিন বিদেশ সচিব।
শেষ আপডেট: 27 June 2024 11:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কুড়ি দিনও কাটেনি নরেন্দ্র মোদী তৃতীয়বারের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। সংসদীয় রাজনীতির প্রথা মেনেই দেশে বিরোধীরা এখনও তাঁর বিরুদ্ধে তেমন একটা সরব হয়নি। কিন্তু মোদীর অস্বস্তি শতগুণ বাড়িয়ে দিল ‘বন্ধু’ আমেরিকা। স্বয়ং মার্কিন বিদেশ সচিব অ্যান্টনি ব্লিংকেন হোয়াইট হাউসে সাংবাদিক বৈঠক ডেকে বলেছেন, ভারতে ঘৃণা ভাষণ বাড়ছে। সে দেশে সংখ্যালঘুরা বিপন্ন। তাদের উপাসনাস্থল ভেঙে দিয়ে ধর্মাচরণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।’
ব্লিংকেন এমন সময় এই কথা বলেছেন, যখন ভারতে সদ্য গঠিত১৮ তম লোকসভার প্রথম অধিবেশন উপলক্ষে সংসদে যৌথ সভায় ভাষণ দিতে চলেছেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা ভোটের পর নতুন সংসদ গঠিত হয়েছে। এমন সন্ধিক্ষণে প্রধানমন্ত্রীর কথায় ‘বন্ধু দেশ’ আমেরিকায় স্বয়ং বিদেশ সচিবের রিপোর্টের পাতা উল্টে ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য মোদী সরকারকে রীতিমতো চাপে ফেলল বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল।
মানবাধিকার বিষয়ে প্রতি বছর গোটা বিশ্বের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে রিপোর্ট প্রকাশ করে মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক। সাধারণত মন্ত্রকের কোনও অধঃস্তন আধিকারিক এই রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকেন। তাৎপর্যপূর্ণভাবে এবার স্বয়ং মার্কিন বিদেশ সচিব সেটি প্রকাশ করেছেন। মোদী সরকার অতীতেও মার্কিন রিপোর্টের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এবার কী করবে সেটাই দেখার।
Concerning increase in hate speech in India: US Secretary of State Blinken pic.twitter.com/hYth7Npsl3
— Sidhant Sibal (@sidhant) June 27, 2024
নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ভারতে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনা কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছে বলে আগেও একাধিকবার সরব হয় মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক। যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পের সময় ভারত তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে ছিল। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে বিদেশ নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন। দেশে দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় তাঁর প্রশাসন কাজ করবে বলে ঘোষণা করেন বাইডেন। সেই মতো সব দেশের প্রতিই মার্কিন বিদেশ মন্ত্রকের তীক্ষ্ণ নজর রয়েছে। এই উপমহাদেশে ভারতের পাশাপাশি আমেরিকার কুনজরে রয়েছে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তান। বাংলাদেশে মানবাধিকার বিপন্নতার অভিযোগ তুলে সে দেশের পুলিশ-প্রশাসনের বহু আধিকারিকের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বাইডেন প্রশাসন।
তবে হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে মার্কিন বিদেশ সচিবের ভারত সম্পর্কে মন্তব্য নয়া মাত্রা পেয়ে গিয়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে। সদ্য সমাপ্ত লোকসভা ভোটে বিরোধীরা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ভাষণের গুরুতর অভিযোগ তোলে। প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যেই মুসলিমদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন বলে বিরোধীরা নির্বাচন কমিশনে নালিশ জানায়। কিন্তু কমিশন কড়া পদক্ষেপ না করাতেও বিরোধীরা সরব হয়। নিয়ম অনুযায়ী এই সব প্রসঙ্গ মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক তাদের আগামী বছরের রিপোর্টে উল্লেখ করতে পারে।
কূটনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে স্বয়ং ব্লিংকেনের ভারতকে নিয়ে সরব হওয়ার পিছনে গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নয়া দিল্লি সফরের সম্পর্ক থাকতে পারে। ওই সফরে আমেরিকা চাইলেও ভারত সরকার বাইডেন ও নরেন্দ্র মোদীর যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের প্রস্তাবে সায় দেয়নি। বাইডেন এরপর ভিয়েতনাম সফরে গিয়ে ভারতে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের অনুমতি না মেলা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেই সঙ্গে বলেন, দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় তিনি নরেন্দ্র মোদীর কাছে ভারতে মানবাধিকার হরণের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এবার প্রকাশ্যেই বাইডেনের বিদেশ সচিব জানালেন ভারতে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন।
মার্কিন বিদেশ মন্ত্রক ভারতের একটি আইন নিয়ে বিশেষভাবে সরব। বিজেপি শাসিত দশটি রাজ্যে চালু ধর্মান্তকরণ বিরোধী আইনটি আসলে সংখ্যালঘুদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বলে মনে করে মার্কিন প্রশাসন। ওই আইনের কঠোর ধারায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষকে জেলে আটকে রাখা হয়েছে। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই আদালত অভিযুক্তদের নির্দোষ বলে মুক্তি দিয়েছে। ফলে আইনের অপব্যবহারের অভিযোগ জোরালো হয়েছে। এর আগে উত্তর প্রদেশে যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর গো হত্যায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। বন্ধ করে দেওয়া হয় স্লটার হাউস এবং গরুর মাংস বিক্রি। সরকারের সেই পদক্ষেপেরও বলি হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বহু মানুষ। গরুর মাংস বিক্রি, বহনের গুজব রটিয়ে পিটিয়ে মারার একাধিক ঘটনা ঘটে।
শুধু সাধারণ হিন্দুত্ববাদীরাই নয়, সাধু সমাজও নানা সময়ে সংখ্যালঘুদের প্রতি বিদ্বেষ ভাষণ দিয়ে পরিস্থিতি অস্থির করে তোলে। মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে যুক্ত সংগঠনগুলির বত্তব্য শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের নীরবতা, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এই ধরনের ঘটনা বাড়ছে।
সংখ্যালঘুদের ধর্মাচরণের স্বাধীনতায় বাধা, তাদের উপাসনাস্থল ভেঙে দেওয়ার ঘটনা ভারতে বাড়ছে বলে বহু বছর ধরেই আমেরিকা বলে আসছে। গত বছর মণিপুরে জাতিদাঙ্গায় খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতনের ঘটনা গোটা বিশ্বের নজরে আসে। শতাধিক চার্চ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। খ্রিস্টানদের একাধিক আন্তর্জাতিক সংগঠন এই ব্যাপারে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মণিপুর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শান্তি ফেরাতে দিল্লিতে কর্মরত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রস্তাব দিলে মোদী সরকার তাঁকে রীতিমতো ভৎসর্না করে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোয়। কিন্তু স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদীর বিরুদ্ধে মণিপুর পরিস্থিতিকে উপেক্ষা করার অভিযোগ ওঠে।