
আমেরিকায় নিষিদ্ধ টিকটক
শেষ আপডেট: 19 January 2025 18:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘বাংলা আজ যা ভাবে, ভারত তা ভাবে আগামীকাল।’ গোপালকৃষ্ণ গোখলের এই ঐতিহাসিক মন্তব্যকে ঘুরিয়ে এভাবেও বলা যায়: ‘ভারত আজ যা ভাবে, আমেরিকা তা ভাবে পাঁচ বছর পর।’ রবিবাসরীয় সকালে টিকটকে লগ ইন করতে গিয়ে মার্কিন মুলুকের আমজনতার হতভম্ব দশা দেশে অন্তত এমনটাই মনে হচ্ছে!
আজ, ১৯ জানুয়ারি থেকে চিনা সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাপ টিকটিককে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। অ্যাপে ঢুকতে গেলেই পপ আপে একটি লেখা দেখা যাচ্ছে: ‘আমরা দু:খিত। টিকটক এই মুহূর্তে আমেরিকায় নিষ্ক্রিয় রয়েছে। অর্থাৎ, দুর্ভাগ্যবশত, আপনি এখন টিকটক ব্যবহার করতে পারবেন না।’ দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে মার্কিন নাগরিকদের ‘স্টাইল স্টেটমেন্টে’র সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী জুড়ে গেছিল যে অ্যাপ, তার এমন আকস্মিক অন্তর্ধানে দানা বাঁধতে শুরু করেছে বিতর্ক। ঠিক যেমনটা দেখা গেছিল ভারতে, বছর পাঁচেক আগে।
TikTok has officially gone down for users in the US. pic.twitter.com/PcKzSqZVyE
— chart data (@chartdata) January 19, 2025
যদিও গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে চিনা অ্যাপ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাদের সঙ্গে সমঝোতার রাস্তা খোলা রেখেছেন। একবার কুর্সিতে বসলে তিনি একটি উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করবেন। অন্তত, টিকটকের তরফে এমনটাই খবর৷
তবে এই আশ্বাসেও চিঁড়ে ভেজা মুশকিল। কারণ, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্পই ২০২০ সালে ভারতের দৃষ্টান্ত টেনে বলেছিলেন, ঠিক কোন কোন কারণে টিকটক ক্ষতিকর, ভয়ানক। চিনা প্রশাসন এই অ্যাপকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে গ্রাহকদের তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে, যে কারণে নরেন্দ্র মোদীর সরকার তা নিষিদ্ধ ঘোষণায় বাধ্য হয়েছে। ফলে ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তিনি আগের অবস্থান থেকে কতটা সরে আসেন কিংবা আদৌ আসেন কি না—সে বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। আর ১৭ কোটি মার্কিনী গ্রাহকের এভাবে আতান্তরে পড়ার প্রাক্কালে ফের একবার সামনে এসেছে মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত। কারণ আমেরিকার সর্বোচ্চ আদালতও টিকটক সহ তাদের মূল সংস্থা বাইটড্যান্সের অন্যান্য অ্যাপ ক্যাপকাট, লেমনএইট-কে নিষিদ্ধ ঘোষণার রায়ে জাতীয় সুরক্ষার বিষয়টিকে সামনে এনেছে।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ২৯ জুন ভারতে টিকটক ব্যান করা হয়৷ পাশাপাশি আরও ৫৮টি অ্যাপকেও নিষিদ্ধ বলে দেগে দেয় প্রশাসন। কারণ হিসেবে উঠে আসে তথ্যের অপব্যবহার ও গুপ্তচরবৃত্তি। আঙুল তোলা হয়, একইভাবে, বাইটড্যান্সের ওপর। যদিও এই গোটা সিদ্ধান্তের পটভূমি তৈরি করেছিল লাদাখে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারত ও চিনা সেনাবাহিনীর সম্মুখসমর৷ ১৫ জুন গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষ শুরু হয়৷ তাতে ২০ জন জওয়ান শহিদ হন।
এরই প্রতিক্রিয়ায় দুটো পরপর সিদ্ধান্ত নেয় মোদী প্রশাসন। কেন্দ্রীয় বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের তরফে জানানো হয় টিকটক সহ ৫৯টি চিনা অ্যাপ এমন কিছু কাজে লিপ্ত, যার জেরে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা বিঘ্নিত হতে পারে। গোপনীয়তা উল্লঙ্ঘন ছাড়াও ভার্চুয়াল আক্রমণ, অপপ্রচার, অসঙ্গত কন্টেন্ট ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল টিকটক। ফলে ২০ কোটির গ্রাহক (সেই সময় সংস্থার সবচেয়ে বড় বাজার) এবং ইনফ্রুয়েন্সারদের কপালচাপড়ানি সত্ত্বেও জনমতের একটা বড় অংশ এই নিষিদ্ধ ঘোষণার পক্ষে রায় দিয়েছিল। যাকে কাজে লাগিয়ে ‘আত্মনির্ভরশীল ভারতে’র ধুয়ো ভাসিয়ে দিতে দেরি করেনি সরকার। এরই ফলশ্রুতিতে মোজ, যোশ, রোপোসো-র মতো দেশজ অ্যাপ আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কোনওটাই টিকটকের মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। বাধ্য হয়ে কন্টেন্ট ক্রিয়েটারদের একটা বড় অংশ ইউটউব শর্টস, ইন্সটাগ্রাম রিলসের দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
ভারতের পাশাপাশি সেনেগাল, নেপাল, তাইওয়ানের মতো দেশে ইতিমধ্যে টিকটক নিষিদ্ধ হয়েছে। এই তালিকায় আমেরিকাও নাম লেখাল। দেখার বিষয়, কতদিন ‘অকেজো’ থাকে তারা। ‘খুব দ্রুত ফিরে আসা'র আশ্বাস কতটা বাস্তবায়িত হয়। যদিও ব্যানের বিষয়ে একটা আগাম পূর্বাভাস কিছুদিন ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই ‘বুদ্ধিমান’ মার্কিন নাগরিকদের একটা অংশ অনেক আগেই বিকল্প অ্যাপ ‘লেমনএইটে’ সরে যান। মজার বিষয়, ওই অ্যাপটিরও আসল মালিক বাইটড্যান্স।