Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
হরমুজ মার্কিন নৌ অবরোধে কোণঠাসা ইরান! তেল রফতানি প্রায় থমকে, দিনে ক্ষতি ৪৩৫ মিলিয়ন ডলারIPL 2026: আইপিএল অভিষেকে সেরা বোলিং পারফরম্যান্স! কে এই সাকিব হুসেন? ৪৯ লাখের টিকিট থাকা সত্ত্বেও বোর্ডিং বাতিল! বিমান সংস্থার সিইও-র বিরুদ্ধে FIR-এর নির্দেশ আদালতেরশ্রমিকদের বিক্ষোভে অশান্ত নয়ডা! পাক-যোগে ষড়যন্ত্র? তদন্তে পুলিশ, ধৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৩০০ নিজেকে ‘যিশু’ সাজিয়ে পোস্ট! তীব্র বিতর্কের মুখে ছবি মুছলেন ট্রাম্প, সাফাই দিয়ে কী বললেন?IPL 2026: পয়লা ওভারেই ৩ উইকেট, স্বপ্নের আইপিএল অভিষেক! কে এই প্রফুল্ল হিঙ্গে?ইরান-মার্কিন বৈঠক ব্যর্থ নেতানিয়াহুর ফোনে! ট্রাম্পের প্রতিনিধিকে কী এমন বলেছিলেন, খোলসা করলেন নিজেইWeather: পয়লা বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকের

‘ওল্ড ইজ গোল্ড’, রেড বুক যখন মোবাইল, শি’র পুনর্জাগরণের ডাক কি দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব?

জাতীয় ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শহর হিসেবে স্বীকৃত ফেনহুয়াংয়ে মতো প্রাচীন শহরগুলিতে একটি অভিনব সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে হয়েছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি। ঐতিহ্যশালী ভবন, নিদর্শনগুলিকে বিমার আওতায় এনে সংরক্ষণ, পরিচর্যা নিশ্চিত করেছে তারা।

‘ওল্ড ইজ গোল্ড’, রেড বুক যখন মোবাইল, শি’র পুনর্জাগরণের ডাক কি দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব?

চিন দেশে দ্য ওয়াল

শেষ আপডেট: 14 May 2025 11:53

অমল সরকার

শহরের বুক চিরে সরু নদী বয়ে গিয়েছে। সুসজ্জিত নৌকা ঘুরছে তাতে। নদীর বুক, দু-পারে চোখ ধাঁধানো আলোর শিল্পকলা। ভিড় আর আলোকসজ্জা দেখে মনে হচ্ছিল কলকাতার কোনও পুজো প্যান্ডেল বা নদী উৎসবে এসেছি। সেটা আরও বেশি করে মনে হচ্ছিল ভিড় দেখে। রাত ৯’টা-সাড়ে ’৯টা হবে। ভিড় উপচে পড়ছে নদীর দুই কূলে। নাচে-গানে মাতোয়ারা সেই ভিড়।

আলোর ঝলকানি ভেদ করে চোখে পড়ে নদীর দু-পারের বাড়িগুলি অন্যরকম। কাছে গিয়ে মালুম হয় সেগুলি এক একটি বিলুপ্তপ্রায় প্রাচীন সভ্যতার নির্দশন। হেলে যাওয়া দেওয়াল, পিলারগুলি নানা উপায়ে রক্ষা করা হচ্ছে। নগরীর বয়স আনুমানিক ১৮০০ বছর। দুশো প্রাচীন বাড়ি, ১০টি পুরনো রাস্তা স্থানীয় পুরসভা রক্ষণাবেক্ষণ করছে।

চিনের এই প্রাচীন নগরীর নাম ফেনহুয়াং (Fenghuang Ancient city) । শহরকে দু’ভাগ করা ওই নদীটির নাম কাওশিয়ান। দুই প্রান্ত সংযোগকারী সেতুটিকেই মনে হল তুলনায় বেশি মজবুত। ফেনহুয়াং হল হুনান প্রদেশের (Hunan province) একটি জেলা। বহু বছর আগে বিলুপ্ত এক পাখি ফেনহুয়াংয়ের নামানুসারে শহরের এমন নামকরণ।

যেই ভিড়ের কথা বলছিলাম, সেটা পর্যটকদের। প্রতি বিকালে ফেনহুয়াংয়ে তাদের বেড়াতে নিয়ে আসে চিনের পর্যটন বিভাগ ও সরকারি-বেসরকারি এজেন্সিগুলি। আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল প্রায় দু-দশক আগে এক বিকালে বেজিংয়ের (Beijing) একটি পাড়ার কথা। চিনের রাজধানীর সর্বত্র তখনও সদ্য শেষ হওয়া অলিম্পিক আয়োজনের ছাপ। বহুতল, সাততারা হোটেল, শপিং মল, উড়ালপুল, মেট্রো রেল, ব্যাটারি চালিত এয়ারকন্ডিশনড বাস ইত্যাদির ঝাঁ চকচকে বেজিং শহর থেকে আমরা গিয়েছি খানিক ভিতরের দিকে। গোটা একটা মহল্লা জুড়ে প্রাচীন বেজিং বিরাজ করছে। মনে গোটা পাড়াটাই মিউজিয়াম।

পুরনো বাড়ি ঘরের সারির মাঝখান দিয়ে বয়ে গিয়েছে খাল। প্রাচীন বেজিংয়ে খালগুলি কাটা হয়েছিল জলের চাহিদা মেটানো এবং জনযানের জন্য। নৌকাই ছিল যাতায়াতের একমাত্র উপায়। এখনও দেখলাম, ভারত আর চিনের নৌকার গড়ন মোটের উপর এক। জানা না থাকলে বোঝার উপায় নেই ভিন দেশে আছি।

সেবার আরও দেখেছিলাম, বাড়ির উঠোনে সাইকেল, আরও কত পুরনো যানবাহন। শুনলাম, আইন করেই এলাকার ভোলবদল আটকে দেওয়া হয়েছে। আরও লক্ষ্য করেছিলাম, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের পুরনো বেজিং পরিদর্শন ছিল চিন সরকারের বিশেষ আগ্রহের কারণ।

সেই সফরেই শুনি, খানিক চাক্ষুষ করেছিলাম, কীভাবে নগরায়নের বলি হচ্ছে চিনের প্রাচীন শহরগুলি। কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও তা নিয়ে দ্বিধাধন্দ্ব। একদল দুর্বার গতিতে নগরায়নের পক্ষে। আর একদল পুরনোকে রক্ষা করে নতুনের পথে এগনোর পক্ষপাতী। এই সব বিবাদ-বিতর্কে প্রথম পক্ষই বিজয়ী হয়। কারণ ইতিহাস-ঐতিহ্যকে একদল দ্রুত উন্নয়নের ভাবনার পরিপন্থী বলে মনে করে। যদিও বিবাদ-বিতর্ক ছাপিয়ে অবশেষে অতীত সংরক্ষণে বেজিংকে ঘিরেও শুরু হয় রাষ্ট্রসংঘের সংস্থা ইউনেসকোর মধ্যস্থতায় নানা উদ্যোগ। সেবার শুনেছিলাম, ১৯৪৯-এর পর পিপলস রিপাবলিক অফ চায়নায় (People Republic of China) কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চিনের (Communist Party of China) অভাবনীয় উন্নতি উপলব্ধি করাতেই তুলনা হিসাবে অত্যাধুনিক বেজিংয়ের মাঝে শহরের এক টুকরো প্রাচীন অংশকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এবার হুনান, ফুচিয়েন গিয়ে শুনলাম, উদ্দেশ্য দেশের প্রাচীন ইতিহাস, ঐহিত্য রক্ষা এবং তা একপ্রকার বাধ্যতামূলক। শি জিংপিন পার্টির শীর্ষ পদে বসার পর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে জোরদার করার পাশাপাশি দেশপ্রেম আর চিনা জাতীয়তাবাদকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার চেষ্টা শুরু করেছেন। নানা উদ্যোগ-অনুষ্ঠান-কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশে বসবাসরত চিনাদেরও যুক্ত করার চেষ্টা শুরু করেছেন তিনি। তাঁর বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভস শুধু বাণিজ্য নয়, শিল্প-ব্যবসার হাত ধরে গোটা বিশ্বে চিনা সংস্কৃতির প্রসারও লক্ষ্য।

সেই রাতে ফেনহুয়াং শহরে নদীর ধার ঘেঁষে এগতে দেখা মিলল স্থানীয় মিয়াও সম্প্রদায়ের বংশধরদের। নারী-পুরুষেরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে দাঁড়িয়ে। দলবেঁধে নাচ-গান চলছে। তাদের সঙ্গে পর্যটকদের সেফলি তোলার হিড়িক পড়ে গিয়েছে। নদীর ধারে, দোকানে বিক্রি হচ্ছে মিয়াও ঐতিহ্যবাহী পোশাক। ওই সম্প্রদায়ের মানুষের প্রাচীন খাবার বিক্রির দোকানও আছে বেশ কয়েকটি। এক-দু’টিতে দেখলাম, ফড়িং-সহ নানা প্রতঙ্গ ভাজা দেদার বিকোচ্ছে।

ইউটিউব ভিডিও-তে চিনাদের খাবারদাবারের রুচি নিয়ে নানা প্রচার চললেও পতঙ্গ এখন চিনের প্রধান খাবার নয়। প্রাচীন নগরী, সভ্যতার সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি পর্যটনের ব্যবসা জমে উঠেছে এই সব পুরনো খাবারদাবার, পোশাক, গান-নাচের আসর বসিয়ে। চিনা আধিকারিকেরা জানালেন, গানগুলি মূলত মিয়াও সম্প্রদায়ের প্রাচীন লোক সঙ্গীত।

কথায় কথায় শুনলাম, শাংসি প্রদেশের পিঙ্গিয়াও, শিনঝৌ এমনই দুটি প্রাচীন শহর। দেড়-দু হাজার বছর আগে তৈরি নগরীর নির্দশনগুলিকে রক্ষার কৌশল হিসাবেই পর্যটনে বিকাশ ঘটানো হয়েছে। যাতে স্থানীয় মানুষ পুরনো ঘরবাড়িগুলি রক্ষণাবেক্ষণে আগ্রহী হয়। কারণ সেগুলির টানেই পর্যটকেরা দলে দলে ভিড় করছে। ফলে আয়ের সুযোগ বেড়েছে স্থানীয়দের। স্থানীয় প্রশাসনও বিপুল রাজস্ব পাচ্ছে।

তবে এই উদ্যোগকে পর্যটন শিল্প বিকাশের আর পাঁচটা অর্থনৈতিক উপায়ের সঙ্গে এক করে দেখলে ভুল হবে। আসলে ২০২১-এ চিনা কমিউনিস্ট পার্টির শতবর্ষে জেনারেল সেক্রেটারি তথা দেশের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যে জাতীয় পুনর্জাগরণের ডাক দেন, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, শিক্ষা, প্রযুক্তিতে বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি প্রাচীন সভ্যতা, সংস্কৃতির জাগরণ কর্মসূচি এর অংশ। এরমধ্যে আছে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, পোশাক, খাদ্য সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, চর্চা, প্রদর্শনী। ২০০১-এ পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জিয়াং জেমিন প্রথম গ্রেট রেজুভেনেশন বা অনন্য পুনর্জাগরণের ডাক দিয়েছিলেন। শি জিংপিন তাতে চিনা স্বপ্নপূরণের যে রোড ম্যাপ ঘোষণা করেন তাতে অর্থনৈতিক প্রগতির সঙ্গে চিনের জাতীয় ঐক্য, সংহতিকে জুড়ে দিয়েছেন।

ফেনহুয়াংয়ে মোট ১২৬টি বিভিন্ন স্তরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ইউনিট ২২টি ঐতিহ্যবাহী চিনা গ্রাম রয়েছে। জাতীয় ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক শহর হিসেবে স্বীকৃত ফেনহুয়াংয়ে মতো প্রাচীন শহরগুলিতে একটি অভিনব সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে হয়েছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি। ঐতিহ্যশালী ভবন, নিদর্শনগুলিকে বিমার আওতায় এনে সংরক্ষণ, পরিচর্যা নিশ্চিত করেছে তারা। সেগুলির মালিকানা সরাসরি সরকারের হাতে। কিন্তু দেখভাল ও পরিচালনার অধিকার বিভিন্ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের হাতে। এতে আয় বৃদ্ধি হয়েছে এবং সংরক্ষণের জন্য অর্থের ঘাটতিও কমেছে। প্রাচীন শহরের নতুন নির্মাণ, সাজসজ্জা ও সংস্কারের জন্য বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে যৌথ অনুমোদন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যাতে শহরের ঐতিহাসিক রূপ অক্ষুণ্ণ থাকে।

যেমন হুনান প্রদেশের ঝিয়াংঝিয়াজি শহরের শিয়াংশি নৃত্যনাট্য প্রদর্শনী। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শতাধিক বছরের প্রেক্ষাগৃহে প্রতিদিন প্রদর্শিত হয় প্রাচীন লোকগাঁথা নিয়ে নৃত্যনাট্য। প্রতি সন্ধ্যায় মিয়াও এবং তুজিয়া জনজাতির ঐতিহ্যশালী নৃত্যনাট্যের এই শো হয়ে থাকে, যা এখনও পর্যন্ত দেড় কোটির বেশি মানুষ দেখেছে। চিন সফরে এক বিকালে আমাদেরও সেই অপূর্ব সুন্দর শো দেখার সৌভাগ্য হল।

এই ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভারত-চিন প্রাচীন সম্পর্ক অনুভব করা যায়। কাহিনি এবং নাচের ছন্দ, অভিব্যক্তিতে ভারতের সঙ্গে তেমন কোনও ফারাক চোখে পড়ল না। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেগুলিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে চিন। দর্শকাশনে কম-বয়সি ছেলেমেয়েদের ভিড় দেখে বোঝা গেল কমিউনিস্ট পার্টির উদ্দেশ্য অনেকটা সফল। নতুন প্রজন্মের কথা বিবেচনায় রেখেই থ্রি-ডি ও লেসার প্রযুক্তির ব্যবহার একটু যেন বেশিই মনে হল। তবে কাহিনি ও উপস্থাপনার তারিফ থেকে বোঝা গেল প্রাচীন শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে বর্তমান প্রজন্মকে মেলানোর কাজটা তেমন কঠিন হয়নি। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়।

প্রাচীন সভত্যা, সংস্কৃতি রক্ষার কর্মসূচিরই অংশ চীনে, সাংস্কৃতিক উদ্যান বা জাতীয় সংস্কৃতি উদ্যানের ধারণাটি যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং প্রচারের জন্য একটি বহুমুখী পদ্ধতি। যা জাতীয় পরিচয়ের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে এবং চিনা ঐতিহ্য প্রচার করে।

ইতিপূর্বে আলোচিত মিয়াও এবং তুজিয়া সম্প্রদায় চিনের অ-হান সম্প্রদায়ভুক্ত জাতি, সে দেশের যাদের সংখ্যালঘু হিসাবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে। চিনে ৬০টির কাছাকাছি সম্প্রদায় থাকলেও হান হল বৃহত্তম জাতিগোষ্ঠী। তারা জনসংখ্যার ৯১ শতাংশ। মিয়াও ছাড়াও অ-হান জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আছে তিব্বতি, উইঘুর ইত্যাদি সম্প্রদায় যারা সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর অংশ। এই সব জাতি গোষ্ঠীকে নিয়ে চিনের কমিউনিস্ট পার্টির দাবির সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানের মিল আছে। যদিও উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের তরফে অভিযোগ করা হয়ে থাকে তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা বিপন্ন। একই অভিযোগ করে থাকে তিব্বতীরাও।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, সোভিয়েতের পতন থেকে শিক্ষা নিয়ে চিন প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্বতাকে প্রাধান্য দেওয়া শুরু করেছে। বিচ্ছিন্নতার ভাবনা থেকে দূরে রাখতেই এক চিন-এক জাতি জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগচ্ছেন শি জিনপিংয়ের অনুগামীরা। প্রাচীন শহরগুলির সংরক্ষণ, সেখানকার ভাষা, সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে সেই কাজটা হচ্ছে।

চিন ও বহির্বিশ্বের কোনও কোনও বিশেষজ্ঞ শি জিনপিংয়ের জাতীয় পুনর্জাগরণের ডাককে দ্বিতীয় সাংস্কৃতিক বিপ্লব বলছেন। গত শতকের ষাট-সত্তরের দশকে চেয়ারম্যান মাও জে দংয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক ছিল চিনের বিপ্লবী চেতনার পুনর্জাগরণ, চিনা সমাজ থেকে পুঁজিবাদী ভাবনা, বুর্জোয়া ব্যবস্থাকে নিকেশ করা। সেই অভিযানের পরিণতি ভাল হয়নি। চাপিয়ে দেওয়া মতবাদ, সন্দেহ আর আত্মঘাতী লড়াইয়ে এক দশকে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল চিনের অমূল্য মানব সম্পদ।  কমিউনিস্ট পার্টি অতীতের ভুল স্বীকার করে নতুন পথ বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে। মাওয়ের ভুল-ত্রুটিগুলিকেও সেভাবেই শুধরে নিয়েছে চিনা কমিউনিস্ট পার্টি।

যেমন, আজকের চিনে শি জিংপিনের অঘোষিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রধান লক্ষ্য চিনা সমাজ, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে পশ্চিমী দুনিয়ার প্রভাব মুক্ত রাখা। মাওয়ের ডাকে রেড ভলান্টিয়াররা রেড বুক হাতে গ্রামে-নগরে-বন্দরে ছড়িয়ে পড়েছিল। মাওয়ের উক্তি আউড়ে সমাজবদলের কথা প্রচার করা হত। আজকের চিনে রেড বুক হল মোবাইল। একশো কোটির বেশি মানুষ মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দেশটিতে। কিন্তু তারা কী দেখবে, কতটা দেখবে, তাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ লক্ষণীয়।

কমিউনিস্ট পার্টির শততম বর্ষে চিনা প্রশাসন টেলিভিশন, রেডিও এবং অনলাইন অডিওভিস্যুয়াল মাধ্যমের অনুষ্ঠানে বিষয়, শিল্পী বাছাই ইত্যাদি নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে শিল্পীদের অনৈতিক আচরণ এবং ‘ফ্যান সার্কেল’-এর বিশৃঙ্খলতা নিয়ন্ত্রণ, দেশপ্রেম, নৈতিকতা এবং শিল্প গুণমান রক্ষার লক্ষ্যে এই নির্দেশিকা জারি করা হল। বলা হয়, শিল্পী ও অতিথি নির্বাচন করতে হবে কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করে। তাঁদের আমন্ত্রণ জানানোর আগে রাজনৈতিক জ্ঞান, মার্কসবাদের প্রতি আস্থা, নৈতিকতা, শিল্প দক্ষতা ও জনমত বিবেচনায় নিতে হবে। জনশালীনতা ভঙ্গকারী বা অনৈতিক আচরণকারী ব্যক্তিদেরও দূরে রাখতে হবে। রাজনৈতিকভাবে বিভ্রান্ত, রাষ্ট্র বা দলের প্রতি অনুগত নন—এমন কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

আরও বলা হয়, আইডল তৈরির অনুষ্ঠান বা সেলিব্রিটি শিশুদের অংশগ্রহণে নির্মিত রিয়ালিটি ও বিনোদন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা যাবে না। প্রতিভা নির্ধারণমূলক শো-তে ভোটিং পর্ব কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে—বাইরের ভোট, র‍্যাংকিং বা বুস্টিং নিষিদ্ধ। ভক্তদের কেনাকাটা বা মেম্বারশিপের মাধ্যমে ভোট দেওয়ায় উৎসাহ দেওয়া যাবে না। অপকারী ‘ফ্যান সার্কেল’ সংস্কৃতিকে শক্তভাবে দমন করতে হবে।

এই নির্দেশিকাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘কালচারারাল পুলিশিং’ বলছেন। অর্থাৎ সংস্কৃতি চর্চাতেও সরকারের কঠোর নজরদারি বিদ্যমান, যা রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী, যেখানে সংস্কৃতি চর্চাও একটি বিশেষ অধিকার। চিনের বক্তব্য দেশিয় পরিসরে তারা সেটাই করছে। পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত রাখতে সংস্কৃতি চর্চাতেও নৈতিকতাকে প্রাধান্য দিচ্ছে। প্রাচীন সংস্কৃতির মধ্যে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পথ। চিন মনে করছে সেটাও তার ঈর্ষণীয় শক্তি। দেশে এবং বিশ্ব দরবারে চিনের আত্মপ্রচারে যেন ভেসে বেড়াচ্ছে কোনও চিনা গানের লাইন ‘লাও চিন’ মানে ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’।


```