
সারা বিশ্বের নজর এখন গাজা ভূখণ্ডের এই সীমান্তবর্তী শহরে।
শেষ আপডেট: 29 May 2024 17:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নজর আজ থেকে নয়। প্রায় তিন চার মাস ধরেই রয়েছে। গাজা ভূখণ্ডের একেপারে দক্ষিণ প্রান্তে, মিশর সীমান্তের লাগোয়া রাফা এই মুহূর্তে প্যালেস্তাইনিদের শেষ আশ্রয়। ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার জবাবে ইজরায়েলের লাগাতার আক্রমণে কার্যত ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে গাজা ভূখণ্ড। তিন দিকে ইজরায়েলের সীমান্ত ও একদিকে ভূমধ্যসাগরের মাঝে সীমাবদ্ধ গাজার শুধু একদিকেই রয়েছে মিশরের সীমান্ত। তা হল এই দক্ষিণ প্রান্তের রাফা। এমনিতেই গাজাকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় খোলা জেলখানা। বছরভর এমন আষ্টেপৃষ্টে নজরদারি চালায় ইজরায়েল যে, সামান্য ত্রাণ বা খাবার-ওষুধও ইজরায়েলের অনুমতি ছাড়া ঢোকে না এখানে। দারিদ্র্য মাত্রাছাড়া, অর্থনীতির এমনিতেই নাভিশ্বাস উঠেছিল। কিন্তু হামাসের হামলার পরে পুরোদস্তুর যুদ্ধ শুরু করেছে ইজরায়েল। প্রাণভয়ে গাজা ভূখণ্ডের প্রায় সম্পূর্ণ জনসংখ্যাই এবার আশ্রয় নিয়েছে রাফাতে।
কিন্তু বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাফ কথা, হামাসকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করতে দরকারে রাফা আক্রমণেও পিছপা হবেন না তিনি। হামাস নিশ্চিহ্ন না হওয়া অবধি যুদ্ধ চলবে। এতেই প্রমাদ গুণেছে বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এমনিতে রাফায় লাখ দেড়েক মানুষের বসবাস। কিন্তু যুদ্ধের পরে গাজা-সহ ভূখণ্ডের প্রায় সবক'টি ছোট-বড় শহর ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়ার পরে এখন প্রায় পনেরো লক্ষ সর্বস্ব হারানো শরণার্থীরা ভিড় করেছেন রাফায়। রাফার পশ্চিমে আল-মাওয়াইসিতে তৈরি হয়েছে অস্থায়ী শিবির। যতদূর চোখ যায়, কোনওমতে বানানো ছাউনি চোখে পড়বে। ইতিমধ্যেই সেখানে দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি। অথচ গত সপ্তাহান্তেই সেখানে আক্রমণ চালিয়েছে ইজরায়েলি বায়ুসেনা। লাগাতার শেলবর্ষণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২১ জন। যার মধ্যে ১৩ জন মহিলা ও শিশু।
ইতিমধ্যেই নেতানিয়াহুকে রাফা আক্রমণ করতে বারণ করে অনুরোধ জানিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, স্পেন, আয়ারল্যান্ড-সহ একাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা। আন্তর্জাতিক বিচারালয়ে মামলা দায়ের হয়েছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্তারাও তেল আভিভের কাছে বুঝিয়েছেন, রাফায় হামলা হলে তাঁদের মত থাকবে না। এবার এই নিয়ে জনমত তীব্র করতে বিশ্বজোড়া সমাজমাধ্যমে শুরু হয়েছে প্রচার। নাম দেওয়া হয়েছে, 'অল আইজ অন রাফা' (সব নজর রাফায়)। ইতিমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ফেসবুক, এক্স (টুইটার), ইনস্টাগ্রামে এই স্লোগান ও হ্যাশট্যাগ আলোড়ন তুলতে শুরু করেছে। যোগ দিয়েছেন নামী সেলেব্রিটিরা। যাতে সামিল হয়েছেন ভারতের প্রিয়ঙ্কা চোপড়া, রিচা চাড্ডা, করিনা কাপুর, আলিয়া ভট্ট, বরুণ ধওয়ন, রশ্মিকা মান্দানা, দিয়া মির্জা, সমান্থা রুথ প্রভু প্রমুখরা।
কিন্তু কীভাবে শুরু হল এই স্লোগান?
তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই স্লোগানের উৎস আদতে বহু পুরনো। গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা 'হু'-এর প্যালেস্তাইন আঞ্চলিক দফতরের অধিকর্তা রিক পিপারকর্ন প্রথমে নেতানিয়াহুর কিছু মন্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রথম এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছিলেন। নেতানিয়াহু তখন রাফা আক্রমণের ইঙ্গিত দিয়ে বাসিন্দাদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তখন এই শব্দবন্ধের উদ্দেশ্য ছিল, যাতে বিশ্বের নজর রাফা থেকে সরে না যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে হঠাৎ করে এই স্লোগানটাই নতুন গতি পেয়েছে। সমর্থনে এগিয়ে এসেছে অক্সফ্যাম, সেভ দ্য চিলড্রেন, জিউইশ ভয়েস ফর পিস, জাস্টিস ফর প্যালেস্তাইন-এর মত নানা আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী।
এদিকে সংবাদসংস্থা আল জাজিরা জানিয়েছে, রাফায় শিবিরে ইজরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫। তাঁদের নিজস্ব সমীক্ষায় উঠে এসেছে, আক্রমনে ব্যবহৃত বিস্ফোরকটি আসলে ছিল জিবিইউ ৩৯/বি ছোট ব্যাসের বোমা। যার নির্মাতা মার্কিন সংস্থা বোইং। ইজরায়েলের সেনা শুরুতে হামলার কথা অস্বীকার করে, পরে অবশ্য ইজরায়েলি সংসদে বিবৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানান, ভুলক্রমেই এই হামলা ঘটেছে। তারপরেই শিবিরের তাঁবুগুলো পর পর সাজিয়ে 'অল আইজ অন রাফা' স্লোগান সমাজমাধ্যমে গতি পায়।