বিজ্ঞান যখন যুক্তি ও পরীক্ষায় জোর দেয়, তবু কেন জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট? ইতিহাস, বিজ্ঞান-সমালোচনা ও আধুনিক অনুশীলন—সহজ ভাষায় বিশ্লেষণ।
.jpg.webp)
ছবি- এআই
শেষ আপডেট: 5 September 2025 18:55
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই সময়ে- যেখানে সবকিছু যুক্তি ও তথ্যের আলোয় বিচার করা হয়, তবু জ্যোতিষশাস্ত্রের মতো প্রাচীন অনুশীলন আজও এমন মানুষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ যারা ভবিষ্যৎ জানতে বা জীবনের সমস্যার সমাধান খুঁজতে চান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) বা মহাকাশ গবেষণার জমানায়ও অনেকে গ্রহ-নক্ষত্রের দিকে তাকান। এই বিপরীত প্রবণতা এক বড় প্রশ্ন তোলে: জ্যোতিষ (Astrology) কি কেবল কুসংস্কার, না কি এর পেছনে এমন কিছু আছে যা বিজ্ঞান (Science) এখনও সরাসরি প্রমাণ করতে পারেনি?
জ্যোতিষশাস্ত্রের জন্ম ও ইতিহাস
জ্যোতিষশাস্ত্র (Astrology) বহু হাজার বছর ধরে বিশ্বজুড়ে চর্চিত। প্রাচীন ভারত, চীন ও মায়া সভ্যতা নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে পার্থিব ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যবস্থা করত। প্রাচীনকালে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র ঘনিষ্ঠভাবে মিশে ছিল। মেসোপটেমিয়ায় (প্রায় ১৯৫০–১৬৫১ খ্রিস্টপূর্ব) রাজবংশকাল থেকেই জ্যোতিষচর্চা দেখা যায়। চীনে ঝৌ রাজবংশে (১০৪৬–২৫৬ খ্রিস্টপূর্ব) জ্যোতিষের প্রসার ঘটে। হেলেনীয় যুগে আলেকজান্দ্রিয়ায় মিশরীয় ও বেবিলনীয় জ্যোতিষ একত্রিত হয়ে রাশিচক্রভিত্তিক পদ্ধতি গড়ে ওঠে।
খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে টলেমি ভূকেন্দ্রিক জগতবোধ উপস্থাপন করেন—যেখানে পৃথিবীকে স্থির ধরে অন্য গ্রহ-নক্ষত্র গৃহীত ছিল। পরবর্তীতে জ্যোতির্বিজ্ঞান পরীক্ষণ-পরিমাপের পথে এগোতে থাকে, আর জ্যোতিষশাস্ত্র রয়ে যায় ব্যক্তিভিত্তিক ব্যাখ্যার জগতে। ভারতের ক্ষেত্রে জ্যোতিষশাস্ত্রের শুরুর নমুনা বৈদিক যুগে—সূর্য ও চাঁদের গতি বিবেচনায় সময় নির্ধারণ থেকে শুরু করে দেখা যায়; মৌর্য যুগে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষ একসঙ্গে প্রসার পায়। ঋষি ভৃগুকে কিছু লেখায় জ্যোতিষের জনক বলা হয়।
বিজ্ঞান বনাম জ্যোতিষ: পথ দুটো আলাদা
আধুনিক বিজ্ঞানের উত্থানের সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে থাকে। ১৭শ শতকের সূর্যকেন্দ্রিকতা ও নিউটনীয় গতির মত আবিষ্কার জ্যোতিষকে কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। আজ জ্যোতির্বিদ্যা একটি বৈজ্ঞানিক শাখা—যা মাপা, পরীক্ষা ও ভবিষ্যদ্বাণীর বাইরে বস্তু-বিষয় পর্যালোচনা করে। অন্যদিকে জ্যোতিষশাস্ত্রকে অনেক বিজ্ঞানী ছদ্মবিজ্ঞানের শ্রেণিতে রাখেন, কারণ এর প্রভাব নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় ধরা পড়েনি।
১৯৭৫ সালে ‘দ্য হিউম্যানিস্ট’ পত্রিকায় অনেক বিজ্ঞানী আনুষ্ঠানিকভাবে জ্যোতিষের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। প্রামাণ্যপরিচালক ও বিজ্ঞানজন কার্ল সেগানও বিখ্যাত ধারাবাহিক প্রামাণ্যে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ শন কার্লসন একটি ডবল-ব্লাইন্ড স্টাডি পরিচালনা করেন, যেখানে ২৮ জন পেশাদার জ্যোতিষীকে দিয়ে ১১৬ জন ব্যক্তির জন্মক্যালকুলেশন-ভিত্তিক ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণ করানো হয়, ফলাফল হতাশাজনক; জ্যোতিষীরা অনুমানের স্তর ছাড়াতে পারেননি।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সূর্য এক নক্ষত্র, চাঁদ এক উপগ্রহ—কিন্তু জ্যোতিষে এগুলোকে গ্রহ হিসেবে ধরা হয়। রাহু ও কেতু—বাস্তবে গ্রহ নয়—তবে জ্যোতিষ গণনায় তাদের গ্রহবাচক গুরুত্ব দেওয়া হয়। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র অনুযায়ী দূরের নক্ষত্র বা গ্রহের মহাকর্ষ বা চৌম্বকীয় প্রভাব পৃথিবীতে পৌঁছলে তা অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার কথা—এটি এমন এক মাত্রা যা প্রাত্যহিক জীবনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব সৃষ্টি করা কঠিন বলে বিজ্ঞানীরা বিবেচনা করেন।
সাধারণ মানুষের মধ্যে জ্যোতিষশাস্ত্রের প্রভাব কেন বাড়ছে
আজকের দিনে, বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জ্যোতিষের প্রতি আকর্ষণ দ্রুত বাড়ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ায় অনলাইন জ্যোতিষীর সংখ্যা বেড়েছে। চাকরির অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিগত চাপ বা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—এই কারণে মানুষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও অস্থিরতা কমাতে জ্যোতিষের সাহায্য নেয়।
এক মনোবিজ্ঞানীর কথায়, “জ্যোতিষ মানুষের মৌলিক আবেগীয় চাহিদা পূরণ করে—নিয়ন্ত্রণের অনুভূতি, অনিশ্চয়তা কমানো এবং জীবনের বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষি দেখার সান্ত্বনা।” এই দিকটা প্লেসিবো ইফেক্টের সঙ্গে তুলনীয়—কোনও টিপস বা ভবিষ্যদ্বাণী মানুষের মানসিক স্বস্তি জোগাতে পারে। অনেকে জ্যোতিষকে কেবল কৌতূহলের বিষয় বা সংস্কৃতির অংশ হিসেবে দেখেন; আবার কেউ এটিকে অবলম্বন করে জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নেন—এটি উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
জ্যোতিষের ইতিবাচক দিকও আছে — কিন্তু সীমাবদ্ধতাও আছে
জ্যোতিষ যদি লোককে মানসিক স্বস্তি দেয়, হতাশ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করে — তাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একটি আশাবাণী দুর্বলকেই শক্তি দেয় এবং আত্মহনামূলক ভাবনা স্থগিত করতে সাহায্য করে। কিছু জ্যোতিষী মনে করেন সচেতন প্রচেষ্টা ও ঈশ্বরী অনুগ্রহের মিলেই ভাগ্য বদলানো যায়; জ্যোতিষপদ্ধতি কেবল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়, নিশ্চিত ফল বলে না। তাই এটাকে অন্ধবিশ্বাস করে নেবার বদলে যুক্তির আলোয় গ্রহণ করা শ্রেয়।
বিভিন্ন সমালোচক যেমন কোহেন ও দার্শনিক পল থাগার্ড বলেন—যদি জ্যোতিষ প্রতারণার মধ্যে পড়ে, তা তখনই সমস্যা; ভবিষ্যৎভিত্তিক কথার ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞান বিকল্প হিসেবে দেখা যেতে পারে। এছাড়া জ্যোতিষীরা প্রায়ই জ্যোতির্বিজ্ঞানের মৌলিক নীতিগুলো পুরোপুরি মান্য করেন না—যেমন সূর্যের অবস্থান, আহ্নিক গতির পরিবর্তন ইত্যাদি।
আধুনিক যুগে জ্যোতিষচর্চা — ডিজিটাল রূপ ও জনপ্রিয়তা
একবিংশ শতাব্দীতে জ্যোতিষ নতুন রূপ নিয়েছে। ইনস্টাগ্রাম মিম অ্যাকাউন্ট থেকে ভেঞ্চার-ফান্ডেড জ্যোতিষ অ্যাপ—সব মিলিয়ে পশ্চিমা বিশ্বেও এই চর্চা বাড়ছে। এখনকার সময়ে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বহু জ্যোতিষীর সঙ্গে ভিডিও কল বা হাতে দেখানোর সুবিধা পাওয়া যায়। জ্যোতিষ বেসিক রাশিফল ছাড়াও পডকাস্ট, সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাপের মাধ্যমে ছড়াচ্ছে।
তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে পডকাস্ট শ্রোতার সংখ্যা ছিল ৫৪৬.৭ মিলিয়ন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৫৮৪.১ মিলিয়নে দাঁড়ায়। সেই পরিসংখ্যানে জ্যোতিষ, তন্ত্র ও গোপন জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি পডকাস্টের শ্রোতা সংখ্যা ১০০%–এরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, এটি প্রমাণ করে যে আধ্যাত্মিকতা ও প্রাচীন জ্ঞানে বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দ্রুত সমাধানের আশায়, অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতে মানুষ জ্যোতিষের দিকে ঝুঁকছে।
জ্যোতিষশাস্ত্রের কোনও সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই—তবে এটি মানুষের মানসিক ও সামাজিক জীবনে কিছু কাজই করে: স্বস্তি দেওয়া, আশা জাগানো এবং কখনো কখনো নৈতিক সমর্থন। বিজ্ঞান ও যুক্তি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে মানুষের আবেগ ও সংস্কৃতির ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। সবচেয়ে ভালো উপায় হল—জ্যোতিষকে সম্পূর্ণ সত্য বা সম্পূর্ণ মিথ হিসেবে না দেখে, একজন সহায়ক টুল হিসেবে দেখা; যা আপনাকে নিজের সম্ভাবনা চিনতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভাবতে সাহায্য করবে—কিন্তু বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে যুক্তি, প্রমাণ ও পেশাদার পরামর্শ নিন।
'দ্য ওয়াল' এই বিষয়বস্তুর প্রচারক নয়; এটি কেবল তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে।