জ্যোতিষশাস্ত্র বলছে গ্রহ-নক্ষত্র আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। জানুন সূর্য থেকে কেতু পর্যন্ত নবগ্রহের রহস্য, যোগ ও আধুনিক গুরুত্ব।

শেষ আপডেট: 25 September 2025 15:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মানুষের জীবন ও ভাগ্যের উপর গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাব নিয়ে যুগ যুগ ধরে গবেষণা ও আলোচনা চলে আসছে। প্রাচীন জ্যোতিষশাস্ত্রের জ্ঞান বলছে—মহাকাশের এই অদৃশ্য শক্তিগুলির প্রতিটি চলন আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে বৃহত্তর সমাজের পরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। আধুনিক যুগে জ্যোতিষবিদরা নতুনভাবে গ্রহগুলির রহস্য উন্মোচন করছেন, যা ভবিষ্যৎ বুঝতে নতুন দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
জ্যোতিষশাস্ত্রের জন্ম ও প্রসার
জ্যোতিষশাস্ত্র মূলত মহাকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান দেখে মানুষের ভাগ্য ও পৃথিবীর বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণ করে। এর উৎপত্তি খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৩০০০ বছর আগে, যখন প্রাচীন সভ্যতাগুলি গ্রহের গতি ও ঋতু পরিবর্তনের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করেছিল। শুরুতে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও জ্যোতিষশাস্ত্র একই সঙ্গে চর্চা হত—আকাশ পর্যবেক্ষণ ও তার প্রভাব ব্যাখ্যা একসাথে চলত।
ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় এর প্রাচীন প্রমাণ মেলে, যেখানে ১৭০০ খ্রিস্টপূর্বে আম্মিসাদুকার ভেনাস ট্যাবলেট সংকলিত হয়েছিল। হেলেনিস্টিক যুগে গ্রিক দর্শন ও মিশরীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানের মেলবন্ধনে জন্ম হয় রাশিফলভিত্তিক জ্যোতিষশাস্ত্রের, যা পরবর্তীতে ইউরোপ, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধারা আধুনিক জ্যোতিষশাস্ত্রের ভিত্তি গড়ে তোলে। বিশেষত টলেমির অবদান আজও আলোচিত।২০শ শতকের গোড়ায় পশ্চিমা সমাজে আবারও রাশিফল ও জ্যোতিষশাস্ত্র জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে সংবাদপত্র ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে রাশিফল মানুষের আগ্রহের প্রধান অংশে পরিণত হয়েছে।
নবগ্রহের ভূমিকা
জ্যোতিষশাস্ত্রে বলা হয় নবগ্রহের কথা—সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি এবং ছায়াগ্রহ রাহু ও কেতু। বৈজ্ঞানিকভাবে চন্দ্র উপগ্রহ ও রাহু-কেতু কেবল ছায়া হলেও জ্যোতিষশাস্ত্রে এদের গ্রহ হিসেবে ধরা হয়। প্রতিটি গ্রহের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা জন্মছকে তাদের অবস্থানের ভিত্তিতে শুভ বা অশুভ ফল দেয়।
সূর্য: রাজাধিরাজ, আত্মা, ক্ষমতা, পিতার প্রতীক। (অধিপতি—রবিবার)
চন্দ্র: মন, আবেগ ও মাতৃত্বের প্রতীক। (অধিপতি—সোমবার)
মঙ্গল: শক্তি, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও যুদ্ধের প্রতীক। (লাল রঙ, ব্রহ্মচর্যের দেবতা)
বুধ: বুদ্ধি, বাকশক্তি ও ব্যবসার কারক। (ব্যবসায়ীদের রক্ষক)
বৃহস্পতি: জ্ঞান, ধর্ম, শিক্ষা ও ভাগ্যের প্রতীক। (দেবগুরু, সত্ব গুণ, হলুদ রঙ)
শুক্র: প্রেম, সৌন্দর্য, অর্থ, ভোগ-বিলাসের প্রতীক। (দৈত্যগুরু, রাজস গুণ)
শনি: শ্রম, কর্মফল, দীর্ঘায়ু ও কষ্টের প্রতীক। (ধীরগতি, ৩০ বছরে সূর্য প্রদক্ষিণ)
রাহু: ছায়াগ্রহ, আকস্মিক পরিবর্তন, বিভ্রান্তি ও তামস প্রকৃতির প্রভাব।
কেতু: ছায়াগ্রহ, আধ্যাত্মিকতা, মোক্ষ ও অপ্রত্যাশিত সাফল্যের প্রতীক।
গ্রহের যোগ ও প্রভাব
শুধু পৃথক গ্রহের বৈশিষ্ট্য নয়—তাদের পারস্পরিক অবস্থান, দৃষ্টি ও রাশির প্রভাব জীবনে বিশাল পরিবর্তন আনে। এটিই গ্রহ-যোগ নামে পরিচিত।
চন্দ্র মনকে প্রভাবিত করে।
সূর্য-চন্দ্রের যোগে লক্ষ্মীপ্রাপ্তি হয়।
শনি-মঙ্গলের যোগ ধনসম্পদ আনতে পারে।
বুধ-বৃহস্পতি-শুক্র যোগ ধন-ঐশ্বর্য বাড়ায়।
অশুভ প্রভাব কাটাতে জ্যোতিষীরা রত্ন ধারণ বা বিশেষ প্রতিকারমূলক পদ্ধতি অবলম্বনের পরামর্শ দেন। এগুলি বিশ্বাসীদের মানসিক শান্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়ায়।
আধুনিক সমাজে জ্যোতিষশাস্ত্র
আজও কোটি মানুষ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—বিয়ে, সন্তানের নামকরণ, ব্যবসা শুরু বা বাড়ি কেনার আগে জ্যোতিষের পরামর্শ নেন। জ্যোতিষশাস্ত্র অনেকের কাছে মানসিক শান্তি, দিকনির্দেশ ও আশা জাগায়।
তবে এর সমালোচনাও আছে। ১৯৭৫ সালে বিজ্ঞানীরা এটিকে ছদ্মবিজ্ঞান ঘোষণা করেন। কিন্তু তবুও এর জনপ্রিয়তা কমেনি। কারণ—এটি কেবল ভবিষ্যৎবাণী নয়; বরং আত্ম-অন্বেষণ, জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজা এবং মহাবিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার এক মাধ্যম।